default-image

সুযোগ আসে রাশিয়ায় যাওয়ার। মস্কো রেডিওতে কাজ করার সুযোগ কে ছাড়তে চায়? অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার ছাড়বেন কেন! জীবনের এ রকম ঘটনাগুলোয় পরিচিতজনদের কেউ খুশি হন, কেউ হন ঈর্ষান্বিত। ফেরদৌসীর এ খবরে একজন মানুষ দুঃখ পেয়েছিলেন। সেই মানুষটি প্রয়াত আলী যাকের।

গতকাল শুক্রবার চিরবিদায় নিয়েছেন অভিনেতা আলী যাকের। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন তাঁর সহকর্মী ফেরদৌসী মজুমদার। ‘ম্যাকবেথ’ ও ‘টেম্পেস্ট’ নাটকের মঞ্চে তাঁদের দুজনকে একত্রে কতবার দেখেছেন ঢাকার নাট্যপ্রেমীরা! টেলিভিশনের অনেক নাটকেও একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন তাঁরা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন আলী যাকের। তাঁর সঙ্গে অভিনয়ের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ফেরদৌসী মজুমদার। বলেন, ‘আমারও সময় এসে গেছে।’ কেমন ছিল তাঁদের বন্ধুত্ব? শুধু কি সহশিল্পীর সম্পর্ক, নাকি একটু বেশি? জানতে চাইলে ফেরদৌসী বলেন, ‘আমি মস্কো চলে যাব শুনে তিনি একদিন আমার বাসায় এসেছিলেন। খুব আবেগকাতর কণ্ঠে বলেছিলেন, “আপনি চলে গেলে আমি কার সঙ্গে অভিনয় করব?” শুধু তাঁর ওই আন্তরিক আকুতির কারণে আমি আর যাইনি। কোনো শিল্পী তাঁর সহশিল্পীর জন্য এত আন্তরিকতা দেখান?’

বিজ্ঞাপন
default-image

‘বাকী ইতিহাস’ নাটকের মাধ্যমে আলী যাকের ও ফেরদৌসী মজুমদারের পরিচয়। মঞ্চনাটকের প্রতি এ দুই শিল্পীর আত্মনিবেদন অগাধ। ফলে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান ছিল সহযোদ্ধার মতোই। আলী যাকেরকে স্মরণ করতে গিয়ে ফেরদৌসী বলছিলেন, ‘অভিনয়টা তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। সে জন্য তাঁকে আমার খুব ভালো লাগত। সহশিল্পী হিসেবে তিনি আমাকে অনেক উচ্চাসনে বসিয়েছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে দেখতে গেলে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন তিনি। হাতটা ধরে সে কথা বলেছিলেনও, “ফেরদৌসী, আপনি এসেছেন, আমি কী যে খুশি হয়েছি।”’

একজন ব্যক্তিমানুষ হিসেবে আলী যাকেরকে কাছ থেকে দেখেছেন সহকর্মী ফেরদৌসী মজুমদার। আকর্ষণীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো মনে করে তিনি বললেন, ‘অত্যন্ত সংযত ও মিষ্টভাষী মানুষ ছিলেন তিনি। শরীরে যত বড় ছিলেন, মনের দিক থেকে ঠিক ততটাই সরল ছিলেন। হাসিটা সেই সারল্যের প্রমাণ। তাঁর সঙ্গে যখন “ম্যাকবেথ” করি, আমরা একত্রে অনুশীলন করতাম। তখন সময়টা ছিল মহা আনন্দের। তিনি ছিলেন মহা আমোদি মানুষ। কথা বলতে ভালোবাসতেন, প্রাণ খুলে হাসতে ভালোবাসতেন। খুব সহজভাবে তিনি আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন।’

default-image

দুই মাস আগেও দেখা হয়েছিল তাঁদের। সেদিন তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল, ‘মঞ্চে হয়তো দাঁড়াতে পারবেন না, কিন্তু পড়তে পারবেন। আবদুস সেলিম অনূদিত আমেরিকান নাটক “প্রেমপত্র” আমাদের একসঙ্গে করার কথা ছিল।’ সে কথা স্মরণ করে ফেরদৌসী বলেন, ‘ভেবেছিলাম সেটা করে আরেকটি মধুর স্মৃতি যোগ করব। সেটা আর হলো না। ওপরওয়ালা তাঁকে তুলে নিলেন। কদিন আগে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁর সামনে আমরা পড়া শুরু করব কি না। তিনি বলেছিলেন, “আপনারা শুরু করুন, আই উইল জয়েন ইউ।” জয়েন তো আর করা হলো না। মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। কারণ, সবার ওপরে যিনি আছেন, তিনি না চাইলে তো আর কিছুই হয় না। এখন দুঃখ হচ্ছে, আরও আগে কেন আমরা পড়া শুরু করলাম না!’

ফেরদৌসীর বিশ্বাস, একজন নিষ্ঠাবান শিল্পী হিসেবে আলী যাকের নাট্যকর্মী ও ভক্তদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। তিনি মনে করেন, তাঁর জীবন থেকে শিক্ষাটা এভাবেই নেওয়া উচিত যে, তিনি যেটা করতেন, খুব মনোযোগ দিয়ে করতেন। তিনি বলেন, ‘এ রকম একজন শিল্পী আর পাওয়া যাবে না। তিনি চলে গেছেন, যাওয়াটা বড় কথা না, কিছু রেখে যাওয়াই বড় কথা। তিনি যা রেখে গেছেন, তাঁর যে অভিনয়কর্ম, তাঁর মিষ্টি স্বভাব, সুন্দর চরিত্র, সেগুলো মানুষ মনে রাখবে। অভিনয়ের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা, এটাও কিন্তু শিক্ষণীয়। এভাবেই গুণী মানুষেরা টিকে থাকেন। আমার সৌভাগ্য, তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন