মনে করিয়ে দেওয়া যাক, ‘জীবন থেকে নেয়া’র গল্পটি ছিল একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে। নেপথ্যের প্রতীক ছিল পরাধীন পূর্ব বাংলা। সংসারের সব ক্ষমতার অধিকারী বড় বোন রওশন জামিল। সেই ক্ষমতার প্রয়োগে রীতিমতো তিনি অত্যাচার চালান স্বামী ও নিজের দুই ভাইয়ের ওপর। আঁচলে চাবির গোছা নিয়ে পরিবারে একরকম স্বৈরশাসন চালিয়ে যান তিনি। তাঁর দাপটে অতিষ্ঠ পরিবারের সদস্যরা।

সংসারের চাবি হাত ফসকে যাওয়ার ভয়ে রওশনের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায় বাড়ির বউদের ওপর। রওশনের এই দাপটকে অবরুদ্ধ করতে বউদের নেতৃত্বে এক হন পরিবারের বাকি সদস্যরা। আর এতেই ক্ষমতাচ্যুত হন রওশন। গল্পটি দিয়ে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সবাইকে এককাট্টা হওয়ার বুদ্ধি দিয়েছিলেন পরিচালক।

১৯৭০ সালের আজকের দিনে মুক্তি পেয়েছিল ‘জীবন থেকে নেয়া’। আজ ছবিটির মুক্তির ৫২ বছর। ভাষা আন্দোলন নিয়ে নির্মিত প্রথম বাংলা সিনেমা এটি। সিনেমায় দেখা গেছে, ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সত্যিকারের প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার দৃশ্য। শুধু কি ভাষা আন্দোলন! এই সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার ও সংগ্রামের কথা। সে সময়ের বাংলার মানুষের চাওয়া–পাওয়ার কথা। ১৯৫২ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সময়ের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয় সিনেমাটি। এই সিনেমার স্লোগান ছিল ‘একটি দেশ। একটি সংসার। একটি চাবির গোছা। একটি আন্দোলন’। স্লোগানগুলো ইঙ্গিত করে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে। সিনেমায় জন্মাতে দেখা যায় এক শিশুকে, যার নাম রাখা হয় মুক্তি। পরিচালক জহির রায়হান বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে এভাবেই পর্দায় চিত্রায়ণ করেছেন। যদিও সেই মুক্তি বা স্বাধীনতার স্বাদ তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই নিজ ভাই শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি।

‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি যেমন ব্যবহার করা হয়, তেমনি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহকবাট’ গানটিও। ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’। মুক্তিযুদ্ধের পর এ গান পায় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা। গানগুলোও যেন আন্দোলনের একেকটি স্লোগান। গানগুলোর সংগীত পরিচালনা করেছিলেন খান আতাউর রহমান।