সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে। এই বাড়িতেই তিনি শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন

default-image

শীতের সকাল। কুয়াশায় ঢাকা পাবনা শহর। হঠাৎ গণমাধ্যমে ভেসে ওঠে শোক সংবাদটি। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি, সবখানে দিনভর এক কথা—সুচিত্রা। ‘ভূমিকন্যা’র প্রয়াণে গতকাল শুক্রবার শোকাহত দিন কেটেছে শহরবাসীর।
শহরের শালগাড়িয়া মহল্লার রিকশাচালক মানু মণ্ডল সুচিত্রাকে চেনেন না। তবে সকাল থেকে কয়েকজন তাঁর রিকশায় চড়ে নামটি বলেছেন। তিনি তাঁদের কাছ থেকে শুনেছেন, পাবনার এক মেয়ে, বড় নায়িকা ছিলেন। তিনি মারা গেছেন। ‘বিরাট এক সম্পত্তি হারাইছি আমরা’, বললেন মানু।
সুচিত্রা সেনের একসময়ের প্রতিবেশী বৃদ্ধা মিলন দত্ত বলেন, ‘সুচিত্রা সেনের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি।’
সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি এম সাইদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক রামদুলাল ভৌমিক বলেন, ‘সুচিত্রা সেনের বাড়িটি দখলমুক্ত ও সেখানে সুচিত্রা সেনের নামে একটি সংগ্রহশালা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
পাবনার একুশে বইমেলা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম সদস্য জাকির হোসেন বলেন, ‘সুচিত্রা সেনের স্মৃতি রক্ষায় আমরা দীর্ঘদিন বাড়িটি দখলমুক্ত করার আন্দোলন চালিয়ে আসছি। আজ এই শোকের দিনে সব গ্লানি মাথায় নিয়ে বাড়িটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছি।’
শিক্ষাবিদ শিবজিদ নাগ বলেন, পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুচিত্রা সেন একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের মানুষ। তাঁর প্রয়াণে আমরা শোকাভিভূত।’ সুচিত্রা সেনের একসময়ের প্রতিবেশী আইনজীবী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁর স্মৃতি সবার মনে জাগরূক থাকুক, অনুপ্রাণিত করুক।’
সুচিত্রা সেন তৎকালীন পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। সারা আহম্মেদও একই স্কুলে পড়তেন। তিনি এখন রাজশাহীতে থাকেন। গতকাল মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকালে টিভি খুলেই খবরটা জানলাম। নিজের অজান্তে চোখ ভিজে উঠল। মনে পড়ল কিছু স্মৃতিকথা। আমি তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি, সুচিত্রাদি নবমে। বড়দি বলেই ডাকতাম আমরা। প্রচণ্ড চঞ্চল, কিন্তু সরলমনা ছিলেন দিদি। সর্বদা হাসতেন, সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশতেন, গল্প করতেন। স্কুলের সব অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে থাকতেন। আজ চলে গেলেন সব ছেড়ে। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’
সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে। এই বাড়িতেই তিনি শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন। তিনি পাবনা বালিকা বিদ্যালয়ে (বর্তমান পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়) নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা মিউনিসিপিলিটির স্যানিটরি ইন্সপেক্টর। ১৯৪৭ সালে বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে কলকাতা চলে যান।
বিভিন্ন সংগঠনের শোক: সুচিত্রা সেনের মৃত্যুতে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আল-নকীব চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সাংস্কৃতিক ঐক্য জোট, পাবনা প্রেসক্লাব, পাবনা রিপোর্টার্স ইউনিটি, পাবনা ড্রামা সার্কেল, আফা ইনস্টিটিউট, থিয়েটার ৭৭, গণশিল্পী সংস্থা পাবনা জেলা শাখা, অনুশীলন ৮০, একুশে বইমেলা উদ্যাপন পরিষদ, দর্পণ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, অ্যাটুইন ব্যান্ড, ইফা ইনস্টিটিউট, উত্তরণ সাহিত্য আসর, মহীয়সী প্রকাশনী, লালন স্মৃতি পরিষদ, নাট্য সংগঠন গণমঞ্চ, প্রথম আলো পাবনা বন্ধুসভা, সৈয়দ ফাউন্ডেশন, তরুণ সংঘসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0