default-image

ওপার বাংলায় তখন উত্তম–সুচিত্রা জুটির সিনেমা তুমুল জনপ্রিয়। বাংলাদেশে তখনো তেমন কোনো জনপ্রিয় জুটি গড়ে ওঠেনি। রাজ্জাক ও কবরী তখন একক অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজ নিজ জায়গায় জনপ্রিয়তা কুড়াচ্ছেন। ১৯৬৮ সালে এই দুজনে প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করলেন। নায়ক রাজ্জাকের মতে, তখন থেকেই দেশের দর্শক তাঁদের উত্তম–সুচিত্রা জুটির বিকল্প হিসেবে আপন করে নেন। পরে রাজ্জাক–কবরী অভিনীত প্রায় সব সিনেমাই ছিল সুপারহিট। এভাবেই তাঁরা দুজনে দেশের সর্বকালের সেরা জুটির স্বীকৃতি পান। সাদা–কালো যুগে তাঁরা ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র।

default-image

রাজ্জাক–কবরী জুটি দর্শকদের সব সময় ভীষণভাবে টেনেছে। দর্শক তাঁদের কখনো পর্দায় নায়ক–নায়িকা মনে করেননি। সেই যুগের প্রেমিক-প্রেমিকারা এখনো ঋণ স্বীকার করেন তাঁদের কাছে। কারণ, পর্দার এই জুটি সিনেমার সংলাপ, গান, স্টাইলের বর্ণনা দিয়ে তাঁরা প্রেমপত্র লিখতেন। প্রেমিক যুগলের দেখা হলে আলোচনায় থাকত রাজ্জাক-কবরী পর্দার প্রেম। তাঁরা গাইতেন সিনেমার গান। কখনো একসঙ্গে সিনেমা দেখতেন। দিন দিন তাঁরা ভক্তদের কাছে জীবন্ত হয়ে উঠেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের বিপুল এই জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে নায়ক রাজ্জাক একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কবরীর সঙ্গে তাঁর জুটি গড়ে উঠেছিল ‘ময়নামতি’ সিনেমা দিয়ে। এটি ছিল একটি রোমান্টিক সিনেমা। সিনেমাটি দর্শক খুবই পছন্দ করেন। দর্শকচাহিদার কারণে পরে তাঁরা আবার একসঙ্গে অভিনয় করেন। সেটাও লুফে নেন দর্শক। একসময় তাঁরা বুঝতে পারেন, উত্তম–সুচিত্রার মতো তাঁদেরও জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

default-image

সেই সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘আমাদের অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠত গ্রামগঞ্জের ছেলেমেয়েদের আশা–আকাঙ্ক্ষা। আমরা সামাজিক গল্পে অভিনয় করতাম। পর্দায় আমাদের দেখলে দর্শক ভাবতেন, রাজ্জাক পাশের বাড়ির ছেলে আর কবরী পাশের বাড়ির মেয়ে। রাজ্জাকের মধ্য দিয়ে তরুণেরা নিজেদের খুঁজে পেতেন। তরুণীরা নিজেদের কবরী ভাবতেন। আর আমি দেশের কোটি তরুণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতাম বলেই হয়তো সব শ্রেণির দর্শক আমাদের আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁরা কখনো আমাদের ঘৃণা করতেন, কখনো ভালোবাসতেন, কখনো আমাদের জন্য কষ্ট পেতেন। এটিই ছিল আমাদের সাফল্য।’ ‘ময়নামতি’, ‘আবির্ভাব’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘বাঁশরী’, ‘রংবাজ’, ‘অধিকার’সহ আরও অনেক সিনেমা দিয়ে তাঁদের জুটি পাকাপোক্ত হয়।

প্রথম দিকে রাজ্জাকের সঙ্গে অভিনয় করবেন, এটাকে সেভাবে গুরুত্ব দেননি কবরী। রাজ্জাককে আগে থেকেই চিনতেন। তাঁর সিনেমাও দেখেছিলেন। জানতেন, তিনি গুণী অভিনয়শিল্পী।

default-image

স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সঙ্গে সিনেমার শুটিং শুরু করে শেষ করেছেন। ‘ময়নামতি’ সিনেমা মুক্তির পর এই অভিনেত্রী বুঝতে পারেন, জনপ্রিয়তা কাকে বলে! যেখানেই যেতেন, সবার মুখে শুনতেন রাজ্জাক–কবরী জুটির আরও সিনেমা চাই। দেশের সর্বকালের সেরা জুটি প্রসঙ্গে কবরী মেরিল প্রথম আলো অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার আগে থেকে আমরা অনেক সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করেছি। পরে শুনতাম, আমরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জুটি। কীভাবে মানুষের এতটা ভালোবাসা পেয়েছি, জানি না। তবে আমরা অভিনয়ের জন্য নিবেদিত। আমাদের বোঝাপড়া ভালো ছিল। হয়তো পর্দায় বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছি।’
রাজ্জাকের বক্তব্যের সুরেই কবরী বলেছিলেন, ‘পর্দায় আমার আচার–আচরণ, বাচনভঙ্গি, লুকিয়ে কান্না করা, চাহনি, ডায়ালগ বলার ধরন, হাসি, সাধারণ গেটআপ, একদমই পাশের বাড়ির মেয়ের মতো ছিল। যেখানে যেতাম, দর্শক এটাই বলতেন। একজন মা–বাবা ভাবতেন তাঁদের মেয়ে। একজন মেয়ে ভাবতেন তিনি নিজকেই পর্দায় দেখছেন। তাঁরা সবাই আমাকে নিজেদের পরিবারের একজন করে নিতে পেরেছিলেন। এটাই আমার সবচেয়ে বড় সফলতা।’

বিজ্ঞাপন

শুটিংয়ের সময় জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখেই অভিনয় করতেন রাজ্জাক–কবরী। তাঁদের নিয়ে আগে থেকেই প্রযোজক, হলমালিক ও দর্শকদের আগ্রহ থাকত। তাঁদের অনেক সিনেমা প্রায় বছর ধরে সিনেমা হলে চলেছে। শুটিংয়ের বিভিন্ন সময় রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর মান–অভিমান হতো, কিন্তু পর্দায় তাঁরা কখনোই দর্শকদের সেগুলো বুঝতে দিতেন না। এই প্রসঙ্গে কবরী বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে পেশাগত মান–অভিমান হয়েছে। অভিমান থাকলেও আমরা কাজে কখনো ব্যাঘাত ঘটাইনি। পেশাগত জায়গায় আমাদের সততা ছিল। কারণ, আমাদের অসততা মানেই ভক্তদের ঠকানো। সেই পথে আমি ও রাজ্জাক কখনোই হাটিনি।’

ক্যারিয়ারে ১৪০টির মতো সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন কবরী। রাজ্জাক থেকে শুরু করে, আলমগীর, উজ্জ্বল, ফারুক, বুলবুল আহমেদ, সোহেল রানাসহ অনেকের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। এখনো তিনি দেশের দর্শকদের কাছে রাজ্জাকের নায়িকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি। রাজ্জাকের সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জনও উঠেছে বারবার। তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘তিনি তো বিবাহিত! তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নই আসে না। তিনি আমার সহশিল্পী আর খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গে এখনো আমার হৃদ্যতা রয়েছে।’

default-image

মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন কবরী। ‘সুতরাং’ থেকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল তাঁর। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ‘সুজন সখী’, ‘দ্বীপ নেভে নাই’, ‘সারেং বৌ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’সহ অসংখ্য কালজয়ী সিনেমায় অভিনয় করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর বেশির ভাগ সিনেমাই ছিল ব্যবসাসফল। সিনেমায় অভিনয় ছাড়াও তিনি সিনেমা প্রযোজনা ও পরিচালনায় নাম লিখিয়ে সফল হয়েছেন। ১৩ দিন করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে ১৭ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন কবরী। তাঁকে বনানীতে সমাহিত করা হয়েছে।

default-image
ঢালিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন