এ টি এম শামসুজ্জামানের প্রয়াণে তাঁদের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন স্মৃতিচারণা করে শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রয়াত অভিনেতার প্রতি
এ টি এম শামসুজ্জামানের প্রয়াণে তাঁদের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন স্মৃতিচারণা করে শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রয়াত অভিনেতার প্রতিছবি: কোলাজ
অভিনয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার এ টি এম শামসুজ্জামানের। এ সময়ে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করেছেন অনেক পরিচালক ও অভিনয়শিল্পী। শামসুজ্জামানের প্রয়াণে তাঁদের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন স্মৃতিচারণা করে শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রয়াত অভিনেতার প্রতি।
default-image

দুই দিন আগেও ইউটিউবে তাঁকে দেখছিলাম

সুচন্দা, অভিনেত্রী ও পরিচালক

সুন্দর মনের মানুষ তো বটেই, তিনি একজন রসিক মানুষও ছিলেন। সবাইকে হাসাতে পারতেন। আমি যখন নারায়ণ ঘোষ মিতার ছবি চাওয়া থেকে পাওয়াতে অভিনয় করি, তখন তিনি সহকারী পরিচালক। তখন থেকেই আমাদের চমৎকার সম্পর্ক। আমাদের বাড়ি যখন গেন্ডারিয়ায়, তখন তিনিও সেখানে থাকতেন, আমাদের বাসায় আসতেন, আড্ডা দিতেন। আমাকে কখনো কখনো শুটিং স্পট থেকে বাসায় পৌঁছেও দিতেন। আস্তে আস্তে আব্বা-আম্মাসহ আমাদের পুরো পরিবারের সঙ্গে এ টি এম ভাইয়ের সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি বাসায় এলে সবাইকে জমিয়ে রাখতেন। অনেক গল্পগুজব হতো। আমার পরিচালনায় হাজার বছর ধরে ছবিতে তাঁকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে পেয়েছি। ছবিটার যখন পরিকল্পনা চলছিল, তখনই উপন্যাসের মকবুল চরিত্রে এ টি এম শামসুজ্জামান ভাইয়ের কথাই ভাবি। তাঁকে প্রস্তাব দেওয়ার পর তিনি সানন্দে রাজি হন।

বিজ্ঞাপন

সেখানে তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছেন। শুটিংয়ের সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। তাঁর চলে যাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত বেদনার। দুই দিন আগেও ইউটিউবে তাঁর অভিনীত নাটকের ক্লিপ দেখছিলাম, কথাবার্তাও শুনছিলাম। কিন্তু তিনি এভাবে চলে যাবেন, কল্পনাও করতে পারিনি।

default-image

আমাদের আড্ডার প্রাণ ছিল তিনি

আলমগীর, অভিনেতা ও পরিচালক

একে একে চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবাই চলে যাচ্ছেন। আজ এ টি এম ভাইও চলে গেলেন। বয়সের তারতম্য সবার কিছু না কিছু ছিল। সব ছাপিয়ে আমাদের বন্ধুত্বটাই বড় ছিল। একটা পারিবারিক বন্ধন ছিল আমাদের। এ টি এমের সঙ্গে অনেক ছবিতে কাজ করেছি। তিনি একজন গুণী মানুষ, বড় মনের মানুষ, মহান শিল্পী। রাজ্জাক ভাই, আমি, ফারুক, এ টি এম—এঁদের মধ্যে এ টি এম ছিলেন সবচেয়ে বেশি আড্ডাবাজ। একটা পরিবারের সবাই তো আর আড্ডাবাজ হয় না। একেক জন একেক রকম হয়। আমাদের গ্রুপে আড্ডার প্রাণ ছিলেন এ টি এম শামসুজ্জামান।

default-image

তাঁর সান্নিধ্য আমার জীবনে বড় পাওয়া

সালাহউদ্দিন লাভলু, অভিনেতা ও পরিচালক

এ টি এম শামসুজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম কাজ রঙের মানুষ ধারাবাহিক নাটকে। তাঁর সম্পর্কে জানা থাকলেও, পরিচয় ছিল না। ধারাবাহিকটি করতে গিয়েই তাঁর কাছে আসা। কাজ করতে গিয়ে দেখলাম তিনি চলচ্চিত্রের জলন্ত এক ডিকশনারি। কাজের ফাঁকে তাঁর পাশে বসে বসে চলচ্চিত্রের ইতিহাস, তখনকার কাজের ধারা, শিল্পের বোধ, সেই সময়কার গুণী শিল্পী ও পরিচালকদের গল্প শুনতাম।

এ টি এম ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি কত কী যে শিখেছি, বলে শেষ করা যাবে না। রঙের মানুষ–এর পর ভবেরহাট, ঘর কুটুম ধারাবাহিকগুলোতেও তাঁর চরিত্রগুলো দারুণ আলোচিত ছিল। এরপর এক ঘণ্টার নাটক পত্র মিতালি, পাত্রী চাই, ওস্তাদ জি, গরুচোরসহ অসংখ্য আলোচিত নাটকে অভিনয় করেছেন এ টি এম ভাই। তাঁর একটা কথা খুব মনে পড়ে। শুটিংয়ে আমার শট ডিভিশন, আমার গল্প বলা, ক্যামেরার কাজ দেখে প্রায়ই বলতেন, ‘লাভলু তুমি তো নাটক বানাও না, পুরাই সিনেমা বানাও। তোমাকে সিনেমাই বানাতে হবে।’ আমার সৌভাগ্য, আমার প্রথম সিনেমা মোল্লাবাড়ির বউ তাঁরই গল্প নিয়ে করা। তিনি আমাকে সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তাঁর সান্নিধ্য আমার জীবনে বড় পাওয়া।

default-image

সেটিই ছিল আমাদের শেষ দেখা

ববিতা, অভিনেত্রী

সেই পুতুল খেলার বয়স থেকে এ টি এম শামসুজ্জামানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আমার বড় বোন সুচন্দার সূত্রে আমাদের বাড়িতে যাওয়া–আসা ছিল তাঁর। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। প্রায়ই বলতেন, তুমি সিনেমায় অভিনয় করবে? বড় হলাম, একদিন অভিনয়ে নামলাম। যত দূর মনে পড়ে, তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম ছবি নয়ন মণি।

বিজ্ঞাপন

এরপর লাঠিয়াল, গোলাপী এখন ট্রেনে, ম্যাডাম ফুলিসহ অনেক বিখ্যাত ছবিতে কাজ করেছি। তাঁর একটা চমৎকার গুণ ছিল। যখন কোনো ছবিতে অভিনয় করতেন, তখন তাঁর নিজের জন্য ভাবতেন না। ছবির সবার কাজ নিয়ে ভাবতেন। শট নেওয়ার সময় অন্যদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতেন। তিনি ছবিতে থাকলে আমি সব সময়ই শট দেওয়ার পর ঠিকঠাক হলো কি না, তাঁর কাছে জানতে চাইতাম। অনেক সময় আমি যেসব কথা কাউকে বলতে চাইতাম না, তাঁর সঙ্গেই ভাগাভাগি করতাম। বছর দুয়েক আগে তিনি হাসপাতালে ছিলেন। তখন আমি, চম্পা ও সুচন্দা আপা তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমাদের পেয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা গল্প করেছেন তিনি। সেটিই ছিল আমাদের শেষ দেখা।

default-image

এখনকার অভিনয়শিল্পীদের উচিত তাঁকে নিয়ে গবেষণা করা

কাজী হায়াৎ, পরিচালক

এ টি এম শামসুজ্জামান সামাজিক আড্ডায় মরেছেন। ফেসবুকে মরেছেন। চলচ্চিত্রে মরেছেন। এবার তিনি মরে প্রমাণ করলেন যে তিনি সত্যিই মরেছেন। এটা আমার জন্য অত্যন্ত বেদনার। তিনি আমার খুব কাছের মানুষ। আমার জীবনের একটা বড় অংশজুড়ে ছিলেন তিনি। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাতে ফোনে কথা বলেছি।

আমার ছবি দায়ীতে অভিনয় করে তিনি সেরা অভিনেতার পুরস্কার হাতে তোলেন। তাঁর আর সমস্ত পুরস্কার খল, পার্শ্ব বা কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। তিনি একজন আদর্শ মানুষ। এখনকার অভিনয়শিল্পীদের উচিত তাঁকে নিয়ে গবেষণা করা। এ টি এম শামসুজ্জামানের জীবন থেকে তাঁদের অনেক কিছু শেখার আছে।

default-image

তিনি আমার চোখে একজন শিক্ষক

মতিন রহমান, পরিচালক ও শিক্ষক

তিনি মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সৎ, সরল আর মানবিক গুণের অধিকারী। চিত্রকলা, সাহিত্য আর সিনেমা—এই তিন শাখায়ই তাঁর দখল ছিল। কিন্তু এসব চাপা পড়ে গেছে তাঁর খল আর কৌতুক অভিনয়ের আড়ালে। এ টি এম শামসুজ্জামানের কাছের মানুষেরা ছাড়া অন্যরা তাঁর এই দিকগুলো সম্পর্কে কিছুই জানল না। তিনি আমাকে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তৈরি করেছেন। আমাকে ধরে ক্যামেরার পেছনে দাঁড় করিয়েছেন। আমার প্রথম ছবি লাল কাজল–এর চিত্রনাট্য আর সংলাপ তাঁর লেখা। তিনি আমার চোখে পরোক্ষভাবে একজন শিক্ষক।

default-image
ঢালিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন