বনানী কবরস্থানে কবরীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়
বনানী কবরস্থানে কবরীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়ছবি: প্রথম আলো

‘প্রতিমুহূর্তেই আমি আমার সামনে একটা নতুন পৃথিবী দেখতে পাচ্ছি। মানুষের জীবনে অনেক দরজা থাকে। তাঁর মধ্যে মৃত্যু হলো শেষ দরজা। মৃত্যুর কথা মনে হলে আমার চোখ জলেতে ভরে যায়। কবরী আর কোনো দিন ফিরে আসবে না, সামান্য একটু কথা বলতেও নয়। সবাইকে ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে যেতে হবে, ভাবলেই ভয় লাগে। তাই মৃত্যুর আগপর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। যত দিন বাঁচব, মানুষের কাছে আপন হয়ে থাকতে চাই, মানুষের কাছাকাছি থাকতে চাই। আরও কিছু উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।’
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়েখ্যাত সারাহ বেগম কবরী। গতকাল শুক্রবার রাতে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন, চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর প্রস্থান অগণিত মানুষকে অশ্রুসিক্ত করেছে। আজ শনিবার দুপুরে বনানী কবরস্থানের সবুজ মাটিতে সমাহিত করা হলো তাঁকে।

default-image

বাদ জোহর কবরস্থান এলাকায় তাঁর জানাজা হয়। জানাজা শুরুর আগে বনানী কবরস্থানের সামনেই মুক্তিযোদ্ধা এই অভিনয়শিল্পী ও সাবেক সাংসদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

বনানী কবরস্থানে শেষবারের মতো এ শিল্পীকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর, সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান, অভিনেত্রী সোহানা সাবা, নিশাত সালওয়াসহ আরও অনেকে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল হকের পক্ষে এ শিল্পীকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। শ্রদ্ধা জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ আরও বেশ কিছু সংগঠন।

default-image

করোনায় আক্রান্ত দেশ বরেণ্য এই অভিনয়শিল্পী গতকাল রাত ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রাতে তাঁকে হাসপাতালের শব হিমঘরে রাখা হয়। সেখান থেকে কবরীর মরদেহ নেওয়া হয় মোহাম্মদপুরের আল মারকাজুলে। সেখানে গোসল করানো শেষে তাঁর মরদেহ গুলশান ২ নম্বর এলাকার লেক রোডের বাড়িতে শেষবারের মতো নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ রাখার পরে কবরীকে জোহরের আগেই নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থান এলাকায়। এরপর সেখানেই গার্ড অব অনার এবং জানাজা শেষে তাঁকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
খুসখুস কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষায় দেন সারাহ বেগম কবরী। ৫ এপ্রিল দুপুরে পরীক্ষার ফল হাতে পেলে জানতে পারেন, তিনি করোনা পজিটিভ। ওই রাতেই তাঁকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

৭ এপ্রিল রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। অবশেষে ৮ এপ্রিল দুপুরে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে কবরীর জন্য আইসিইউ পাওয়া যায়।

default-image

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।
১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় কবরীর। ১৯৬৫ সালে অভিনয় করেন ‘জলছবি’ ও ‘বাহানা’য়, ১৯৬৮ সালে ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’। ১৯৭০ সালে ‘দীপ নেভে নাই’, ‘দর্পচূর্ণ, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বিনিময়’ ছবিগুলোয় অভিনয় করেন।

default-image

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান তিনি। সেখান থেকে পাড়ি জমান ভারতে। কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন কবরী। তখনকার স্মৃতি স্মরণ করে একবার কবরী বলেছিলেন, ‘সেখানকার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অবস্থার কথা তুলে ধরেছিলাম। কীভাবে আমি মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সবাইকে ছেড়ে এক কাপড়ে পালিয়ে সেখানে পৌঁছেছি, সে কথা বলেছিলাম। সেখানে গিয়ে তাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের দেশকে সাহায্যের আবেদন করি।’

বিজ্ঞাপন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আবারও চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন কবরী। শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে ‘রংবাজ’ পায় বেশ জনপ্রিয়তা।

default-image

১৯৭৫ সালে নায়ক ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ ছাড়িয়ে যায় আগের সব জনপ্রিয়তাকে। এরপর কেবলই এগিয়ে চলা সামনের দিকে। জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আগন্তুক’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘সারেং বৌ’, ‘দেবদাস’, ‘হীরামন’, ‘চোরাবালি’, ‘পারুলের সংসার’। ৫০ বছরের বেশি সময় চলচ্চিত্রে রাজ্জাক, ফারুক, সোহেল রানা, উজ্জল, জাফর ইকবাল ও বুলবুল আহমেদের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ঢাকার চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিল রাজ্জাক-কবরী।
তাঁদের বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবরী বলছিলেন, ‘আমরা এতটাই আবেগ দিয়ে অভিনয় করতাম যে ছবির প্রতিটি দৃশ্যকেই জীবন্ত করে তুলতাম।’ অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।

২০০৫ সালে ‘আয়না’ নামের একটি ছবি নির্মাণের মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন কবরী। এমনকি ওই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন। এরপর রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য নারী অধিকার ও সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭-তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’।

default-image

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তাঁর আসল নাম ছিল মিনা পাল। বাবা শ্রীকৃষ্ণদাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। তারপর টেলিভিশন ও সবশেষে সিনেমায়। কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে তাঁদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কবরী পাঁচ সন্তানের মা।

ঢালিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন