আবদুল হালিম বেলাল অথবা মাস্টার রনি
আবদুল হালিম বেলাল অথবা মাস্টার রনিসংগৃহীত

দুই বছর আগে শরিফুল ইসলাম মাস্টার রনি নামে তৃতীয় লিঙ্গের এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে মাস্টার রনি তাঁর গ্রামের যে সহযোদ্ধাদের নাম বলেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন শরিফুল। শুনে মাস্টার রনি বলেছিলেন, ‘তুমি গেলে যাও। আমার কোনো ঠেকা নাই।’ সময়–সুযোগ বুঝে এক ছুটির দিনে শরিফুল ছুটে গেলেন সেই গ্রামে। চার–পাঁচ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর শরিফুল চান মিয়া নামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধার খোঁজ পান। যাঁর কথা বলেছিলেন মাস্টার রনি।


কিন্তু চান মিয়াকে রনির কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি চেনেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। ছবি দেখানোর পর চেনাচেনা লাগল। গ্রামের হারিয়ে যাওয়া সহযোদ্ধা আবদুল হালিম বেলালের সঙ্গে চেহারার খুব মিল। এরপরের অংশটুকু শোনা যাক এই নির্মাতার মুখে, ‘আমি চান মিয়ার সঙ্গে মাস্টার রনির কথা বলিয়ে দিলাম। তখন চান মিয়া বুঝলেন, এই মাস্টার রনিই তাঁর ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, সহযোদ্ধা, আবদুল হালিম বেলাল। সেই মুহূর্তে আমি কাঁদছি, আমার সামনে চান মিয়া কাঁদছে, ফোনের ওপাশে মাস্টার রনি কাঁদছেন।’

এরপর শরিফুল ইসলাম মাস্টার রনিকে রাজি করিয়ে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর গ্রামে। তবে একটা শর্তে রাজি হয়েছিলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। যে কিছুতেই তিনি তাঁর বাড়ি যাবেন না। কেবল গ্রামের সহযোদ্ধা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেই ফিরে আসবেন ঢাকায়। তাই সই। অর্ধশত বছর পর মাস্টার রনির সঙ্গে দেখা হলো তাঁর গ্রামের একাত্তরের কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার। সেই দৃশ্য উঠে এসেছে ‘অগ্নিঝরা দিনের না বলা কথা’য়। একসময় সাংবাদিকতা করতেন পলাশ। পরে কলম ছেড়ে ক্যামেরা ধরেছেন অন্ধকারে, অযত্নে, অবহেলায় পড়ে থাকা আলোকিত এই গল্পগুলো বলার জন্য।

default-image
বিজ্ঞাপন

মাস্টার রনি ১৯৬৮ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭১ সালে আসাম থেকে ট্রেনিং নিয়ে গেরিলাযোদ্ধা হিসেবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। শত্রুর ওপর অতর্কিত হামলা চালাতেন তাঁরা, সব তছনছ করে দিতেন। যুদ্ধ শেষে জীবনটাই বদলে গেল তাঁর। ঢাকায় বাসা বদলের কোনো এক ফাঁকে হারিয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট আর কাগজপত্র। আশপাশের মানুষেরা বলতে শুরু করল, ‘তোমার হাঁটা, চলাফেরা, আচরণ মেয়েদের মতো কেন!’ মাস্টার রনিও বুঝতে পারলেন, তিনি অন্য রকম। তিনি শারীরিকভাবে পুরুষের মতো হলেও পুরুষালি কোনো কিছুই তাঁর ভালো লাগে না। তিনি খুঁজে খুঁজে যোগ দিলেন তাঁর মতো নারীদের সঙ্গে। সেই থেকে এই ৫০ বছর ধরে তিনি পরিবার, আত্মীয়স্বজন, চেনা–পরিচিতের কাছে ‘নিখোঁজ’ অথবা ‘মৃত’।

default-image

সপ্তাহখানেক আগে মুক্তি পেয়েছিল ‘অগ্নিঝরা দিনের না–বলা কথা’ শিরোনামে একটি প্রামাণ্যচিত্রের ট্রেলার। ৭ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রের প্রথম পর্ব। সেখানে উঠে এসেছে আবদুল হালিম বেলাল অথবা মাস্টার রনি ‘হিজড়া’র জীবনের গল্প। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বীর মুক্তিযুদ্ধের গেরিলাযোদ্ধা। তৃতীয় লিঙ্গের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটি বানিয়েছেন শরিফুল ইসলাম। এই কাজ করতে গিয়ে আরও অনেক গল্পের খোঁজ পেয়েছেন। খোঁজ পেয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের এমন সব জনগোষ্ঠীর, যাঁরা সরাসরি যুদ্ধ করেছেন, স্বজন হারিয়েছেন, পাকিস্তানিদের কাছে নির্যাতিত হয়েছেন কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তেমন মানুষের গল্প তুলে ধরা হবে বলেও জানিয়েছেন এই নির্মাতা।

‘দ্য পাথ ক্রিয়েটার’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে মুক্তি পেয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রটি। এপ্রিলে মুক্তি পাবে আরও দুটি পর্ব। সেখানে উঠে আসবে খুলনার পান্না ‘হিজড়া’ আর বরিশালের কবির শিকদার কবরীর কথা। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণে সৃজনশীল তদারকি ও চিত্রগ্রহণসহ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন আরেক তরুণ নির্মাতা ওয়াসিম সিতার।

বিজ্ঞাপন
ঢালিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন