default-image

মানিক। একদিন তিনি সত্যজিৎ হবেন। চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। তিনি হয়েছেনও। ভারত ছাড়িয়ে তাঁর পরিচয় ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সব সাফল্যের পেছনে যাঁর গোটা জীবন, তিনি মঙ্কু। যাঁকে পরে চিনব বিজয়া রায় নামে। মানিক থেকে সত্যজিৎ হওয়ার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি হয়ে থাকলেন ছায়ার মতো।

১৯৪০ সালের দিকে। বয়সে বড় মঙ্কুর সঙ্গে মানিকের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। মঙ্কু তখন বিথুন স্কুলে চাকরি করছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। রেডিওতে বাজানো হতো ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক। রাতে শুনতেন দুজন। যেন নেশা ধরে গেছে। সেই নেশা ক্রমেই দুজনকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলবে কে জানত! তাই হলো। দুজন বুঝলেন, প্রেমে পড়ে গেছেন। কিন্তু নিকটাত্মীয়, অসম বয়স নিয়ে দুজনেই ছিলেন দ্বিধায়। পরিকল্পনা করলেন, তাঁরা বিয়েই করবেন না। অবশেষে বিয়ে হলো। মঙ্কু জড়িয়ে গেলেন মানিকের সঙ্গে। ছায়া হয়ে থাকলেন আজীবন—কী শিল্পে, কী জীবনে। তাই তো ৮৪ বছর বয়সে নিজের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়েও নিজেকে আলাদা করতে পারলেন না। ‘আমার কথা’ নয়, নিজের স্মৃতিকথা লিখলেন ‘আমাদের কথা’ নামে।

বিজ্ঞাপন

১৯২১ সালের এই দিনে জন্মেছিলেন সত্যজিৎ রায়। বাংলা চলচ্চিত্রের এই দিকপাল সগর্বে উচ্চারিত হবেন দিকে দিকে। কিন্তু তাঁর মানিক থেকে সত্যজিৎ হয়ে ওঠার পেছনে সেই ‘ছায়াসঙ্গী’ বিজয়া রায়কেও স্মরণ করা যাক খানিকটা। সৃজনশীল মানুষ হিসেবে কাজেই আজীবন ডুবে ছিলেন সত্যজিৎ রায়। এর বাইরে রায় পরিবার, চলচ্চিত্র ব্যবস্থাপনা, সংসার চালানো, টাকাপয়সা—সব দুহাতে সামলেছেন বিজয়া। প্রথম ছবির নায়ক ‘অপু’কে খুঁজে বের করেছিলেন বিজয়াই।

default-image
সৃজনশীল মানুষ হিসেবে কাজেই আজীবন ডুবে ছিলেন সত্যজিৎ রায়। এর বাইরে রায় পরিবার, চলচ্চিত্র ব্যবস্থাপনা, সংসার চালানো, টাকাপয়সা—সব দুহাতে সামলেছেন বিজয়া। প্রথম ছবির নায়ক ‘অপু’কে খুঁজে বের করেছিলেন বিজয়াই।

অপু আবিষ্কারের গল্প আজকে হবে। তবে আর আগে চলুন জেনে নিই মঙ্কু মানে বিজয়া রায়কে নিয়ে দুকথা। শৈশবে অসধারণ গলা ছিল তাঁর। যে তাঁর গান শুনত, কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে যেত। রেকর্ডও করছিলেন দু–একটি গান। কিন্তু পরে আর সংগীত নিয়ে পথচলা হয়নি। তবে গান নিয়ে অসম্ভব ভালো স্মৃতি তাঁর সংগীতজীবনেও সফলতার আলো ফেলে। শৈশবে গানের গলা এতই ভালো ছিল যে তাঁর বাবা চেয়েছিলেন প্যারিসে পাঠাবেন গান শেখাতে। বাবা মারা যাওয়ায় আর প্যারিস যাওয়া হয়নি। একবার রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষামঙ্গল’ চলছিল। সেখানে মঙ্কুর মেজ পিসি রবীন্দ্রনাথের কাছে আবদার করলেন মঙ্কুকে দিয়ে গান গাওয়ানোর। রবীন্দ্রনাথ বেজায় বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি বলছ কী টুলু! ওইটুকুন মেয়ে ওই কঠিন সুরের গান গাইবে! আগে গান শিখতে হবে, তারপর তো গাইবে, কিন্তু তার আর সময় কোথায়?’
কিন্তু বিজয়া রায়ের পিসি নাছোড়বান্দা। কবিগুরুকে বললেন, ‘ওর গান তোলা হয়ে গেছে। যদি তিনি দয়া করে একটু শোনেন।’ রবীন্দ্রনাথ তখন বিজয়াকে তাঁর পাশে বসে গাইতে বললেন। বিজয়া গাইলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধীরে ধীরে বিজয়ার মাথায় হাত রাখলেন, একটু কম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজ বিজয়াই গাইবে।’

default-image
রবীন্দ্রনাথ তখন বিজয়াকে তাঁর পাশে বসে গাইতে বললেন। বিজয়া গাইলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধীরে ধীরে বিজয়ার মাথায় হাত রাখলেন, একটু কম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘ঠিক আছে, আজ বিজয়াই গাইবে।’
বিজ্ঞাপন

শুধু সংগীত নয়, অভিনয়েও নাম লিখিয়েছিলেন বিজয়া। সত্যজিতের মাথায় তখনো সিনেমার পোকা অতটা ঢোকেনি। দুজনের প্রেমপর্ব চলছে। বাবা মারা যাওয়ায় অর্থনৈতিক একটা সংকট ছিল মঙ্কুদের। কাকাদের কাছে বড় হয়েছেন। তাই উপার্জনের জন্য নাম লিখেয়েছিলেন অভিনয়ে। বিজয়া রায় ‘আমাদের কথা’য় লিখেছেন, ‘ওঁকে একদিন ফিল্মে অভিনয় করার সংকল্প জানালাম। প্রথমে খুব আপত্তি করেছিলেন, আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির খুব সুনাম ছিল না তো। কিন্তু টাকা রোজগার করার ওই তো একটি মাত্র উপায়।’

default-image

যদিও তিনি এই অভিনয়ের জীবনকে উল্লেখ করেছেন লজ্জাজনক অধ্যায় হিসেবে। তথাপি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতাটা সত্যজিতের আগে বিজয়াই পেয়েছিলেন। সেগুলোও কি কাজে লেগেছে পরে? অভিনয় করেছিলেন ‘শেষ রক্ষা’ ও ‘সন্ধ্যা’ ছবিতে। তৎকালীন বোম্বেতে (মুম্বাই) গিয়ে করলেন ‘জনতা’, ‘রেণুকা’ ‘রজনী’ ইত্যাদি। তারপর সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরে তিনি চলে এলেন কলকাতায়। জীবন মিলে গেল সত্যজিতের সঙ্গে।

ভিত্তরিও ডি সিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’ দেখার পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ছবি বানাবেন। লন্ডন থেকে ফেরার পথে ‘পথের পাঁচালী’ চিত্রনাট্য লিখছিলেন আর ভাবছিলেন ছবিটা বানাতে পারবেন কি না। পাশে বসে সব সময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বিজয়া। সাহস দিয়ে বলেছেন, ‘তুমি পারবেই’। বাড়িতে এসে ‘পথের পাঁচালী’র কাজ শুরু হয়েছে ধুমসে। কিন্তু আসল নায়ক অপুকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই অপুকে বাড়ির পাশ থেকে তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। বিজয়া লিখেছেন, ‘অপু আর দুর্গাকে খোঁজা নিয়েই প্রায় ইতিহাস হয়ে যায়। হাজার হাজার বাচ্চাকে ইন্টারভিউড করে, কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের পাশের বাড়ি থেকে অপুকে পেলাম।’

default-image

তাদের বাড়ির পাশের একটি ছেলেকে দেখে ভেবেছিলেন, আহা, ও যদি অপু হতো! তিনি ভাবছিলেন, ছেলেটি বাঙালি নয়। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাঙালি। সত্যজিৎ অফিস থেকে ফিরলে অপুকে আবিষ্কারের খবর দিলেন। অপুকে দেখলেন সত্যজিৎ। তারপর ওর সঙ্গে কথা বলে, বিজয়াকে বলেছিলেন, ‘এর চেয়ে ভালো অপু আর কল্পনা করা যায় না। ওকে দিয়ে কাজ করাতে একটু খাটতে হবে। তা হোক এ রকম আইডিয়াল অপু আর পাওয়া যাবে না। ভাগ্যিস, তুমি ওকে দেখতে পেয়েছিলে!’

default-image
বিজ্ঞাপন

শুধু অপু তো নয়, সত্যজিৎকে নানাভাবে সমস্যা থেকে উদ্ধার করতেন বিজয়া রায়। সেটা চলচ্চিত্রের হোক কিংবা পরিবারের। বিজয়া নিজেই বলেছেন, ‘রিঙ্কু মানে শর্মিলার চুল তো “অপুর সংসার” থেকে “দেবী” পর্যন্ত আমি বেঁধে দিয়েছিলাম।’
নায়িকাকে সাজানোই তো শেষ নয়। পাত্র–পাত্রী খুঁজে দেখা। তাদের জুতসই পোশাক ও অলংকার জোগাড় করা। শুটিংয়ে কোথায়, কী লাগছে, সবকিছুর দেখভাল মঙ্কু মানে বিজয়া রায়ই করতেন। শুধু তাই নয়, সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবির চিত্রনাট্য লেখার পড়ে প্রথম পাঠক ছিলেন বিজয়া রায়। টুকিটাকি বলতেন পছন্দ–অপছন্দ নিয়ে। সত্যজিতের চলচ্চিত্র জীবনে এই ঘটনার কখনো ব্যত্যয় হয়নি।

default-image

এই মঙ্কু সারা জীবন বিজয়া রায়ই হয়ে উঠতে চেয়েছেন। যৌথ জীবনের শুরুতে তাঁর শাশুড়ি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তুমি রায় বংশের নাম রাখতে পারবে তো?’ বিজয়া বলেছিলেন, ‘চেষ্টার ত্রুটি হবে না। তবে তোমার মতো পারব কি না, তা এখনই বলতে পারছি না।’ তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, ‘আমি এত কথা চিন্তা করিনি। কী পেরেছি না পেরেছি তা বলতে পারব না, তবে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিটি কাজে ওঁকে সাহায্য করেছি, এবং উৎসাহ দিয়েছি, এ কথা হলফ করে বলতে পারি।’

বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন