default-image

না, মৃত্যুর পরও তাঁর মুখ দেখা গেল না। অদেখাই রয়ে গেলেন তিনি। কলকাতার বেল ভিউ ক্লিনিক, তাঁর বালিগঞ্জের বাড়ি কিংবা কেওড়াতলা শ্মশানঘাটের সামনে জড়ো হওয়া উৎসুকমানুষ দেখতে পেল না প্রিয় মহানায়িকার মুখ।
সুচিত্রা সেন রুপালি জগৎ ছেড়েছেন ১৯৭৮ সালে। শেষবারের মতো লোকসমক্ষে এসেছিলেন ১৯৮৯-তে। তারপর সেই যে স্বেচ্ছানির্বাসনে গেলেন, আর কখনোই কেউ তাঁকে দেখেনি—মুনমুন, রাইমা, রিয়া আর অতি প্রয়োজনীয় কয়েকজন ছাড়া। নিজের চারদিকে গড়ে নেওয়া রহস্যময়তার ঘেরাটোপেই থাকলেন বছরের পর বছর। তারপর, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪—ডেডস্টপ!
রমা সেন যখন সুচিত্রা সেন হয়ে পর্দা কাঁপাতে শুরু করলেন, সেই থেকে শুরু। সেই থেকে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ, ষাট আর সত্তর দশক বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ হয়ে রইল সুচিত্রাময়। এবং অবধারিতভাবেই উত্তমময়। সুচিত্রা-উত্তম জুটি বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনধারাই দিল পাল্টে। সেকালের প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা সদ্য বিবাহিত দম্পতি সেলুলয়েডের এই নায়ক-নায়িকাকে রাখলেন বুকের গভীরে লুকিয়ে। প্রবীণেরাও এই জুটির অভিনয়ের স্পর্শে নিজেদের অন্তরের গহিনে ফিরিয়ে আনলেন সোনালি অতীত। বাংলা চলচ্চিত্র এ রকম তুঙ্গস্পর্শী জুটি আর দেখেনি কখনো।
১৯৫৩ সালে চলচ্চিত্রে পা রেখেছিলেন সুচিত্রা সেন। সে বছরই সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে উত্তম-সুচিত্রা জুটির শুরু। আরও কিছু ছবিতে অভিনয় করলেন তাঁরা। তবে ’৫৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যখন সুচিত্রা-উত্তমের অগ্নিপরীক্ষা ছবিটি মুক্তি পেল, তখনই কেবল চলচ্চিত্র-পরীক্ষায় পুরো নম্বর পেয়ে উতরে গেলেন তাঁরা দুজন। বিভূতি লাহা, অগ্রদূত নামে যিনি পরিচিত, তিনি নিজেও কি ভাবতে পেরেছিলেন, উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রথম সুপারহিট ছবিটি নির্মাণ করছেন তিনি?
এর পরের গল্প তো ইতিহাস। রোমান্টিক জুটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়া সুচিত্রা-উত্তম এগিয়ে গেলেন শাপমোচন, সবার উপরে, সাগরিকা, শিল্পী, হারানো সুর, পথে হলো দেরী, সপ্তপদীর পথ ধরে। উত্তমকে ছাড়াও বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গে দীপ জ্বেলে যাই, অশোক কুমারের সঙ্গে হসপিটাল কিংবা সৌমিত্রের সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা করে সুচিত্রা বুঝিয়ে দিলেন, অভিনয়ের ক্যারিশমাটা জানা আছে তাঁর, শুধু উত্তম-সুচিত্রা রসায়নেই যা শেষ হওয়ার নয়। আর হিন্দিজগতে দিলীপ কুমার, দেব আনন্দ, অশোক কুমার, ধর্মেন্দ্র ও সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেও তো বুঝিয়ে দিলেন, তিনি চলচ্চিত্র জগতে আগন্তুক নন। টিকে থাকার জন্যই এসেছেন।
গত কয়েক দিন খোঁজ নিয়েছি ঢাকা শহরের সিডির দোকানগুলোয়। সুচিত্রা অভিনীত চলচ্চিত্রের সিডি এখন দেদার বিকোচ্ছে। কিনছেন তরুণেরাই, যাঁরা জীবদ্দশায় সুচিত্রাকে দেখেনইনি, সুচিত্রার স্বেচ্ছানির্বাসনের বহু পরে জন্ম—এমন তরুণেরাও অন্তর্জাল ঘেঁটে জেনে নিচ্ছেন রহস্যময়ী এই নারীকে।
নিজেকে আড়াল করে ভালোই করেছেন সুচিত্রা সেন। মানুষের চোখের সামনে তিনি বুড়িয়ে যাননি আর। সেই যে নিজেকে আড়াল করলেন, আর স্থির হয়ে গেলেন একটি বয়সে এসে—এর পরও বাঁচলেন অনেক দিন, কিন্তু ছবির মতোই জনমানসে থেকে গেলেন রোমান্টিক নায়িকা হয়েই।
সুচিত্রা সেন নামটি উচ্চারিত হলেই একজন চোখা ব্যক্তিত্বের প্রবল আত্মবিশ্বাসী রোমান্টিক নায়িকার ছবিই ভেসে ওঠে সবার চোখে। তাই, যদিও ৮২ বছর বয়সে চলে গেলেন সুচিত্রা সেন, সবার মনে হলো রোমান্টিক মহানায়িকার মহাপ্রস্থান ঘটল, সুদূর অতীতে পর্দা মাতানো কোনো অভিনেত্রীর মৃত্যু এটা নয়। কয়েক যুগ ধরে এক-একটি প্রজন্ম একজন সুশ্রী, অভিনয়ে পারদর্শী প্রবল ব্যক্তিত্বশালী একজন নায়িকাকেই চিনেছে। সুচিত্রা সেন তাঁর নাম।
সুচিত্রা এখানেই অনন্য।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0