বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘সোহোতে মার্ক্স’ নাটকটি মার্কিন ইতিহাসবেত্তা ও নাট্যকার হাওয়ার্ড জিনের ১৯৯৯ সালে লেখা ‘মার্ক্স ইন সোহো: আ প্লে অন হিস্টোরি’র অনুবাদ। নাটকটির রূপ, রস, ভাব, গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ন রেখে বাংলা ভাষায় বদলে দিয়েছেন জাভেদ হুসেন। মূলত একটি চরিত্রের একটি দৃশ্যের এক ঘণ্টার এই নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন নায়লা আজাদ। সংগীত, আলো, সেট আর দৃশ্য পরিকল্পনাও তাঁর। মঞ্চে মার্ক্স হয়ে নেমে এসেছেন বটতলার সদস্য ও সংস্কৃতিকর্মী হুমায়ূন আজম রেওয়াজ।

default-image

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায়ও হোঁচট না খেয়ে সাবলীলভাবে বলে গেছেন তিনি। বলে গেছেন দারিদ্র্যের স্যাঁতসেঁতে আলো–আঁধারির ঘরে, শুকনা পাউরুটি চিবোতে চিবোতে পিঠে ফোঁড়ার প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে একটা সস্তা ছোট টেবিলে কীভাবে লেখা হলো বিশ্বের সেরা সব তত্ত্ব আর বিপ্লবের ইশতেহার। বলে গেছেন স্ত্রী জেনি, তিন কন্যা, বন্ধু এঙ্গেলস আর ভিন্নমতাবলম্বী বিপ্লবী বাকুনিনের কথা। নাটকের মার্ক্স জানান, মানুষ হিসেবে স্ত্রী জেনি তাঁর চেয়ে উন্নত। জেনি চরিত্রটি কিন্তু নাটকে নেই। তবে মঞ্চে না থাকলে যেন অপূর্ণই থেকে যেত ‘সোহোতে মার্ক্স’। যে মানুষকে ছাড়া মার্ক্স, ‘মার্ক্স’ হতে পারতেন কি না, এমন একটা প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়, তিনি জেনি।

default-image

মহিলা সমিতির মঞ্চে জেনি হয়ে এসেছিলেন উম্মে হাবিবা। রেওয়াজ যখন গলার স্বর নামিয়ে, উঠিয়ে, বদলে সংলাপ দিয়ে নাটক এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, উম্মে হাবিবা তখন অভিনয় করছেন শরীর দিয়ে, নেচে, মূকাভিনয় করে। তাই যখন কান শুনেছে মার্ক্সের কথা, চোখ দেখেছে জেনিকে। কেবল এটুকু বললে ভুল হবে। বরং বলা উচিত, জেনির ওপর থেকে চোখ সরানো দায়! তাই তো মাঝেমধ্যেই দর্শক কখন যে গাল থেকে হাত সরিয়ে হাততালি দিয়ে উঠেছেন, নিজেরাই বলতে পারবেন না। হঠাৎ করেই মনে হলো, ও মা, শেষ! দুটি মাত্র চরিত্র, এর ভেতর আবার কেবল একটি চরিত্র কথা বলে—এই দিয়ে এক ঘণ্টার একটা নাটক একবারও ঘড়ি না দেখে, আশপাশে না তাকিয়ে কীভাবে পার হয়ে গেল, সে এক আশ্চর্য। মোহ ভাঙতেই যে হাততালি শুরু হলো, তার আর থামাথামি নেই।

default-image
সমাজে পুঁজিবাদের ফলে সৃষ্ট অসাম্য আর অমানবিকতা যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রকটতর হয়ে দেখা দিচ্ছে। ১৫০ বছর পরও তাঁর কথাগুলো কী অসামান্য প্রাসঙ্গিক! মার্ক্স যখন এগুলো বলে চলেছেন, পেছনে প্রজেক্টরে তখন ছবি আর খবরের কাগজের শিরোনামে স্পষ্ট হয়ে উঠছে পোশাক কারখানায় একের পর এক দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের বীভৎস মৃত্যু, মানুষের ক্রমে পণ্যে পরিণত হওয়া আর বড় পণ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া...এ সময় মনে হবে, মার্ক্স যেন আমাদের কথাই লিখেছেন

ঘটনা হলো, মৃত্যুর প্রায় ১৫০ বছর পর আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন মার্ক্স। এসে দেখলেন, যেসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি লড়ে গেছেন, আজকের পৃথিবীতে সেগুলো আরও বেশি করে জাঁকিয়ে বসেছে। সমাজে পুঁজিবাদের ফলে সৃষ্ট অসাম্য আর অমানবিকতা যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রকটতর হয়ে দেখা দিচ্ছে। ১৫০ বছর পরও তাঁর কথাগুলো কী অসামান্য প্রাসঙ্গিক! মার্ক্স যখন এগুলো বলে চলেছেন, পেছনে প্রজেক্টরে তখন ছবি আর খবরের কাগজের শিরোনামে স্পষ্ট হয়ে উঠছে পোশাক কারখানায় একের পর এক দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের বীভৎস মৃত্যু, মানুষের ক্রমে পণ্যে পরিণত হওয়া আর বড় পণ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া...এ সময় মনে হবে, মার্ক্স যেন আমাদের কথাই লিখেছেন। হাওয়ার্ড জিন যে লিখেছেন, তা–ও সব আমাদের কথা। যা দেখছি, যা বলছে, সবই তো এই আমাদেরই জীবন, সমাজ, চারপাশ! যেতে যেতে মার্ক্স থামলেন, ফিরে তাকালেন দর্শকের দিকে। প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘ফিরে এসেছি বলে আপনারা বিরক্ত হলেন নাকি?’ তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজেই ফিরে আসার কারণ দর্শালেন, ‘ব্যাপারটাকে এভাবে দেখুন, আর কোনো পরিত্রাতা তো এলেন না, তাই মার্ক্সকেই আসতে হলো।’ নাটক শেষে এই কথাই ঘুরেফিরে মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। সত্যিই তো, কোনো অসংগতিই এখন আর আলাদা করে চোখে পড়ে না। মনে হয়, সবই স্বাভাবিক। আমরা কি তবে প্রশ্ন করাও ভুলতে বসেছি?

প্রত্যাশার পারদকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেল। মানুষের দীর্ঘ ক্লান্তিকর, ভারী হয়ে চেপে বসা এক জীবনকে ঝাঁকুনি দিয়ে প্রশ্নচিহ্ন এঁকে গেল ‘সোহোতে মার্ক্স’। এক ঘণ্টার জন্য সব সংকট, জ্যাম, রাতে বাড়িতে ফিরে কী খাব, কাল কয়টায় মিটিং—সব ভুলিয়ে অন্য এক জীবনের স্বাদ দেওয়ার জন্য এই নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার একটা বড় ধন্যবাদ প্রাপ্য

সে যা-ই হোক, আগেও বটতলার ‘ক্রাচের কর্নেল’, ‘খনা’, ‘মধু শিকারি’, ‘ট্রায়াল অব মাল্লাম ইলিয়া’ দেখা হয়েছে। পথনাটক ‘একজন রুহুল আমিন’, ‘সুন্দরবনকথা’ মনে দাগ কেটেছে। তাই প্রত্যাশা ছিল, ঢাকা শহরের উঁচু উঁচু দালানকোঠার চেয়েও উঁচু। ‘সোহোতে মার্ক্স’ সেই প্রত্যাশার পারদকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেল। মানুষের দীর্ঘ ক্লান্তিকর, ভারী হয়ে চেপে বসা এক জীবনকে ঝাঁকুনি দিয়ে প্রশ্নচিহ্ন এঁকে গেল ‘সোহোতে মার্ক্স’। এক ঘণ্টার জন্য সব সংকট, জ্যাম, রাতে বাড়িতে ফিরে কী খাব, কাল কয়টায় মিটিং—সব ভুলিয়ে অন্য এক জীবনের স্বাদ দেওয়ার জন্য এই নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার একটা বড় ধন্যবাদ প্রাপ্য।

যাঁরা গতকাল সন্ধ্যায় নাটকটি দেখেননি বা সুযোগ হয়নি, তাঁদের আফসোসের কিছু নেই। এখনো পাঁচটি শো বাকি। আজ সন্ধ্যা সাতটায় নাটকটি দেখা যাবে রাজধানীর বেইলী রোডের মহিলা সমিতির মিলনায়তনে। ৮ আর ৯ অক্টোবর দুটো করে শো। বিকেল পাঁচটায় আর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়।

নাটক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন