করোনা কেড়ে নিল দুই নাট্যজনকে, Ñ যাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় অর্ধশতাব্দীর
করোনা কেড়ে নিল দুই নাট্যজনকে, Ñ যাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় অর্ধশতাব্দীর

পাঁচ দিনের ব্যবধানে অতিমারি করোনা কেড়ে নিল দুই নাট্যজনকে, Ñ যাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় অর্ধশতাব্দীর। পয়লা বৈশাখে প্রিয় মানুষ শামসুজ্জামান খানকে হারিয়ে বেদনায় যখন ভরে আছে মন, তারপরই ঘটল এই দুই নাট্যসঙ্গীর জীবনাবসান। আরও চলে গেলেন কবরী ও মিতা হক। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, এ যেন শেষ হওয়ার নয়।

এস এম মহসীন
১৮ এপ্রিল ২০২১ চলে গেল অভিনেতা এস এম মহসীন। ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ বাংলা একাডেমির মাঠে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক পরিবেশন করে। বিভাগীয় অধ্যক্ষ নীলিমা ইব্রাহিম স্নেহবশত আমাকে নাটকটির নির্দেশনার দায়িত্ব দেন। সে নাটকে মহসীন নেতার ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করেছিল। সেই থেকে পরিচয় মহসীনের সঙ্গে।

default-image

মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলা মহাপরিচালক থাকার সময়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে কয়েকটি পদে নিয়োগ হয়। ঘনিষ্ঠতার সুবাদে আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম নাট্যকলা বিভাগে (সম্ভবত উপপরিচালক পদে) মহসীনকে যেন বিবেচনা করা হয়। আপন যোগ্যতার ভিত্তিতেই মহসীন শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়োগ পায় এবং দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করে। কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল।

বিজ্ঞাপন

শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্ব পালনকালে জাতীয় নাট্যশালা নির্মাণে মহসীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্নেহের দাবিতে আমি তাকে অনেক সময়েই আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণের জন্য অনুযোগ করতাম। মহসীন হাসিমুখে সব সহ্য করত।
এস এম মহসীনের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল ওর সততা। জীবনাচরণে নিয়ম মেনে চলত, নিয়মিত যোগব্যায়াম করত। আমাদের থিয়েটার স্কুলের শুরু থেকেই আমৃত্যু যোগব্যায়ামের ক্লাসগুলো ও করত। মাঝেমধ্যে আমাকে বলত, আমাকে কি কোনো দিন অন্য কোনো বিষয়ের ক্লাস দেবেন না? মহসীন একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমি পদক, বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ পেয়েছিল তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে।
ওর সততার কারণে আমাদের শিল্প–সংস্কৃতি অঙ্গনের বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সব নির্বাচনে ওকে নির্বাচন কমিশনার করা হতো। এটা একটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অবসর নেওয়ার পর টিভি নাটকে অভিনয় করেই বেশির ভাগ সময় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে।

মহসীন, একজন সৎ, নিরহংকার, নাটকে নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হিসেবে তুমি আমাদের স্মৃতিতে থাকবে। তোমার সমুখে শান্তি পারাবার।  

default-image

তবিবুল ইসলাম বাবু
১৯৭২-এ আমরা থিয়েটার নাট্যদল গঠন করার কয়েক দিন পরই আবদুল্লাহ আল-মামুন নিয়ে আসেন তবিবুল ইসলাম বাবু নামে নাটকে দারুণ উৎসাহী এক তরুণকে। ওর উদ্যম দেখে আমরা ওকে আমাদের প্রথম নির্বাহী পরিষদের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব দিলাম। সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, সহসভাপতি মামুন ও ইকবাল বাহার চৌধুরী। সম্পাদকের দায়িত্ব আমার।

দুই যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন বাংলা একাডেমির মোতাহার আহমেদ ও ডলি আহমেদ (ইব্রাহিম)। সদস্য হিসেবে ছিলেন নিতুন কুন্ডু, আহমেদ জামান চৌধুরী, কামাল হায়দার, আরিফুল হক, জাহানারা আহমেদ ও ফেরদৌসী মজুমদার। পঞ্চাশ বছরের স্মৃতি রোমন্থনের জন্য আজ আমরা অল্প কজন বেঁচে আছি। শেষ পর্যন্ত বাবুও চলে গেল।

বাবুর মধ্যে ছিল অসম্ভব প্রাণশক্তি আর চঞ্চলতা। একই সঙ্গে প্রচণ্ড রাগী। রাগ হলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যেত। একবার আমরা খুলনায় নাটক করার পরদিন যখন অল্প সময়ের জন্য সুন্দরবন দেখতে গেছি, তখন কোন একটা তুচ্ছ কারণে ফেরদৌসীকে বেশ অপমান করে। ঢাকা ফিরে অবশ্য তার বোধোদয় হয়, বাবুর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আগের মতোই হয়ে যায়।

default-image

বাবু ছিল খুব কৌতুকপ্রিয়। যতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকত সবাইকে একেবারে মাতিয়ে রাখত। সাংগঠনিক কাজে আমাকে খুব সাহায্য করত। ওর দক্ষতার পরিচয় পেয়েছি ১৯৮১ সালে যখন আমরা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে আইটিআইর তৃতীয় বিশ্ব নাট্যোৎসবে গেলাম। টাকা জোগাড় করার জন্য আমাদের নিয়ে কত জায়গায় যে গেছে তা বলার নয়।

বিজ্ঞাপন

যেহেতু সিউলে যাওয়ার দলে সদস্যসংখ্যার সীমাবদ্ধতা ছিল, আমরা অনেককে দলভুক্ত করতে পারিনি। একই অভিনেতা একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেছে। এ নিয়েই যারা যেতে পারেনি, তাদের মধ্যে একটা ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং আস্তে আস্তে তা একটা সংকটে পরিণত হয়। তারই রেশ ধরে আমাদের পুরোনো ১৭ জন সদস্য আরিফুল হকের নেতৃত্বে ‘থিয়েটার’ নামে একটি দল সোসাইটিস অ্যাক্টে রেজিস্ট্রি করে। যদিও বাবু, আরিফুল হক, কেরামত মাওলা দলের সঙ্গে সিউল গিয়েছিলেন, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁরাও ওই বিদ্রোহী দলে যোগদান করেন। এ নিয়ে তাঁরা মামলা পর্যন্ত করেছিলেন।

default-image

যাই হোক সে অধ্যায় আমরা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেছি। বাবুও ওই দল ত্যাগ করে ‘নাট্যজন’ নামে নতুন দল গঠন করে নাট্য প্রযোজনা করেছে।
বাবুর সঙ্গে কিন্তু আমার আর ফেরদৌসীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার ওর স্ত্রী সাঈদাকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসে নানা গল্প করেছে। এই সেদিনও ফেরদৌসীর জন্মদিনে এসে ওরা দুজনে শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
শেষের দিকে বাবুর কথায় অনেকে আহত হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু ওর মনটা ছিল একেবারে শিশুর মতো। বাবু আমাদের কষ্ট যেমন দিয়েছে, আনন্দও কম দেয়নি। আমরা কেবল সুখস্মৃতিগুলোই মনে রেখেছি।
বাবু, এখন তোমার সব চঞ্চলতার অবসান হলো, তোমার চিরশান্তির জন্য আমরা প্রার্থনা করছি।

নাটক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন