default-image

‘এই দেখ দেখ “কিং লিয়ার”। আমি “কিং লিয়া​র”-এর সঙ্গে সেলফি তুলব।’— বলেই দেয়ালে সাঁটানো ছবিটির দিকে পা বাড়ালেন আনুমানিক বিশ বছর বয়সী মেয়েটি। তাঁর সঙ্গে থাকা আরও দুই বান্ধবীর একজন মৃদুস্বরে বলে উঠলেন, ‘এই চল চল দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ অপরজন তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললেন, ‘তোর জন্য আমরা শো মিস করতে চাই না। লাইনে দাঁড়াতে হবে।’

ততক্ষণে সেলফি তুলে মেয়েটি তাঁর হাতে থাকা মুঠোফোনটি বন্ধুদের সামনে ধরে বলল, ‘৬টা বাজতে এখনো ৪৫ মিনিট বাকি।’
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টায় ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে শেক্‌সপিয়ারের ৪০০তম মৃত্যুবার্ষিকী উদ্‌যাপনের আয়োজন করে নালন্দা বিদ্যালয়। তখনো ভেতরে প্রিয় লেখকের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের প্রস্তুতি চলছে। বাকি সময়টা কাটানোর জন্য ছায়ানটের নিচতলার ক্রমেই ভিড় বাড়ছে। বেশির ভাগই শিশু–কিশোরদের দল। তারাই এই আয়োজনের মধ্যমণি। দেয়ালিকায় লেখা, আঁকা যে ছবিগুলো শোভা পাচ্ছে—এসবই শিক্ষার্থীদের করা।

default-image

শেক্‌সপিয়া​রকে নিয়ে নানা লেখকের নির্বাচিত উক্তি, হেনলে স্ট্রিটের যে বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই বাড়ির চিত্রকর্ম আছে। আছে শেক্‌সপিয়ারের রচনা থেকে বিখ্যাত কিছু উক্তি। দেয়ালের একপাশে শেক্‌সপিয়া​র টাইমলাইনেও দেখা গেল নাট্যকার সম্পর্কে ছোট পরিসরে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা। অন্যদিকে রয়েছে ৪০০ বছর আগের শেক্‌সপিয়ারের সময়ের এলিজাবেথীয় যুগ সম্পর্কে ছোট পরিসরে বর্ণনা। রয়েছে শিশুদের আঁকা নানা চিত্র ও অনুশীলনের স্থিরচিত্র। এগুলো সবই শিশু–কিশোরদের আপনমনের মাধুরী মিশিয়ে করা।
মঞ্চে ২ ঘণ্টা ৭ মিনিট জুড়েই ছিল শিশু–কিশোরদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। এরা সবাই নালন্দা স্কুলের নার্সারি থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ভেতরে ঢুকে বসে আছি। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে ঘোষণা এল, সুধীজনদের বিশেষ অনুরোধ করা যাচ্ছে মুঠোফোনটি বন্ধ রাখার জন্য। ভিডিও ও ছবি তোলা বারণ। কিছুক্ষণ নীরবতার পর অন্ধকার মিলনায়​তনে আলো জ্বলতেই ১১ জন ‘আই সি দ্য নেইভরি’ কোরাস গানটি গেয়ে জিতে নিল দর্শকদের মন।

default-image

শিশুদের প্রাণচঞ্চল পরিবেশনায় প্রতিটি পর্বই ছিল মজার। স্টিলের গামলা দিয়ে আবহসংগীত তৈরির চেষ্টাও ভালো লেগেছে। বিশেষ করে গান, নাচ ও অভিনয়ের কথা বলতেই হবে। সম্মিলিত কণ্ঠে ‘সিক’ কবিতার আবৃত্তি ভালো লেগেছে। বাচ্চাদের স্কুল ফাঁকি দেওয়ার জন্য মায়ের কাছে হাজারো অজুহাত। পরে অবশ্য জানা গেল আজ ছুটির দিন, বৃথাই অজুহাতের নাটক! দুষ্টু কাঠবিড়ালিটা নাটকিনের চতুরতা নিয়ে তৈরি নাট্যাংশটি দর্শকদের যথেষ্ট বিনোদন দেয়। দুষ্টু নাটকিনের লেজ একসময় ঠিকই কেটে দেওয়া হয়। মিসিং পিসের গল্প ভালো লাগে। ফক্স ইন সকসের টাং-টুইস্টার উপস্থাপনা ভালো ছিল।
এ সময় ঘোষণা ভেসে এল—‘ইটস আ স্টোরি অব ট্র্যাজেডি। ইট’স নট জাস্ট এ টেল অব ফাদার অ্যান্ড ডটার’স’। বুঝতে বাকি রইল না শেক্‌সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘কিং লিয়ার’ শুরু হতে যাচ্ছে এখন। কিং লিয়ারের বয়স হয়েছে। দেশ শাসনের ভার ছেড়ে ​দিতে চান। তিন কন্যার মধ্যে ভাগ করে দিতে চান রাজ্য। দর্শকদের মধ্য থেকে কেউ একজন ফিসফিস করে বলল, ‘চার কন্যার কিং লিয়ার’।

default-image

কেন সে কথা বলা হলো, তা বোঝা গেল মঞ্চের চরিত্রদের দিকে তাকিয়ে। কিং লিয়ারের চরিত্রে পুরুষবেশে যে শিশুটি অভিনয় করছে, সে-ও মেয়ে। সে যাক। নাটকে তখন বাবা লিয়র রাজ্যসভায় মেয়েদের জিজ্ঞাসা করছেন, কোন মেয়ে তাঁকে কতটা ভালোবাসে। সেই প্রশ্নের জবাবে বড় দুই মেয়ে গনেরিল ও রিগ্যানের গদগদ অস্বাভাবিক ভালোবাসার কথায় বাবার মন ভরে যায়। এবার ছোট মেয়ে কর্ডেলিয়ার পালা। সে জানালো, ‘আমি অবশ্যই ভালোবাসি, তবে সেটা স্বাভাবিকতার বাইরে গিয়ে নয়। আপনি আমায় বড় করেছেন, ভালোবেসেছেন, আমি আমার কর্তব্য করেছি, আপনাকে সম্মান দিয়েছি।’
মেয়ের এমন ভালোবাসা বাবা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। ছোট মেয়েকে রাজ্য থেকে নির্বাসনে পাঠান। দুই মেয়েকে রাজ্য ভাগ করে দেন।

default-image

গল্প এখানেই শেষ না হলেও শিশু-কিশোরদের উপস্থাপনায় কিং লিয়ারকে এখানেই থেমে যেতে হয়। পাশ থেকে এক ছেলে তার মাকে প্রশ্ন করছে, ‘মা কিং লিয়ারকে নির্বাসনে পাঠাবে না?’ মা বললেন, ‘না, এই কিং লিয়ারের ভাগ্য ভালো।’
অনুষ্ঠানে শুরুর ঘোষণা ছিল বাংলায়। বাকি পুরো অনুষ্ঠানই শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে পরিবেশন করে।
সবশেষে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
নালন্দার শিশুরা আজও অনুষ্ঠানটি পরিবেশন করেছে। শেক্‌সপিয়ারের প্রতি শিশুদের এই ভালোবাসার প্রকাশে মন ভরে ওঠে সবার। শিল্পের প্রতি এই ভালোবাসা নিঃসন্দেহে তাদের ভবিষ্যৎ​ নান্দনিক জীবনের পরিচয় বহন করে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0