প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, রাজকুমার রাও আর আদর্শ গৌরব—এই তিনজনের ভেতর সবচেয়ে বড় তারকা কে? নিশ্চিতভাবে দুবার ভারতের জাতীয় পুরস্কারজয়ী, সাবেক বিশ্বসুন্দরী, বলিউড ও হলিউড তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। কিন্তু এই তিনজনের ভেতর প্রিয়াঙ্কাকে দেখা গেছে সবচেয়ে কম দৈর্ঘ্যের আর তুলনামূলকভাবে অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। আর ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন আদর্শ গৌরব। যাঁকে এই সিনেমা মুক্তির আগে অনেকেই চিনত না।

default-image
যেন তিনি রাস্তার পাশে ইট–কয়লার মধ্যে কালিঝুলি মাখা পড়ে থাকা এক খণ্ড হীরক। এর আগে সবাই তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে, কেউ খেয়ালই করেনি। কারও মাথায়ই আসেনি এভাবেও জ্বলে উঠতে পারেন এক সাধারণ আদর্শ গৌরব।

২২ জানুয়ারি নেটফ্লিক্স আর যুক্তরাষ্ট্রে ‘দ্য হোয়াইট টাইগার’ মুক্তির পর রাতারাতি বিশ্বতারকা বনে গেছেন আদর্শ। যেন তিনি রাস্তার পাশে ইট–কয়লার মধ্যে কালিঝুলি মাখা পড়ে থাকা এক খণ্ড হীরক। এর আগে সবাই তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে, কেউ খেয়ালই করেনি। কারও মাথায়ই আসেনি এভাবেও জ্বলে উঠতে পারেন এক সাধারণ আদর্শ গৌরব। আগেই ‘স্পয়লার অ্যালার্ট’ দিয়ে রাখছি। এই লেখায় সিনেমার গল্প বলা আছে। তাই পুরোটা পড়বেন কিনা সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়ুন।

default-image

‘দ্য হোয়াইট টাইগার’ ছবিটি পরিচালনা করেছেন ভারতীয় মার্কিন পরিচালক রামিন বাহরানি। লন্ডন আর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপরেস্কির (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম ক্রিটিকস) স্মারক হাতে তোলা ৪৫ বছর বয়সী এই পরিচালক প্রথমবারের মতো এই ছবির শুটিং করেছেন ভারতে, ভারতীয় অভিনয়শিল্পী আর কলাকুশলী নিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে বলেছেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথম আমি এমন একটা ছবি পরিচালনা করেছি, যেখানে সেটের মানুষেরা সবাই দেখতে আমার মতো।’

default-image
বিজ্ঞাপন
সিনেমাটি দর্শক দেখা শুরু করবে প্রিয়াঙ্কাদের জন্য, আর মুগ্ধ হয়ে দেখবে গৌরবের মতো নতুন শিল্পীকে। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এই ছবির প্রযোজকও। এভাবেই নতুন শিল্পী তৈরিতে, তাঁদের পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখছেন এই বড় তারকারা।

সিনেমাটি ২০০৮ সালে ভারতীয়–অস্ট্রেলিয়ান লেখক অরবিন্দ আদিগার ম্যান বুকার পুরস্কারজয়ী ‘দ্য হোয়াইট টাইগার’ বই থেকে নির্মিত। ছবিটির অন্যতম প্রযোজক প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। প্রিয়াঙ্কার মতো তারকাকে সহশিল্পী বানিয়ে আদর্শ গৌরবকে মূল চরিত্র দিয়ে বানানো এই ছবি এরই মধ্যে অনলাইন থেকে অফলাইনের চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় আলোচনা সৃষ্টি করেছে। সিনেমাটি দর্শক দেখা শুরু করবে প্রিয়াঙ্কাদের জন্য, আর মুগ্ধ হয়ে দেখবে গৌরবের মতো নতুন শিল্পীকে। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এই ছবির প্রযোজকও। এভাবেই নতুন শিল্পী তৈরিতে, তাঁদের পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখছেন এই বড় তারকারা।  

default-image

পর্দায় সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র বলরাম হয়ে উঠেছেন ২৬ বছর বয়সী আদর্শ গৌরব। তাঁর জার্নিতে যুক্ত হয় পিঙ্কি আর অশোক দম্পতি। এই দুই চরিত্র করেছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আর রাজকুমার রাও। বলরামের একেবারে ছোটবেলা থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার জীবন দেখানো হয়েছে ১২৫ মিনিটে। ইতিমধ্যে এই সিনেমা মন জয় করেছে দর্শক আর সমালোচক—দুই মেরুতে থাকা দুই শ্রেণিরই। আইএমডিবিতে ৫ হাজার ১৭০ জনের ভোটে এই ছবি ১০–এর ভেতর পেয়েছে ৭ দশমিক ২। আর রটেন টমাটোজের ১০০ জন টমেটোরিয়ানের কাছে এই ছবি পেয়েছে ৯০ শতাংশ নম্বর।

default-image
খাঁচায় আটকা মুরগিগুলো দেখে বলরামের মনে হয়, সেগুলো মুরগি নয়। বরং তাঁদের মতো সাধারণ মানুষেরই জীবন। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে মানুষ এভাবে আটকে আছে এক অদৃশ্য খাঁচায়।

ছোটবেলায় বলরামের বাবা যক্ষ্মায় মারা যায়। পিতার লাশ যখন পোড়ানো হচ্ছে, সেই সময় নড়ে ওঠা পা দেখে ছোট্ট বলরাম প্রথম বুঝেছিল, ‘মুক্তি পাওয়া সহজ নয়’। খাঁচায় আটকা মুরগিগুলো দেখে বলরামের মনে হয়, সেগুলো মুরগি নয়। বরং তাঁদের মতো সাধারণ মানুষেরই জীবন। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে মানুষ এভাবে আটকে আছে এক অদৃশ্য খাঁচায়। এভাবে আটকে থাকতে থাকতে তাদের পেয়ে বসেছে বন্দিত্বের নেশায়। দাসত্ব হয়ে উঠেছে আসক্তি।

default-image

তাই মুরগিরা খাঁচার ভেতর দিয়ে অন্য সব মুরগিকে মাংসের টুকরা হতে দেখলেও নিজেরা ডানা ঝাপটে পালানোর চেষ্টা করে না। তার কাছে, মানুষও তাই। বন্দী মানুষের হাতে তাই চাবি ধরিয়ে দিলে সে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটুর ওপর মাথা ঠেকিয়ে বসে পড়ে। জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এই সব শৃঙ্খল থেকে যেকোনো মূল্যে মুক্ত হতে চায় বলরাম। কাজ শুরু করে অশোক আর পিঙ্কির ড্রাইভার হিসেবে। একসময় সে জেনে যায়, দাসত্ব মানে কেবল গাড়ি চালানো আর চায়ের ট্রে আগানো নয়, মালিকের সব অন্যায়ের দায় নিজের কাঁধে নেওয়াও।

default-image

এক রাতে পিঙ্কি চলে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। সেই সময় বলরামই হয়ে ওঠে অশোকের সবচেয়ে আপনজন। তারপর ঝুমবৃষ্টিতে অশোককে খুন করে টাকাপয়সা নিয়ে পালিয়ে যায় বলরাম। পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাকে খুঁজে পায় না। কেন? বলরামের ভাষায়, ‘আমার চেহারা অর্ধেক ভারতীয়র সঙ্গে মেলে। আমি ভারতীয় তারুণ্যের প্রতিনিধি। আমিই ভবিষ্যতের ভারত।’ এই টাকা দিয়ে সে নিজের ব্যবসা শুরু করে। আর সেখানে যে সফলতা তাকে নিজে এসে ধরা দেয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। সংক্ষেপে, এই হলো সিনেমা।

default-image
বিজ্ঞাপন

ছবির সংলাপ বেশ শক্তিশালী। নেপথ্য সংগীত বেশ লেগেছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় সাউন্ড একটু চড়া ছিল। সেটুকু না থাকলে, নীরবতা চিৎকার করে ওই সময়টাকে আরও নিদারুণভাবে প্রকাশ করতে পারত। সহ–অভিনয়শিল্পী হিসেবে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আর রাজকুমার রাও যথাযথ ছিলেন। তাঁদের ছাড়িয়ে গেছেন বলরাম চরিত্রের আদর্শ গৌরব। তাঁর অভিনয় চোখে, মনে লেগে থাকার মতো। পরিচালক দারুণভাবে কিছু না বলেই কেবল ক্যামেরার বুদ্ধিদীপ্ত, অর্থপূর্ণ ব্যবহারে অনেক কথা বলেছেন।

default-image

ছোটবেলায় ক্লাসে এক শিক্ষক বলরামকে বলেছিল, এক প্রজন্মে একবারই জন্মে ‘হোয়াইট টাইগার’। পরবর্তী সময়ে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে না পারলেও সিনেমা শেষে বলরামও জানিয়ে দেন, তিনিই সেই ‘দ্য হোয়াইট টাইগার’।

বলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন