কেওড়াতলা শ্মশানের প্রবেশমুখ
কেওড়াতলা শ্মশানের প্রবেশমুখ
default-image

শ্মশানঘাটে বুক খাঁ খাঁ করা এক দৃশ্যের অবতারণা হলো। ফুলের স্তূপে ঘুমিয়ে ছিলেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। শেষবারের মতো তাঁর কপাল আর গাল ছুঁয়ে আদর করে দিলেন পৌলমী বোস। শেষবারের মতো চুমু দিলেন বাবার গাল আর কপালে। এবার তাঁর পাড়ি জমানোর পালা অজানায়। একদল যুবক চুল্লির দিকে নিয়ে গেলেন সৌমিত্রকে।

৮৫ বছরের একজন মানুষ কতটা সচল থাকতে পারেন? ৮৫ বছরে একজন শিল্পীর ভান্ডার কতটা ঋদ্ধ হতে পারে, সৌমিত্রর দিকে না তাকালে তা ভাবা যাবে না। সৌমিত্রর শেষ বিদায়ে মানুষের মিছিলে তাকালে হয়তো কিছুটা বোঝা যাবে। যখন মহামারি চলছে, ভারত যখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়, মানুষে মানুষে দূরত্ব এঁকে দিয়েছে অদৃশ্য মৃত্যুদূত, সেও ঠেকাতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে। সেই মিছিলের সামনে ছিলেন ভারতের ওই রাজ্যের স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সৌমিত্রর মরদেহবাহী গাড়ির সঙ্গে হেঁটে কেওড়াতলা মহাশ্মশান পর্যন্ত গেছেন তিনি। শিল্পীর প্রতি এমন সম্মান, সমগ্র শিল্পীসমাজকে প্রাণিত করেছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

সৌমিত্রর শেষ যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন ‘রবীন্দ্রনাথ’। তাঁর মরদেহবাহী গাড়ির পেছনে ছিল আরেকটি গাড়ি, তাতে শিল্পী ও সাউন্ডবক্স। শিল্পীরা গাইছিলেন ‘তোমারও অসীমে’, ‘এই কথাটি মনে রেখো’, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। গানের ফাঁকে ফাঁকে বাচিকশিল্পী আবৃত্তি করছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা।

আবৃত্তি করতে ভালোবাসতেন সৌমিত্র, ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ বহু মানুষকে বহু চিঠি লিখেছিলেন। সেসবের প্রায় ১ হাজার ৪১৬টি চিঠি পাঠ করেছেন সৌমিত্র। সেগুলো নিয়ে তৈরি হয়েছে ৭৬টি অডিও সিডির এক অ্যালবাম। নাম ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠিপত্র’। তা প্রকাশ করেছে ভাবনা রেকর্ডস। প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে স্টুডিওতে সেই চিঠিগুলো পাঠ করেছেন সৌমিত্র। এর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’, ‘ছেলেবেলা’, ‘আত্মপরিচয়’ পাঠ করেছেন তিনি। ‘গীতাঞ্জলি’র গান ও কবিতা নিয়ে যে অ্যালবামটি বেরিয়েছিল, সেখানেই কবিতাগুলো আবৃত্তি করেছেন সৌমিত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৯৫টি ছোটগল্প পাঠ করেছেন কয়েকজন বাচিকশিল্পী, তাঁদের অন্যতম সৌমিত্র। ভাবা যায়?

default-image

রবীন্দ্রসদন থেকে কেওড়াতলা। প্রতিটি বাড়ির সামনে মানুষ। প্রতিটি পথে মানুষ। শ্রদ্ধা জানাতে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা, তাঁদের ‘অপু’, তাঁদের ‘ফেলুদা’ শেষবারের মতো প্রদক্ষিণ করবে সেই পথ। এসব পথ বেয়ে বছরের পর বছর সৌমিত্র গেছেন মঞ্চে অভিনয় করতে, সিনেমার শুটিং করতে। অভিনয়, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, নাটক ও কবিতা লেখায় ছিল তাঁর আনন্দ। এসব করে নিজে আনন্দ পেয়েছেন, মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন সীমাহীন ভালোবাসা, রাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়েছেন বিপুল সম্মান। যদিও স্বীকৃতি, পুরস্কার বা সম্মাননার চেয়ে কাজের প্রবহমানতা তাঁর কাছে ছিল সবচেয়ে বড়। নতুনদের সঙ্গে নিয়ে চলতে পারাই ছিল তাঁর জন্য আনন্দের। এ রকম এক প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে একটি কাজ করতে করতে মানুষের দক্ষতা তৈরি হয়। পাশাপাশি শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতার কারণে একঘেয়েমির সঙ্গে লড়াই করতে হয় মানুষকে। জীবন্ত লাশ হতে চাইনি বলেই আমি ওই শূন্যতার সঙ্গে লড়াই করে গেছি। যত দিন দেহ চলবে, মন চলবে, শিল্পকর্মে সক্রিয় থেকে সেবা দিয়ে যাব।’

বিজ্ঞাপন
default-image

সৌমিত্রর শেষযাত্রায় নেমেছিল মানুষের ঢল। মানুষের হাতে হাতে তাঁর বিভিন্ন চরিত্রের বড় বড় বাঁধানো ছবি বলে দিচ্ছিল, ছবি হয়ে যাওয়া চলমান মানুষটিকে ভীষণ ভালো বেসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা। তাঁকে বিদায় জানাতে হলো চোখের জলে। কেওড়াতলা শ্মশানের প্রবেশমুখে কাঠবোর্ডে ‘অপু’র অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকটি ছবি। সেটার পাশে লেখা ছিল, ‘সংসারে অপু আর নেই’। কত বৈচিত্র্যময় চরিত্রে যে তিনি অভিনয় করেছেন, তা লিখে শেষ করার নয়। সেসব ছাপিয়ে ‘অপু’ই হয়েছে তাঁর পরিচয়! চরিত্রের সন্ধানে সর্বদা ছটফট করতেন সৌমিত্র। এই ছটফটানি কবে যাবে? ২০০৭ সালে ঢাকায় এ রকম এক প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, ‘ওটা আমি মাটি নিলে তবে যাবে।’

default-image

বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন সৌমিত্র। আড্ডায় তাঁকে পেয়ে যেকোনো মানুষ আলোকিত হতেন। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে তাঁর সহশিল্পী শর্মিলা ঠাকুর আজ বলছিলেন সে কথা। এত পড়াশোনা করা মানুষ তিনি, যে তাঁর সঙ্গে আড্ডায় বসলে অনেক কিছু শেখা যেত। শিল্পকলা, রাজনীতি, দর্শনসহ এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে তাঁর পড়াশোনা ছিল না। তবে মৃত্যুর সময় যদি নিয়ে যাওয়া যায়, কোন দুটি বই নিয়ে যাবেন? জীবদ্দশায় এ প্রশ্নে সৌমিত্র বলেছিলেন, ‘গীতবিতান’ ও ‘মহাভারত’-এর নাম। পরে নিজেই একটি বইয়ের নাম বদলে নেন। ‘মহাভারত’-এর বদলে নিতে চেয়েছিলেন সুকুমার রায়ের ‘আবোল-তাবোল’। রবীন্দ্রনাথ আর সুকুমার রায়কে নিয়েই পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন পরপারে।

মন্তব্য পড়ুন 0