default-image

কোন দেশের মানুষ ছিলেন তিনি, সে কথা আজ আর কেউ ভাবছে না। সবার হূদয়ে এক গভীর বিষাদ ছড়িয়ে অনন্তলোকে চলে গেছেন তিনি। উপমহাদেশের সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে নীরব হলেন ৯৪ বছর বয়সে। থেমে গেল সেই স্বর্গীয় কণ্ঠ, যা দীর্ঘ সাত দশকের অধিক সময় ধরে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকে আবিষ্ট করে রেখেছিল সুরের ইন্দ্রজালে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের বেঙ্গালুরুর নারায়ণ হূদয়ালয় নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানীয় সময় ভোররাত তিনটা ৫০ মিনিটে নির্বাপিত হয় তাঁর জীবনপ্রদীপ। সময়ের বিচারে ব্যক্তিজীবনে ৯৪ বছর বয়স দীর্ঘ হলেও মান্না দের মৃত্যুসংবাদে তাঁর অনুরাগীদের মনে হয়েছে, যেন অসময়েই চলে গেলেন প্রিয় শিল্পী। মনে হয়েছে, এবার সত্যি সত্যি ভেঙে গেল ‘কফি হাউসের সেই আড্ডা’।
মান্না দের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, অগণিত অনুরাগী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া পৃথক বাণীকে এই কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
পূর্ণ চন্দ্র দে ও মহামায়া দের চার ছেলে এক মেয়ে। পূর্ণ চন্দ্র তাঁর তৃতীয় ছেলের নাম রেখেছিলেন প্রবোধ চন্দ্র দে। কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে ওঁকে ডাকতেন ডাকনাম ধরে, মান্না বলে। সংগীত ভুবনে মান্না দে নামেই তিনি খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। কলকাতায় ১৯১৯ সালের ১ মে তাঁর জন্ম। গান আর স্কুলের পাট শুরু হয়েছিল তাঁর প্রায় একসঙ্গেই। গানে গানে মাতিয়ে রাখতেন সহপাঠীদের। ত্রিশের দশকে ছাত্রজীবনে আন্তকলেজ সংগীত প্রতিযোগিতায় পর পর তিন বছর তিনটি পৃথক বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তাঁর বড় ভাই প্রণব দে খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক ও শিল্পী ছিলেন। দ্বিতীয় ভাই প্রকাশ চন্দ্র দে ছিলেন চিকিৎসক। ছোট ভাই প্রভাষ চন্দ্র দে গানবাজনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে মান্না দে তাঁর অসাধারণ গায়কি আর সুষমামণ্ডিত কণ্ঠসুধায় সুরের আকাশে ধ্রুবতারার মতো দেদীপ্যমান হয়ে ওঠেন।

কাকা অন্ধ শিল্পী কৃষ্ণ চন্দ্র দে একাধারে ছিলেন তাঁর সংগীতগুরু ও প্রেরণার উৎস। বিখ্যাত কাকার সুবাদে সংগীতজীবনের শুরু থেকেই উপমহাদেশের খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞদের সান্নিধ্য এবং তাঁদের কাছে তালিম নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর।

নিজে গেয়েছেন, গানে সুর করেছেন, হিন্দি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। সংগীতের প্রায় সব ক্ষেত্রেই অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় চার হাজারের মতো গান গেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে বাংলা গানের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। এসব গানের প্রায় ৯০ শতাংশের সুর তাঁর নিজের দেওয়া। ‘কফি হাউস’ তো আছেই; এ ছাড়া ‘সে আমার ছোট বোন’, ‘যদি হিমালয় আল্পসের’,‘ যদি কাগজে...হূদয়ে লিখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে’—এমন অসংখ্য গান প্রেম-বিরহের আবেগে থরথর বাঙালির হূদয়তন্ত্রীতে বাজবে বহুদিন।

চাচা কৃষ্ণ চন্দ্রের সঙ্গে মুম্বাইতে এসেছিলেন ১৯৪২ সালে। পরের বছরই তামান্না ছবিতে সুরাইয়ার সঙ্গে একটি দ্বৈত গান করার সুযোগ পান। গানটি জনপ্রিয়তা লাভ করে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দেয়। এরপর উপমহাদেশের আরেক সংগীত দিকপাল শচীন দেববর্মনের সঙ্গে কাজের সুযোগ পান তিনি। ১৯৫০ সালে মশাল ছবিতে শচীনকর্তার লেখা ‘ওপার গগন বিশাল’ গানটি এবং ১৯৫২ সালে একই গল্পের বাংলা ও মারাঠি ছবিতে ‘আমার ভুপালী’ গানটি গেয়ে গানের ভুবনে তাঁর আসন পাকাপোক্ত করে নেন। হিন্দি, গুজরাটি, মারাঠি, ভোজপুরি, পাঞ্জাবি, কোঙ্কনি, অসমিয়া ও বাংলা ভাষার গানের পাশাপাশি রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীতেও তিনি তাঁর অনন্য সংগীতপ্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।

কেরালার মেয়ে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী সুলোচনা কুমারনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বিয়ের পিঁড়ি অবধি পৌঁছেছিল ১৯৫৩ সালে। তাঁদের দুই মেয়ে সুরমা দে ও সুমিতা দে। অকপটে বলেছেন জীবনের বড় পাওয়া তাঁর স্ত্রী। একাধারে সেরা বন্ধু, ফিলোসফার, গাইড, সমালোচক—সবই। গত বছর সেই স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে বেহাল শরীর নিয়েও নতুন একটি অ্যালবাম করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অমোঘ নিয়তি সেই সময় তাঁকে দেয়নি।

সংগীতে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭১ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ, ২০০৭ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান। এ ছাড়া ভারতে চারটি জাতীয় পুরস্কার রবীন্দ্রভারতী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানজনক ডিলিট, আলাউদ্দিন খান পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশেও ১৯৮৮ সালে রেনেসাঁ সাংস্কৃতিক পরিষদ তাঁকে ‘মাইকেল সাহিত্য পুরস্কার’ দিয়ে সম্মান জানায়। কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনী জীবনের জলসাঘরে।

এ বছরই ৯৪তম জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন শিল্পীকে বিশেষ সম্মাননা জানাতে। নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে। শারীরিক কারণে তা হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন এক শ বছর বাঁচার আশার কথা। ক্রিকেটে নড়বড়ে নব্বই বলে একটি কথা চালু আছে। কাছে গিয়েও পূরণ হলো না তিন অঙ্ক পৌঁছানোর সেই আশা। জীবন কবে আর কাকে অবকাশ দিয়েছে সবটুকু ইচ্ছাপূরণের, হাতের সব কাজ শেষ করে চোখ বোজার!

 ই প্রথম আলোয় পড়ুন: গানই আমার জীবন: মান্না দে

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0