মুহম্মদ খসরু
মুহম্মদ খসরুফেসবুক

মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে ভাব জমানোর জন্য এক তরুণ তাঁর পিছে পিছে ঘুরতেন। ঝোলা ঘাড়ে, উষ্কখুষ্ক চুলের খসরু খানিকটা কুঁজো হয়ে হাঁটতেন। অনেকে বলেন, এই যে কুঁজো হয়ে হাঁটতেন, এটা অন্য কোনো কারণে নয়। সিনেমার জ্ঞানভারে! সে যা-ই হোক, মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে কথা বলার সাহস করে উঠতে পারেন না সেই তরুণ। কেবলই তাঁর পিছে পিছে খানিকটা দূরত্ব রচনা করে হেঁটে চলেন। একদিন সে একটু একটু করে জমানো সাহস জড়ো করে চলে গেলেন মুহম্মদ খসরুর বাড়িতে।

default-image

কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরের মোহনপুর গ্রাম। সেখানে গিয়ে মুহম্মদ খসরুর খোঁজ করেন তিনি। সবাই অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকান। কেউ এই নামের কাউকে চেনেন না! বেশ খানিকটা খোঁজাখুঁজির পর একসময় একজন বলে উঠলেন, ‘ও আমি বুঝছি। উনি “মজনু পাগলা”রে চান। ওই দিকে বাড়ি।’ দেখিয়ে দিলেন বাড়ির পথ। গ্রামের মানুষের কাছে ‘মজনু পাগলা’ বলে পরিচিত লোকটাই ওমর খৈয়াম মুহম্মদ খসরু। নীরবে পায়ে হেঁটে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলা সেই মানুষ চলচ্চিত্রাঙ্গনে পরিচিত মুহম্মদ খসরু নামে। আবার তাঁর আশপাশের অনেকে নাম দিয়েছিলেন ‘গালি খসরু’।

default-image

কবি, কথাশিল্পী ও গবেষক রঞ্জনা বিশ্বাস যখন জিজ্ঞেস করেছেন, এই যে লোকে আপনাকে ‘গালি খসরু’ নাম দিল, বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? মুহম্মদ খসরু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘গালিকে খুব খারাপ বলে মনে করো তুমি? প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করাই আমার কাজ, কিন্তু এ জাতির “মহান” মানুষগুলার চামড়া এত মোটা যে এদের কোনো বিকার নাই। উপাধি দিতে বাঙালির কোনো কষ্ট নাই, যত কষ্ট কাজের বেলায়। গালি দিয়ে কিছুই লাভ হয় নাই, লোকসানও নাই। গালি দিয়ে আমি বিরক্তি মোচন করি। গালি কি শুধু ওদের দেই? নিজেকেও দেই। অনাবশ্যকেরও তো কিছু আবশ্যকতা আছে। তুমি রবীন্দ্রনাথের ওই কবিতাটা পড়েছ? অনাবশ্যক...’ মুহম্মদ খসরু কেরানীগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসতেন। বসুন্ধরা কিংবা আজিজে (শাহবাগের আজিজ সুপারমার্কেট) ঘুরতেন। কাঁটাবনেও আসতেন। আজিজ মার্কেটই ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। তীব্র শ্বাসকষ্ট বা ব্রঙ্কাইটিস নিয়ে তিনি একাই চলতেন। আর থামতেন। ইনহেলার নিতেন। তবু তিনি একাই বইপত্র কিনতেন। তাঁর ঘর লাইব্রেরি না বইপত্র, ম্যাগাজিনের সংগ্রহশালা; তা নিয়ে একটা তর্ক হতেই পারে। রঞ্জনা তাঁকে বয়সের কথা বললেই ধমকে উঠতেন। বলছিলেন, ‘বয়স ডাজন্ট ম্যাটার বায়িং বুক।’

default-image

শুরুরও শুরু থাকে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে উপমহাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের শুরু। তবে তা শুরু হয়ে গেছিল ১৯২৫ সালে, লন্ডনে ‘দ্য ফিল্ম সোসাইটি’র হাত ধরে। ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ রায় ও চিদানন্দ দাশগুপ্ত গড়লেন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি। এর অনুপ্রেরণায় মুহম্মদ খসরু, ওয়াহিদুল হকরা মিলে ঢাকায় গড়ে তুললেন পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র সংসদ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর নাম হলো বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি। এই বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল লন্ডনের ‘দ্য ফিল্ম সোসাইটি’র। সিনেমা নিয়ে ইউরোপের নানা বইপত্র, ম্যাগাজিন আসত ঢাকার সেগুনবাগিচার ফিল্ম সোসাইটির অফিসে। মুহম্মদ খসরু সেসব পড়তেন। তাঁর যেসব সিনেমা ভালো লাগত, সেগুলো আনাতেন বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সহযোগিতায়।

default-image
বিজ্ঞাপন

সে সময় বিদেশি সিনেমা জোগাড় করে দেখানো ছিল বড় হ্যাপা। তখন তো আর পেনড্রাইভ, গুগল ড্রাইভ ছিল না। যে সময়ের কথা বলে হচ্ছে, তখন বিদেশি সিনেমা বলতে লোকে বুঝতেন হলিউড আর বোম্বের সিনেমা। মুহম্মদ খসরু আক্ষরিক অর্থে সেসব সিনেমা ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে বেড়িয়ে মানুষকে দেখিয়েছেন। লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকার শৈল্পিক, রুচিশীল, তাৎপর্যপূর্ণ গভীর সব সিনেমা। শুধু দেখানইনি, সিনেমা পাহারাও দিয়েছেন। পাহারা দিয়েছেন সিনেমার দর্শকদেরও। সবাইকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে দরজার বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। যাতে কেউ আবার হুশ করে পালিয়ে যেতে না পারেন।

default-image

মানুষ সিনেমা তৈরি করেন, ৫০ বছর ধরে এভাবে তিলে তিলে মুহম্মদ খসরু তৈরি করেছিলেন নির্মাতা। চলচ্চিত্রকে জীবনযাপন আর চর্চার বিষয় বানাতে তিনি ঢেলে, নিঙড়ে দিয়েছেন তাঁর জীবনের সর্বস্ব।। আজ যাঁরা ‘এই লাইনে’ ভালো কাজ করেছেন, তাঁদের একটা বড় অংশ ‘খসরু ভাইয়ের পকেট থেকে বেরোনো’। মোহনপুর থেকে সেগুনবাগিচা—একজন মুহম্মদ খসরু ঝোলা কাঁধে পায়ে হেঁটে সিনেমা বিলি করে বেড়িয়েছেন। তারপর সেই সিনেমা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলাদেশে। তাই তো তিনি সিনেমা ‘বিলি’ করা এক গালিভার। ঝুলিভরা সিনেমা নিয়ে ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে থাকা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।

default-image

মুহম্মদ খসরু ‘ধ্রুপদী’ নামে একটি সিনেমার কাগজ সম্পাদনা করতেন। চলচ্চিত্র মহলে ‘ধ্রুপদী’কে বলা হয় বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পত্রিকা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ভ্রমণকাহিনি ‘পায়ের তলায় সর্ষে’তে লিখেছেন মুহম্মদ খসরু আর ‘ধ্রুপদী’কে নিয়ে, ‘আমি চমৎকৃত হলাম বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের খানিকটা পরিচয় পেয়ে। ঢাকার একটি টিনচালের ঘরে মুহম্মদ খসরু নামে এক অতি উৎসাহী যুবক তার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে শুরু করেছিল এই আন্দোলন। বিদেশের শ্রেষ্ঠ দেখা বা না দেখা চলচ্চিত্রগুলির সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এদের উদ্দেশ্য ছিল। এখন চলচ্চিত্র আন্দোলনের অনেকগুলি সংস্থা হয়েছে। জেলায় জেলায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ফিল্ম সোসাইটির ছেলেরাই নতুন ছবি বানাবার স্বপ্ন দেখে। একদিন এদের কারুর হাত থেকেই বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশর সার্থক চলচ্চিত্র। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ থেকে ধ্রুপদী নামে একটি পত্রিকাও বেরোয়, যার সম্পাদক ওই মুহম্মদ খসরু। পত্রিকাটির রুচি, অঙ্গসজ্জা ও রচনাগুলির মান যথেষ্ট উঁচু।’ ‘ধ্রুপদি’ ছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘চলচ্চিত্রপত্র’, ‘ক্যামেরা যখন রাইফেল’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ বিশেষ সংখ্যা।

default-image

মুহম্মদ খসরুর পৈতৃক বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জের মোহনপুরে। জন্মেছিলেন ভারতের হুগলি জেলায়। বাবা ছিলেন হুগলি জুট মিলের কর্মকর্তা। পঞ্চাশের দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তাঁদের পরিবার ঢাকায় চলে আসে। তারপর বাকি জীবন সেখানেই কেটেছে। বিসিকের ফটোগ্রাফার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। অবশ্য শুরু করেছিলেন না বলে জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানরা বিসিক গড়ে তুললে জোর করে তাঁকে সেখানকার ফটোগ্রাফার বানিয়েছিলেন বলাই বেশি সঠিক। সংসারজীবন গোল্লায় পাঠিয়ে যাপন করেছেন সিনেমাজীবন।

default-image

জাগতিক কোনো মোহ তাঁকে বাঁধতে পারেনি। সম্পদ, খ্যাতি, পুরস্কার—৭৩ বছরের এক জীবনে একটা মুহূর্তের জন্যও এসব কিছুই টানেনি তাঁকে। একটা মানুষ এক জীবনের পুরোটাই উগরে দিয়ে গেলেন সিনেমা বয়ে বেড়ানোর কিছু মানুষ তৈরিতে। কেন? এর উত্তর দিয়ে কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান ফিল্মফ্রিতে লিখেছিলেন, ‘মুহম্মদ খসরুকে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তাঁরা জানেন যে মানুষ হিসেবে তিনি খ্যাপাটে, রাগী, মুখে তাঁর অবিরাম খিস্তি। তাঁর সব রাগ, ক্ষোভ ওই চলচ্চিত্রকে ঘিরেই। এই মানুষ বেঁচে আছেন সংসার করার জন্য নয়, সম্পদ অর্জনের জন্য নয়, খ্যাতি কুড়াবার জন্য নয়, শুধু একটি শিল্পমাধ্যমকে ভালোবাসার এবং সেই ভালোবাসা অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য।’

সিনেমাকে ভালোবেসে একটা মানুষ বেঁচে থাকলেন। তারপর জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে বেঁচে থাকা শেষে ২০১৯ সালের আজকের দিনে, মঙ্গলবারে দুপুর ১২টায় রাজধানীর বারডেম হাসপাতাল থেকে তিনি চলে গেলেন। তাঁর যে জীবন, সে জীবনকে বলা যেতে পারে একটা মোমবাতির মতো। অন্ধকারে যে জ্বলে জ্বলে ক্ষয়েছে আর চারপাশটা আলোকিত করেছে।

default-image

শুরুতে যে তরুণের কথা বলেছিলাম, তাঁর নাম কামরুল মিথুন। সম্প্রতি তিনি মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে কাটানো সময়, শব্দ আর সুরগুলো নিয়ে বানিয়েছেন একটি ভিডিও চিত্র। ‘স্মৃতিলজিয়া’ নামের সেই ভিডিও চিত্রের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গান আর মুহম্মদ খসরুর বাঁশির সুরে, ‘তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব ছেড়ে দেব না।’ মুহম্মদ খসরু, আপনি চলে গেলে কী হবে, তাঁরা আপনাকে হৃদ মাঝারে রাখবেন, ছেড়ে দেবেন না...।

বিজ্ঞাপন
ঢালিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন