আনোয়ারার জন্য দুঃখ প্রকাশ, আসাদে মুগ্ধতা

অভিনেত্রী আনোয়ারা ও অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ
কোলাজ : প্রথম আলো

অভিনয়শিল্পী আনোয়ারা বেগমের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের খবরটি আগে থেকে জানতেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ বুধবার যখন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে জানতে পারেন, আজীবন সম্মাননা সশরীর নিতে আসতে পারেননি আনোয়ারা। কারণ, তিনি অসুস্থ। আগে থেকে এই অসুস্থতার খবর জানতে না পারারা কারণে তাৎক্ষণিকভাবে এই অভিনয়শিল্পীর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। অন্যদিকে রাইসুল ইসলাম আসাদ আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্তির পর অনুভূতি প্রকাশ করে একটি বক্তব্য দেন। সেই বক্তৃতা মুগ্ধ করেছে প্রধানমন্ত্রীকে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২০ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে সেই মুগ্ধতার কথাও জানান।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২০ প্রদান উপলক্ষে গণভবন থেকে ভার্চূয়ালি যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
কোলাজ : সংগৃহীত

করোনার কারণে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে সশরীর উপস্থিত থাকতে পারেননি। গতবারের মতো এবারও তিনি গণভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন। পুরস্কার প্রদানের পুরোটা সময় থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ২০২০ সালের চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় সেরাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কাজটি করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

পুরস্কার প্রদানের শুরুতে আজীবন সম্মাননা পাওয়া দুজনের নাম ঘোষণা করা হয়। একজন ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, অন্যজন আনোয়ারা বেগম। পুরস্কার নিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসেন আসাদ কিন্তু মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি আনোয়ারা। এই অভিনয়শিল্পীর হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন তাঁর অভিনয়শিল্পী মেয়ে রুমানা ইসলাম মুক্তি। পুরস্কার গ্রহণ শেষে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রাইসুল ইসলাম আসাদ তাঁর বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ ও চলচ্চিত্রে তাঁর যুক্ত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। বক্তব্যে এই অভিনেতা সেলিম আল দীনের পথনাটক ‘চরকাঁকড়া ডকুমেন্টরি’র সংলাপও আওড়ান। শেষ করেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে। আসাদ বলেন, ‘যুদ্ধফেরত আসাদকে জোরজবরদস্তি করে চলচ্চিত্রে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ১৯৭২ বেতার-মঞ্চ, ’৭৩ সালে চলচ্চিত্র। যারা ঠেলাধাক্কা দিয়ে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। বাদ পড়ার ভয়ে তাঁদের কারও কারও নাম স্মরণ করছি না। তবে একজনের কথা বলতেই হয়, সোহেল সামাদ। সহযোদ্ধা। বয়সে ছোট, অধিকারে বড়। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরের ২৫ বা ২৬ তারিখে প্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঢাকায়। সেখানেই আমার কণ্ঠকে প্রথম ব্যবহার করা হয়। সোহেল সামাদ আমাকে মঞ্চে তুলে দেয়। ব্যস, শুরু হয়ে গেল। কৃতজ্ঞতা জানাই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতি; যারা আমাকে এ সম্মানের উপযুক্ত মনে করেছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত সবার পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষে এসে আসাদের জয় বাংলা স্লোগানকে মনে ধরার কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘জয় বাংলা স্লোগান শোনার পর, যে জয় বাংলা স্লোগান, যা একদিন হারিয়ে গিয়েছিল, যে স্লোগান শুনে লাখো মানুষ বুকের রক্ত দিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তেমনই একজনের মুখে স্লোগানটি শুনে সত্যিই আবারও মুগ্ধ হয়েছি। তাঁকে (রাইসুল ইসলাম আসাদ) আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ আসাদের কথা শেষ করেই আনোয়ারার কথাও মনে করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বললেন, ‘আমি জানতাম না আনোয়ারা অসুস্থ। শুনে খুব দুঃখ পেলাম। তাঁর রোগমুক্তি কামনা করনি। তাঁর যেকোনো প্রয়োজনে আমি আছি প্রস্তুত।’

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২০ প্রদান অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফেরদৌস ও পূর্ণিমা, দেখা গেছে সাজু খাদেমকেও (মাঝে)।

আজ বুধবার বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২০ প্রদান অনুষ্ঠান। দ্বিতীয় পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নেন নব্বইয়ের দশকের অভিনেত্রী রোজিনা, নূতন ও অরুণা বিশ্বাস। এ সময়ের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে মিম, ইমন, সাইমন, পূজা চেরি, তমা মির্জা আর দীঘিরাও পুরোনো দিনের চলচ্চিত্রের বিভিন্ন গানের মেডলিতে নৃত্য পরিবেশন করেন। চলচ্চিত্রের জ্যেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী ও নতুন প্রজন্মের নায়ক–নায়িকাদের নাচের কোরিওগ্রাফ করেন ইভান শাহরিয়ার সোহাগ। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন আবিদা সুলতানা, রফিকুল আলম, মমতাজ, লুইপা, প্রতীক হাসান ও অনুপমা মুক্তি। এ ছাড়া সাদিয়া ইসলাম মৌ ও তাঁর দলের একটি সম্মেলক নৃত্যও ছিল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ফেরদৌস ও পূর্ণিমা।

পুরস্কার হাতে গাজী রাকায়েত
ছবি : সংগৃহীত

চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর চলচ্চিত্রের শিল্পী ও কলাকুশলীদের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেয় বাংলাদেশ সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তালিকা প্রকাশ করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এবার আজীবন সম্মাননা পেলেন আনোয়ারা বেগম ও রাইসুল ইসলাম আসাদ। নির্মাতা ও অভিনেতা গাজী রাকায়েত পরিচালিত ‘গোর’ সর্বোচ্চ ১১টি পুরস্কার জিতে নিয়েছে। আটটি পুরস্কার নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চয়নিকা চৌধুরী পরিচালিত ‘বিশ্বসুন্দরী’। এবার যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে ‘গোর’ ও ‘বিশ্বসুন্দরী’।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২০ প্রাপ্ত অন্যরা হলেন শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সরকারি অনুদানের ছবি জান্নাতুল ফেরদৌসের ‘আড়ং’, শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্র সৈয়দ আশিক রহমানের ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়’, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক গাজী রাকায়েত (গোর), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা প্রধান চরিত্রে সিয়াম (বিশ্বসুন্দরী), শ্রেষ্ঠ প্রধান অভিনেত্রী রোজালিন দীপান্বিতা মার্টিন (গোর), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পার্শ্বচরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু (বিশ্বসুন্দরী), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পার্শ্বচরিত্রে অপর্ণা ঘোষ (গণ্ডি), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা খল চরিত্রে মিশা সওদাগর (বীর), শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী মুগ্ধতা মোরশেদ ঋদ্ধি (গণ্ডি), শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার মো. শাহাদৎ হোসেন বাঁধন (আড়ং)। শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক বেলাল খান (হৃদয়জুড়ে), শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক প্রয়াত সহিদুর রহমান (বিশ্বসুন্দরী), শ্রেষ্ঠ গায়ক ইমরান মাহমুদুল (বিশ্বসুন্দরী), শ্রেষ্ঠ গায়িকা যুগ্মভাবে দিলশাদ নাহার কনা (বিশ্বসুন্দরী), সোমনূর মনির কোনাল (বীর), শ্রেষ্ঠ গীতিকার কবির বকুল (বিশ্বসুন্দরী), শ্রেষ্ঠ সুরকার ইমরান মাহমুদুল (বিশ্বসুন্দরী), শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার গাজী রাকায়েত (গোর), শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার গাজী রাকায়েত (গোর), শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা ফাখরুল আরেফীন খান (গণ্ডি), শ্রেষ্ঠ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম, শ্রেষ্ঠ শিল্পনির্দেশক উত্তম কুমার গুহ (গোর), শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক যুগ্মভাবে পঙ্কজ পালিত ও মাহবুব উল্লাহ নিয়াজ (গোর), শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক কাজী সেলিম আহম্মেদ (গোর), শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জা এনামতারা বেগম (গোর), শ্রেষ্ঠ মেকআপম্যান মোহাম্মদ আলী বাবুল (গোর)। ২০২০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য জমা পড়েছিল মোট ১৪টি পূর্ণদৈর্ঘ্য, ৭টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ও ৬টি প্রামাণ্যচিত্র।