আত্মহত্যা করতে গিয়ে ফিরে এসে জীবন বদলে ফেলা একজন
একবার, দুইবার, তিনবার... হলো না... হচ্ছে না, কিছুই হচ্ছে না—অর্থাভাবে, হতাশায়, বিচ্ছেদের নিদারুণ কষ্টে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন তরুণ মনোজ বাজপেয়ি। হঠাৎ মনে হলো, তিনবার ন্যাশলান স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে। সর্বোচ্চ কী হবে, আরও একবার ফিরিয়ে দেবে। আত্মহত্যা নাহয় একটু পরেই করা গেল। নতুন করে চতুর্থবারের মতো আবেদন করলেন। ফলাফল প্রকাশের দিন মনে মনে আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেজাল্ট দেখলে গেলেন। চতুর্থবারের মতো বাতিল দেখে তবেই মরবেন। কিন্তু এ কী, তিনি যে নির্বাচিত হয়েছেন! চোখ কচলে আবার তাকালেন ভালো করে, ‘মনোজ বাজপেয়ি, সিলেক্টেড’। নানা অনুভূতির সংমিশ্রণে হুট করেই আত্মহত্যার প্ল্যান বাতিল করতে হলো। মরা হলো না তাঁর। হোস্টেলে ফিরলেন মিষ্টি নিয়ে। মনোজ বাজপেয়ি, এই মুহূর্তে বলিউডের ‘ফাইনেস্ট’ অভিনেতাদের একজন। সেই অভিনেতা, যাঁকে অনেক কিছু বলার জন্য খুব বেশি কিছু করতে হয় না। আজ তাঁর ৫২তম জন্মদিন।

default-image

আজ থেকে ঠিক ঠিক ৫২ বছর আগের কথা। বিহারের পশ্চিম চম্পারণ জেলার বেলোয়া গ্রামে ১৯৬৯ সালের ২৩ এপ্রিল জন্ম নেন মনোজ বাজপেয়ি। তাঁর নাম রাখা হয়েছিল অভিনেতা মনোজ কুমারের নাম অনুসারে। কৃষক বাবা আর গৃহিণী মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তাঁর পরিবারের আরও একজন ক্যারিয়ার গড়েছেন বলিউডে। ছোট বোন পুনম দুবে বলিউডের নামকরা  ফ্যাশন ডিজাইনার। ছোটবেলা সম্পর্কে ‘দ্য স্লো ইন্টারভ্যু উইথ নীলেশ মিশ্র’তে মনোজ বলেন, ‘পৃথিবীর শতকরা আশি ভাগ মানুষ কলেজ পাস করার আগে জানে না যে সে কী হতে চায়। কিন্তু আমার যতটুকু স্মৃতি আছে, বোধ হওয়ার পর থেকেই আমি কেবল অভিনেতা হতে চেয়েছি। আমি বাবার সঙ্গে মাঠে চাষ করতে যেতাম, তখন মনে হতো আমি কৃষকের অভিনয় করছি। জন্মের পর থেকেই আমি মনেপ্রাণে কেবল অভিনেতা ছিলাম।’  

মনোজ জানান, গ্রামে কৃষক পরিবারের বাবা–মায়েরা নাকি সন্তানদের লেখাপড়া, ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত না। মনোজের ভাষায়, তাঁদের ভাবটা ছিল এমন, ‘যা সিমরান যা, জি লে আপনে জিন্দেগি’। মনোজও সকালবেলা বের হতেন। সারা দিন নাকি ‘টো টো’ করে বেড়াতেন। সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফিরতেন। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে যেতেন। আবার পরদিন সকালে উঠে বের হয়ে যেতেন। পাহাড়ে চড়তেন, নদীতে সাঁতরাতেন। মনোজের ভাষায়, ‘গ্রামের কৃষক পরিবারের ছেলেরা এসব কারণে অন্যদের চেয়ে স্বাধীন, সাহসী। নির্ভারভাবে ঘুরতে পারত। যা ইচ্ছা করতে পারত। নিজের মতো গাছে চড়ত, পড়ত। ওভাবেই জীবনের গাছ বাওয়া শিখত। শেখাটা নিজের মতো করে হতো, তাই সেখানে ভেজালের অবকাশ ছিল না। মুক্তভাবে, সোজাসাপটা চিন্তা করার জন্য ওভাবে বেড়ে ওঠাটা জরুরি। আর আমাদের গ্রাম এই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম। নেপাল-ভারত বর্ডারের একদম কাছাকাছি। ধান ছিটিয়ে দিলেই হয়। আর কিচ্ছু করতে হয় না। মাটি এত উর্বর। শীতকালে পাহাড়ে বরফ জমে। সেই বরফের ওপর চিকচিক করে সূর্যের আলো। পাহাড়ের দিকে তাকালে সেই আলো এসে পড়ে চোখে, মনে। এভাবেই আমাদের মন আলোকিত হয়েছে।’

default-image
বিজ্ঞাপন

মনোজের বয়স তখন ১৭। একটা বাকশোতে জামাকাপড় নিয়ে বাবা–মাকে প্রণাম করে বললেন, ‘আমি দিল্লি যাচ্ছি’ বলেই এক বন্ধুর সঙ্গে ট্রেনে চেপে বসলেন। একমাত্র ট্রেন, টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। তাই টিটিই (ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনার) এলে এক কামরা থেকে আরেক কামরায় পালিয়ে বেড়িয়েছেন। মনোজের ভাষায়, ‘লুকা ছুপি’ খেলেছেন। এরপর ভর্তি হয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত রামযশ কলেজে। উদ্দেশ্য ছিল, যেভাবেই হোক এনডিসি পর্যন্ত পৌঁছাবেন। সেখানেই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু নামকরা শিক্ষকের নজরে আসেন তিনি। তাঁদেরই একজন শামসুল ইসলাম। এই শিক্ষকের সম্পর্কে মনোজ বলেন, ‘যাঁদের ছাড়া আমি আজকের এই আমি হতে পারতাম না, তাঁদেরই একজন শামসুল ইসলাম স্যার। আমি একদিন উনাকে গিয়ে বললাম যে আমি পথনাটক করতে চাই। উনি বললেন, চলে আসো। আমি ভাবলাম, বাহ, বেশ তো...এত সহজ! পরদিন গেলাম। উনি আমাকে চেখবের বেশ কিছু নাটক পড়তে দিলেন। তলস্তয়, মার্ক্স, শেকসপিয়ার, হেনরিক ইবসেন, ক্রিস্টোফার মার্লো...। আমার মনে হলো, না তো, সহজ নয়! দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বছর আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি অন্তর্মুখী, চুপচাপ ধরনের তরুণ ছিলাম। আমি পড়তাম আর চারপাশের সবাইকে মন দিয়ে দেখতাম। আর টুকটাক অভিনয়ের সুযোগ পেলে, কী দেখলাম, কী পড়লাম, কী ভাবলাম—তার পুরোটা ঢেলে দিতাম।’

default-image

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে মনোজ ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় আবেদন করা শুরু করলেন। সেই সময়টা মনোজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। ছাত্রাবস্থায়, যখন নিজেরই ছিল না ঠিকঠিকানা, তখন দিল্লির একটা মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। স্ট্রাগলিং পিরিয়ডের সেই বিয়ে টেকেনি বেশি দিন। বাবা–মাসহ পরিবারের পাঁচ ভাইবোনের দায়িত্ব, নিজের ক্যারিয়ার, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ—সব মিলিয়ে চোখের সামনে যেন অন্ধকার দেখছিলেন। এই সময়ই আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন মনোজ। চতুর্থবার আবেদন করার আগে রঘুবীর যাদবের পরামর্শে ব্যারি জনের ওয়ার্কশপ করলেন। মনোজের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে জন তাঁকে নিজের টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে রাখলেন। সেখানে কাজ করতে করতেই চতুর্থবার আবেদন করে টিকে গেলেন মনোজ। শুরু হলো এক অন্য জীবন।  

১৯৯৪ সালে দ্রোহকাল বলে একটা সিনেমায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা দিয়েছিলেন। শেখর কাপুর পরিচালিত ‘ব্যান্ডেড কুইন’ সিনেমায় পেয়েছিলেন ছোট্ট একটা চরিত্র। সেই ছোট্ট চরিত্র দেখেই মহেশ ভাট ‘স্বভিমান’ মেগা সিরিয়ালে নেন মনোজকে। দূরদর্শনে চলত সোপ অপেরাটা। ‘দস্তক’, ‘তামান্না’—এসব ছবিতে ছোট ছোট চরিত্র করছিলেন। তাই দেখে রাম গোপাল ভার্মা ‘দাউদ’ সিনেমায় একটা পার্শ্বচরিত্রে নিলেন মনোজকে। বড় পর্দায় মনোজের অভিনয় দেখে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা হলো তাঁর। এত ভালো একজন অভিনেতাকে দিয়ে কেন এত ছোট একটা চরিত্র করালেন, সেই আফসোসে। রাম তাঁর পরের ছবি ‘সত্য’তে প্রধান চরিত্রে নিলেন মনোজকে। আর মনোজও সুযোগ পেয়ে নিজের পুরোটা নিঙড়ে দিল। সিনেমাটা তুমুল হিট করল। মূলত এই ছবিটাই ছিল মনোজের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ছবি। এই ছবির ফলে কাজ পাওয়ার জন্য মনোজের সংগ্রাম শেষ হলো।

default-image
“শোলে” সিনেমার পর আমজাদ খানের যে অবস্থা হয়েছিল, আমার হলো তাই! একের পর এক সিনেমার প্রস্তাব আসতে লাগল। মাথা ঠান্ডা রেখে আমি “না” বলতে শুরু করলাম। শুরু থেকেই আমি জানতাম, আমি কোনো রেসের ঘোড়া নই। নিজেকে অভিনেতা পরিচয় দেবার জন্য আমার যা করার আমি তা করব। নাম, যশ, খ্যাতি, টাকার পেছনে ছোটার লোভ আমি গিললাম। চুপি চুপি মন দিলাম অভিনেতা হওয়ায়।
মনোজ বাজপেয়ি

‘মুম্বাইকা কিং কৌন? ভিখু মাত্রে’ মনোজের গলায় এই সংলাপে যেনো পাগল হয়ে গেল পুরো ভারত। অনুপমা চোপড়া এই সিনেমার রিভিউয়ে বললেন, ‘মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন ভিখু মাত্রের চরিত্রে মনোজের অভিনয় দেখে মনে হলো, তাঁর গায়ের ঘাম থেকে যেন মুম্বাইয়ের বস্তির গন্ধ আসছে। বড় পর্দায় এমন পারফরম্যান্স ভারতের দর্শক আর কবে দেখবে বা আদৌ দেখবে কি না, আমার জানা নেই।’ ফিল্মফেয়ার পরে এই ছবিতে মনোজের পারফরম্যান্সকে বলিউডের বড় পর্দায় সেরাদের সেরা তালিকায় রাখল। প্রথম ছবিতেই মনোজ পেলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ফিল্মফেয়ারসহ আরও অনেক কিছু। মনোজের ভাষায়, ‘তখন খানেরা ছিল (শাহরুখ, সালমান, আমির), অক্ষয়, অজয়রাও ছিল। কিন্তু গুগোল করলে দেখবেন, ১৯৯৮ সালে কেবল একটা ছবি নিয়েই আলোচনা হয়েছে, আর সেটা “সত্য”। “শোলে” সিনেমার পর আমজাদ খানের যে অবস্থা হয়েছিল, আমার হলো তাই! একের পর এক সিনেমার প্রস্তাব আসতে লাগল। মাথা ঠান্ডা রেখে আমি “না” বলতে শুরু করলাম। শুরু থেকেই আমি জানতাম, আমি কোনো রেসের ঘোড়া নই। নিজেকে অভিনেতা পরিচয় দেবার জন্য আমার যা করার আমি তা করব। নাম, যশ, খ্যাতি, টাকার পেছনে ছোটার লোভ আমি গিললাম। চুপি চুপি মন দিলাম অভিনেতা হওয়ায়।’ একে একে ‘কৌন’, ‘শূল’, ‘ফিজা’, ‘রোড’, ‘পিঞ্জর’, ‘ভির জারা’, ‘অ্যাসিড ফ্যাক্টরি’, ‘রাজনীতি’, ‘চিটাগং’, ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’, ‘আলীগড়’, ‘লাভ সোনিয়া’, ‘সঞ্চিড়িয়া’, ‘মিসেস সিরিয়াল কিলারে’ বৈচিত্র্যময় সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘ভোসলে’তে নৈশব্দের অভিনয় দিয়ে হাতে তুলেছেন সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ সিরিজে সিক্রেট এজেন্টের ভূমিকায় দুর্দান্ত অভিনয় করে বাড়ি নিয়ে গেছেন ফিল্মফেয়ার ওটিটির সেরা অভিনেতার পুরস্কার।  

default-image

এরপর প্রায় দুই যুগ ধরে অসংখ্য ‘অ-বলিউডি’ আর ‘বলিউডি’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন মনোজ। পেয়েছেন তিন-তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। বড় পর্দায় তাঁর অবদানের জন্য ২০১৯ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অনুপমা চোপড়া বললেন, আমি ‘গালি গুলিয়া’, ‘আলিগড়’ আর ‘ভোসলে’ আপনার অভিনয় দেখি, আবার ‘সত্যমেভ জয়তে’, ‘বাঘি টু’, ‘মিসিং’–এও আপনার অভিনয় দেখি। বিকল্প আর বাণিজ্যিক—এই দুই ধরনের ছবিতে দুই ধরনের অভিনয় কীভাবে করেন? উত্তরে মনোজ বলেন, ‘জাভেরি (পরিচালক মিলাপ জাভেরি) “সত্যমেভ জয়তে”র সেটে চিৎকার করে বলে, “স্যার, এত রিয়েলিস্টিক অভিনয় করবেন না। প্লিজ, স্যার চরিত্রের গভীরে ঢুকবেন না। চরিত্র নিয়ে বেশি ভাববেন না। দর্শক ঘুমিয়ে পড়বে। আরেকটু লাউড, আরেকটু...এতক্ষণ এক্সপ্রেশন ধরে রাখবেন না স্যার। এইটা আর্টফিল্ম না স্যার। এইটা “গালি গুলিয়া” না।” তখনই আমি বুঝে যাই। আর সুইচিং করি। এই আর কী! খেয়ে পরে বাঁচার জন্য এসব সিনেমা করতেই হয়। আমিও খুব এনজয় করি। আমি যখন আইআইটি বা আলীগড়ে যাই, ছাত্ররা চিৎকার করে, এসব ছবির সংলাপ শুনতে চায়। সব ওদের মুখস্থ। আমার এগুলো খুব ভালো লাগে। আফটার অল, বলিউড একটা ইন্ডাস্ট্রি। আর সেখানে বক্স অফিস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটাকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। কিন্তু ‘গালি গুলিয়া’, ‘আলীগড়’ আর ‘ভোসলে’র মতো সিনেমা আমার জন্য পরীক্ষা দেওয়া। অভিনেতা হিসেবে নিজেকে যাচাই করার পাল্লা। নিজের দায়িত্বের জায়গা থেকে বড় পর্দার জন্য সত্যিকারের কিছু চরিত্র রেখে যাওয়া। শান্তিতে ঘুমাতে যাওয়া।’


দেখে নেওয়া যাক, মনোজ বাজপেয়ির কাছে কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর। অনুপমা চোপড়া, নীলেশ মিশ্র, ফরিদুন শাহরিয়ারকে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া।

ভালো অভিনেতা হওয়ার গোপন সূত্র কী?

মানুষকে দেখা। আশপাশের মানুষগুলোকে চরিত্র ধরে নিয়ে তাঁদেরকে পড়া। বিশ্লেষণ করা। নিজের দ্বান্দ্বিক জায়গাটা বোঝা। প্রতিটি মানুষের ভেতর দ্বন্দ্ব থাকবেই। নিজের দ্বন্দ্ব যে যত ভালো বুঝতে পারবে, চরিত্র বুঝতে তত সুবিধা হবে।

যখন দেখেন, আপনার চেয়ে কম মেধাবী, কম পরিশ্রমী, কম সৎ অভিনেতারা আপনার চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছে, রাগ বা হতাশা কাজ করে?

একসময় করত। ২৪ বছর ধরে কাজ করছি, আর কত রাগ বা হতাশ হব? একসময় আর এগুলো কিছু কাজ করে না। অন্যান্য শহরের মতো মুম্বাইতেও টিকে থাকতে হলে কিছু না কিছু বিক্রি করতে হয়। ট্রেন থেকে যখন মুম্বাইয়ে নেমেছি, আমি জানি আমাকে কিছু না কিছু বিক্রি করতে হবে। আমি অভিনয় বিক্রি করছি। তাঁরা হয়তো অন্য কিছু। আর সেটাই বিকোচ্ছে ভালো।

default-image
বিজ্ঞাপন

বলিউডের নেপোটিজম নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

তারকাদের সন্তান বা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রতিযোগিতা নেই। আমরা যে ধরনের চরিত্র করি, রণবীর সিং, রণবীর কাপুর বা বরুণ ধাওয়ান সেগুলো করবে না। সেগুলো করলে তাঁদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। আমাদের রাস্তা আলাদা। ওরা কখনোই আমাদের জুতা পায়ে দেবে না। কারণ, এখানে অনেক সংগ্রাম, দুঃখ, হতাশা, ব্যর্থতার গল্প জমা। যেগুলো শিল্পী হওয়ার জন্য জরুরি। তারকাদের না হলেও চলে। নাসিরউদ্দিন শাহ্‌, ইরফান খান, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীরা যেসব চরিত্রে আইকনিক হয়ে আছেন, সেগুলো ওদের জন্য না।

সিনেমা আপনার কাছে কী?

দেশের গ্রামের প্রত্যন্ত মানুষের কাছে যা। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। আমাদের (২০০৬ সালে অভিনেত্রী নেহাকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে ১৩ বছরের এক কন্যা আছে) সন্তান জন্মের পর গ্রাম থেকে এক পণ্ডিত ফোন করল। সে আমার মেয়ের কুণ্ডলী লিখতে চায়। সেটা নিয়ে মেয়ের মুখ দেখতে মুম্বাই আসতে চাইল। আমি বললাম চলে আসো। সে কুণ্ডলী বানিয়ে দিল। আমি আলমারিতে তুলে রাখলাম। তখন সে আমার স্ত্রীকে হাত চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘ভাগ্যের কিছুই যে বলা যাবে না, তা নয়। ভাবি, আপনাদের মেয়ে তো একদম, যাকে বলে “লেডি নানা পাটেকার”।’ আমার কাছে সিনেমা এ রকমই...

ইন্ডাস্ট্রিতে এত বছর কাটিয়ে কী শিখলেন?

মার্কেটিং। আমি দেখেছি, একটা সিনেমা দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর চেয়ে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে পৌঁছানো বেশি কঠিন। মার্কেটিংয়ের বিকল্প নেই। আগে আমি চুপচাপ থাকতাম। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে ঘুমাতাম। এখন আমি প্রচুর ইন্টারভিউ দিই। এই যে শুটিং থেকে সোজা এখানে চলে এসেছি। প্রচুর কথা বলি। যখন কথা বলি না, তখন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামে লিখি। সিনেমার প্রচারণা করি। বাড়ি ফিরে যখন মেয়ে বলে, ‘বাবা, আমার সঙ্গে খেল। মনে হয় বলি, “প্লিজ মা, আজ না। আজ আমি অনেক টুইট করেছি।” কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয়, অভিনেতা হিসেবে আমার যেমন দায়িত্ব আছে, বাবা বা কারও জীবনসঙ্গী হিসেবেও আছে। সংসারের প্রতিও আছে। একটা করতে গিয়ে আরেকটা বিগড়ালে তো চলবে না।

সংসারের প্রতি কী দায়িত্ব পালন করেন?

শুটিং শেষে টমেটো, ধনেপাতা নিয়ে আসি। আমি যেখান থেকে সবজি কিনি, সে জানে যে আমি কৃষকের ছেলে। কোনটা টাটকা, কোনটা কোল্ড স্টোরেজে রাখা আর কোনটা পানি মারা বাসি, তা আমি খুব ভালো চিনি। তাই আমি গেলেই বুঝে যায়, কী চাইছি। ডিনার শেষে রাতের সব থালাবাটি কিন্তু আমি মাজি। মেজে এরপর ঘুমাতে যাই। সকালে বাচ্চার দুধ গরম করে খাওয়াতাম আমি। এখনো সময় পেলে মাঝেমধ্যে সকালের নাশতা বানাই। আর মেয়েকে স্কুলে, কোচিংয়ে, আর্টের ক্লাসে দিয়ে যাই, নিয়ে আসি। আমি পুরোদস্তুর একটা মধ্যবিত্ত জীবন যাপন করি।

default-image

তারকা হয়েও কীভাবে মধ্যবিত্ত জীবন যাপন করেন?

আমি দ্বিতীয়বার সংসার পেতেছি সময় নিয়ে। সংসারের শুরুতেই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম যে আমরা নিজেদের প্রয়োজন বাড়াব না। কেননা প্রয়োজনের কোনো সীমা–পরিসীমা নেই। হ্যাঁ, কোনো বছরে যদি বেশি আয় হয়, তাহলে সুইজারল্যান্ড যাব। কিন্তু সুইজারল্যান্ড যাওয়ার জন্য কাজ করব না।

পার্টিতে যান না কেনো?

কোন পোশাকটা পরব, সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমার ডিজাইনার বলে, 'স্যার প্লিজ, আপনি আজ আপনি ডেনিমের জ্যাকেটটা পরে যান।' আমি বলি, 'আরে রাখো তোমার ডেনিমের জ্যাকেট।' বলেই বেরিয়ে যাই। ও বোধহয় আমার চাকরিটা করবে না আর... আরেকটা কারণ হলো, আমি ফেইক আচরণ করতে পারি না। একেতো অভিনেতা, অভিনয় করতেই হয়। কিন্তু অ্যাকশন কাটের বাইরে একদম পারি না।

default-image

প্রতি সপ্তাহে মনোজের মনে হয়, অনেক তো হলো শহরে, এবার গ্রামে চলে যাবেন, চাষাবাদ করে বাকি জীবন কাটাবেন। স্ত্রীকে প্রায়ই দুঃখ করে বলেন, ‘যদি আমি বিয়ে না করতাম, যদি আমি বাবা না হতাম, তাহলে তো আমার তেমন পিছুটান থাকত না। আমি দিব্যি গ্রামে গিয়ে চাষবাস করে খেতাম। সন্ধ্যা হলেই হুক্কা টানতাম। বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু অভিনেতা আমার কী হতো?’ শুনে স্ত্রী নেহা বলতেন, ‘তুমি আসলে কখনোই গ্রামে ফিরে যেতে পারতে না। গেলেও সর্বোচ্চ এক রাত থেকে চলে আসতে। ওই রাতে তুমি ঘুমাতে পারতে না। চরিত্রটা তোমায় ডাকত। তুমি আসলে গ্রামের জীবনের পিছুটান আর একজন পাগলাটে অভিনয়শিল্পীর মধ্যে আটকে পড়া একটা মানুষ।’ মনোজ মাঝেমধ্যে এই কথা বিশ্বাস করেন। আর গোপনে আটকে থাকা মানুষের একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

সংসারের শুরুতেই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম যে আমরা নিজেদের প্রয়োজন বাড়াব না। কেননা প্রয়োজনের কোনো সীমা–পরিসীমা নেই। হ্যাঁ, কোনো বছরে যদি বেশি আয় হয়, তাহলে সুইজারল্যান্ড যাব। কিন্তু সুইজারল্যান্ড যাওয়ার জন্য কাজ করব না।
মনোজ বাজপেয়ি
default-image

 মনোজ বাজপেয়ির গ্রামের একটা বন্ধু অশোক পুরাণ। একসময় মনোজদের গ্রামের বাড়িতে খুব দুর্দশা যাচ্ছে। খাওয়ার টাকা নেই, এমন অবস্থা। মনোজও দিল্লিতে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে আছেন। সাহায্য করবেন কী! সেই সময় অশোক মনোজদের বাড়িতে এসে তাঁর ভাইয়ের হাতে ৬০০ রুপি দিয়ে বলেছিল, ‘মনোজের কাছ থেকে নিয়েছিলাম, ফেরত দিয়ে দিলাম।’ সেই ৬০০ রুপি পেয়ে মনোজের ভাই আগে বাজারে গেলেন। রান্না হলো। ভাত খেয়ে মনোজকে চিঠি লিখলেন, ‘আমরা না খেয়ে থাকি, আর তুমি বন্ধুকে টাকা ধার দিয়ে বেড়াও?’ অথচ মনোজ কখনোই অশোককে কোনোকালে কোনো টাকা দেননি। বন্ধুকে বিপদে সাহায্য করার জন্য অশোক সেই সময় তাঁর পরিবারকে ওই অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। মনোজের পরিবার যাতে টাকাটা সহজভাবে নিতে পারে, তাই সেই কথা বলেছিলেন তিনি। মনোজ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সেই ৬০০ রুপি আমি কোনো দিন শোধ করিনি। কারণ, এর আসলে কোনো শোধ হয় না। আমি প্রায়ই ঘুম থেকে উঠে মনে মনে সেই ৬০০ টাকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আর ভাবি, ওই দিন ও টাকা না দিয়ে গেলে দুপুরে আমার পরিবার কী খেত? শোধ করা যায় না, এ রকম অসংখ্য ঋণ নিয়েই আজকের আমি। আজকের মনোজ বাজপেয়ি।’

বলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন