default-image

আ মুভি ‘বাই দ্য উইম্যান, অব দ্য উইম্যান, ফর দ্য উইম্যান।’ আসলেই কি তাই? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি। তিন প্রজন্মের তিন নারীর কাহিনি এটি। সিনেমার কাহিনি লিখেছেন একজন নারী এবং পরিচালনাও তিনিই করেছেন। কিন্তু ‘ফর দ্য উইম্যান’ কি? নারীর জন্য সিনেমা...এই জায়গায় এসে ভাবনাকে খানিকটা বিরতি দিতে হয়।

১. ফেসবুকে সাংবাদিক শওকত হোসেন মাসুমের পোস্ট দেখে বিকেলেই নেটফ্লিক্সে সিনেমাটি দেখতে বসে যাই। আমি সেই অর্থে সিনেমার সমঝদার দর্শক নই। প্রথম কয়েক মিনিটে কোনো সিনেমা যদি টেনে ধরতে না পারে, তাহলে সেটি আর দেখাই হয় না। কিন্তু ‘ত্রিভঙ্গ’ টেনে ধরল এবং ভালোভাবেই ধরে রাখল। এই যে আমাকে ধরে রাখতে পারল, সে জন্যই সিনেমাটিকে আমি একটি ভালো সিনেমা হিসেবে বিবেচনায় নিই।

default-image

২. সিনোমটির ঠিক কোন জিনিসটা এভাবে টেন ধরে রাখল? কাজলের অভিনয়! কাজল বরাবরই আমার প্রিয় অভিনেত্রী। এই সিনেমায় বাকিদের অভিনয়ও ভালো হয়েছে। মূলত সিনেমার গল্পটা, গল্প বলার ধরনটাই আমাকে আকৃষ্ট করেছে। সেই গল্পটা কী?

তিন প্রজন্মের তিনজন নারীর গল্প এটি। আরও সরাসরি বললে তিন প্রজন্মের তিন মায়ের কাহিনি এই সিনেমা। তবে ‘মা’ শব্দটা উচ্চারণ করলেই চিরায়ত যে প্রতিমূর্তিটা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, এই সিনেমার ‘মা’রা ঠিক সেই রকম নন। অন্তত কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে যে মা, তিনি তো ননই।

তাহলে এটি কি প্রথা ভাঙার কোনো সিনেমা? আমাদের সমাজে, জীবনে ‘মা’ নামের যে প্রতিষ্ঠানটি আদিকাল থেকে তৈরি হয়ে আছে, তা ভেঙে দেওয়ার কোনো সিনেমা? জুতসই উপসংহারে আসা কঠিন বৈকি।

বিজ্ঞাপন

৩. ‘আই হেট মাই মাদার’ প্রবলভাবে উচ্চারণ করে যে অনুরাধা, সে নিজেও একজন মা। অনুরাধা তার মাকে ‘মা’ বলে সম্বোধনই করে না। ডাকে তার নাম ধরে—নয়ন বলে। বিখ্যাত লেখক নয়নতারার মেয়ে হলিউডের নায়িকা, নৃত্যশিল্পী অনুরাধার মায়ের প্রতি প্রবল ঘৃণার কাহিনি প্রচারকে কি আমরা সিনেমাওয়ালার ধৃষ্টতা বলব! সন্তান তার মাকে এতটা প্রবলভাবে ঘৃণা করতে পারে?

ত্রিভঙ্গের গল্পকার এবং পরিচালক রেনুকা শাহানীর অবশ্য কৈফিয়ত আছে এ ব্যাপারে। অন্যত্র এক সাক্ষাৎকারে এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তিনি, বলছেন, এ সংলাপটি তিনি জীবন থেকে তুলে এনেছেন। কাহিনির প্রেরণাও নাকি জীবনেরই গল্প। সদ্য বিয়ে হওয়া এক মেয়েকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, নিশ্চয়ই তুমি তোমার বাড়িকে খুবই মিস করবে। মেয়েটি জবাবে বলেছিল, মোটেও না। আমি বরং খুশি যে আমি আমার মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারছি। আমি আমার মাকে ঘৃণা করি।

default-image

আমি আমার ‘মাকে ঘৃণা করি’ কথাগুলো প্রবলভাবে আলোড়িত করে গল্পকার-পরিচালক রেনুকাকে। তাঁর ভাষায়, ‘এই প্রথম আমি এমন কাউকে পেলাম যে কিনা তার মাকে ঘৃণা করে।’ সেই অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করেই তিনি ‘ত্রিভঙ্গ’র কাহিনির শরীর সাজিয়েছেন, এটি তার স্বীকারোক্তি।

কিন্তু অনুরাধা তার মা নয়নতারাকে ঘৃণা করে কেন? লেখক হতে চাওয়া নয়নতারা বাড়িভর্তি অতিথিদের উপস্থিতিতে শাশুড়ির গঞ্জনায় (এখানেও কিন্তু আরেক নারী) সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। বাবার নাম মুছে দিয়ে সন্তানের নামের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত করে দিয়ে তাদের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। এই পর্যন্ত মনে হবে এটি একটি প্রথা ভাঙার সিনেমা।

default-image

রক্ষণশীল একটি সমাজে এতটা বিদ্রোহ করতে পারা কম কথা নয়। কিন্তু সেই নয়নতারাই নিজের মেয়ে কীভাবে বেড়ে উঠছে, কোথায় তার সমস্যা তার খবর রাখতে পারেননি। নিজের প্রেমিকের হাতে কন্যা অনুরাধার দিনের পর দিন যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার তথ্য তার কাছে পৌঁছাতেই পারেনি। এইখানে নয়নতারাকে ঠিক মা মনে হয়নি, মনে হয়েছে লেখক হওয়ার নেশায় দিশা হারানো এক নারীমাত্র।

ব্রোকেন ফ্যামিলিতে মায়ের প্রেমিকের হাতে নিগৃহীত হওয়া, বাবা মায়ের ডিভোর্স নিয়ে স্কুলে প্রতিনিয়ত তিরস্কারের শিকার হওয়া অনুরাধাকে একদমই দেখতে পাননি লেখক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকা নয়নতারা। সেটা কী করে সম্ভব! যখন তিনি এসব জেনেছেন, তখন সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তত দিনে অন্য রকম এক অনুরাধার জন্ম হয়ে গেছে।

default-image
বিজ্ঞাপন

৪. কিন্তু ‘ত্রিভঙ্গ’ মাকে ঘৃণা করার সিনেমাও নয়। তিন প্রজন্মের তিন মায়ের লড়াইয়ের গল্প এটি। প্রত্যেকের লড়াইটা তাদের নিজেদের মতো, ভিন্ন ভিন্ন। নয়নতারা লড়াই করেছেন তার স্বপ্নপূরণের লেখক হওয়ার, প্রথা ভেঙে সন্তানদের মায়ের পরিচয়ে বড় করে তোলার। মেয়ের জীবনের দুর্বিষহ সময়টার কথা যখন জেনেছেন, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন নয়নতারা। নিজের আত্মজীবনীতে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে তার দায়ও নিয়েছেন। এখানে তিনি ঠিকই মা হয়ে উঠেছেন, প্রচলিত ধারণায় আমরা হয়তো তাকে ব্যর্থ মা হিসেবে অভিহিত করতে পারি। কিন্তু লেখক নয়নতারাকে ছাপিয়ে তার মাতৃত্ব যে জেগে উঠেছিল, সেটিকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

নয়নতারার লড়াইটা ছিল মেয়ে মাশাকে পরিপূর্ণ সুন্দর একটা পরিবেশ দেওয়ার। আর মাশার লড়াই? তার লড়াইটা হচ্ছে পরিবারের সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ একটা জীবনযাপনের। মাশার লড়াইটা কি তা হলে আপসকামিতার লড়াই? নয়নতারার বিদ্রোহ, অনুরাধার নিজের মতো জীবনযাপনের পথ পেরিয়ে তৃতীয় প্রজন্মের মেয়ে মাশা কি তা হলে আত্মসমর্পণের চিত্র! অনুরাধারা আর মাশাকে মুখোমুখি করে মাশাকে দিয়েই কি সিনেমার মূল বক্তব্য দিতে চেয়েছেন এই সিনেমার নির্মাতা! সমাজকে, পরিবারকে মেনে নিয়ে খাপ খাইয়ে চলার উপদেশই কি এই সিনেমার মূল বার্তা! না, অতটা সাদামাটা কিংবা সরলীকরণ ঠিক হবে না মোটেও।

default-image

. অনুরাধার বিচারের আদালতে যে অপরাধে আসামির কাঠগড়ায় মা নয়নতারা, অনু আর মাশার মুখোমুখি অবস্থানে অনুরাধাকেও ঠিক একই জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। সন্তানের খোঁজখবর রাখতে পারেনি বলে যে মায়ের প্রতি অনুরাধার এত অভিযোগ—তার নিজের মেয়ের জীবনের লড়াই আর কষ্টের খবরও কিন্তু সে রাখতে পারেনি। দুই প্রজন্মের দুই মার কাছেই সন্তানের নিগৃহীত হওয়ার তথ্যটা গোপনই থেকে গেছে। সেটা কেমন করে? দুই মায়ের কোনো মা-ই সন্তানদের সঙ্গে ‘সব কথা বলা যায়’ এমন একটা সম্পর্ক গড়তে পারল না কেন! তাহলে কি ‘ত্রিভঙ্গ’ পরিবারের মধ্যে যোগাযোগহীনতার সিনেমা! এই যে নয়নতারা স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল, স্বামীর সঙ্গে তার আর যোগাযোগই হলো না। অথচ তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে কিছুদিন পরই। এই যে মেয়ে অনুরাধা বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য টেলিফোন করে কান্নাকাটি করেছে, অথচ ‘তোমার মা চাইবে না’ বলে বাবা আর কোনো উদ্যোগই নিল না, খোঁজ করতে চাইল না মেয়ের কী সমস্যা—এগুলো কি যোগাযোগহীনতার সংকট!

default-image

৬. ত্রিভঙ্গ কি তাহলে নারীবাদের সিনেমা? সমালোচকেরা অবশ্য ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন—এই সিনেমায় নারীবাদ (ফেমিনিজম) ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি। পরিচালক রেনুকা অবশ্য সেটা মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, ত্রিভঙ্গের তিন নারীই ফেমিনিস্ট। তবে তাদের প্রত্যেকের ফেমিনিজমটা আলাদা আলাদা, তাদের নিজেদের মতো।

তাঁর মত হচ্ছে, ধরুন একজন নারী অদ্ভুত, প্রচলিত মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বসল। সবার কাছেই সেটি অগ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এই সিদ্ধান্তে অটল থাকার পর হঠাৎ একদিন মনে হলো—না, সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। গা–ঝাড়া দিয়ে পুরোনো সেই সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মতো করে আবার নতুন জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল। রেনুকার চোখে ‘ফেমিনিজম হচ্ছে ইনডিপেনডেনস অব চয়েস, পছন্দের স্বাধীনতা’।

default-image

ত্রিভঙ্গে অবশ্য তিন নারীরই পছন্দের স্বাধীনতা আছে। নয়নতারা তার পছন্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, অনুরাধা নিয়েছেন তার পছন্দের। কিন্তু মাশা যখন তার পছন্দের সিদ্ধান্ত নিতে গেছে তখনই অনুরাধার মনে হয়েছে—এটি ঠিক না। তখনই অনুরাধা মা হিসেবে নিজের সিদ্ধান্তটা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিতে গেছে, যেমন নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিল নয়নতারা। মাশা অবশ্য তার সিদ্ধান্তেই অটল থাকার ঘোষণা দিয়েছে, যেই সিদ্ধান্তটা অনুর চোখে কম্প্রোমাইজ মনে হলেও মাশার কাছে এটিই হচ্ছে তার ইনডিপেন্ডেনস অব চয়েস—পছন্দের স্বাধীনতা।

৭.স্ট্রোকে নয়নতারার মৃত্যু হলেও ত্রিভঙ্গ ট্র্যাজিক সিনেমা নয়। বরং নয়নতারা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিন প্রজন্মের মধ্যে একটি নিবিড় যোগসূত্র তৈরি করে গেছেন, যদিও তার প্রধান কারিগর হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন নয়নতারার জীবনী লেখক মিলন। আত্মজীবনীর ভেতর নিজের ভূমিকার, দুর্বলতার, অক্ষমতার সবকিছু স্বীকার করে মেয়ের কাছে ক্ষমাটমা চেয়ে, নিজেকে ভারমুক্ত করেই তিনি পরপারের যাত্রী হয়েছেন। আর অনুরাধা মায়ের মৃত্যু আর নিজ মেয়ের জীবন বাস্তবতায় ঠুস খেয়ে যেন জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করলেন। ত্রিভঙ্গ কি তাহলে জীবনের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সিনেমা!

বিজ্ঞাপন
বলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন