সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ছবি: আশরাফুল আলম
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এসেছিলেন গঙ্গা-যমুনা উৎসব উদ্বোধন করতে। সেবার শিল্পকলা একাডেমিতে একটি মঞ্চনাটকে অভিনয়ও করেছিলেন তিনি। উৎসবের প্রথম দিন সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনের মঞ্চে উঠেছিলেন ছাড়িগঙ্গা নাটকের ‘জ্ঞানেন্দ্র’ হয়ে। পরদিন সকাল সাড়ে ১০টায় সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন আড্ডায়, শিল্পকলা একাডেমির সাততলার একটি ঘরে। সে আড্ডার কথোপকথন, আসা-যাওয়ার পথে তাঁর সঙ্গে আলাপ নিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর লেখাটি ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোয়। পাঠকদের জন্য লেখাটি আবার তুলে দেওয়া হলো।

সেই ভরাট কণ্ঠ, সেই প্রাণখোলা হাসি!
সামনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়! নীল রঙের হাফ হাতা শার্ট, জিনসের প্যান্ট আর পায়ে দুই ফিতার স্যান্ডেল—কে বলবে জীবনের আশিটা বছর পার করেছেন এই তরুণ! স্মিত হাসি যেন বলছে, ‘ভুল করেননি আপনারা, আমিই অপু, আমিই ফেলুদা। আর হ্যাঁ, আমিই মঞ্চের কিং লিয়ার।’
গঙ্গা যমুনা নাট্যোৎসব উপলক্ষে ঢাকা এসেছেন তিনি। উৎসবের প্রথম দিন সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনের মঞ্চে উঠেছিলেন ‘ছাড়িগঙ্গা’ নাটকের ‘জ্ঞানেন্দ্র’ হয়ে। জ্ঞানেন্দ্র রসায়ন চর্চা করেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, নাটকের অন্য দুই চরিত্র—গোপেশ্বর ও মেঘমালা, মঞ্চ ছেড়েছিলেন কয়েকবার। কিন্তু জ্ঞানেন্দ্র, অর্থাৎ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মঞ্চ ছাড়েননি এক মুহূর্তের জন্যও। পুরোটা সময় থাকলেন মঞ্চে। দাপটের সঙ্গে করলেন অভিনয়, বুঝিয়ে দিলেন, বয়স কোনো বাধা নয় তাঁর কাছে।

default-image

সকাল সাড়ে ১০টায় সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন আড্ডায়, শিল্পকলা একাডেমির সাততলার একটি ঘরে। নাছোড়বান্দার মতো তাঁর পেছনে পেছনে ছিলাম। আসা-যাওয়ার পথে ছোট্ট করে প্রশ্ন করেছি, সস্নেহে দিয়েছেন উত্তর।

বিজ্ঞাপন

২.আপনি অভিনয় করেন, নির্দেশনা দেন, কবিতা লেখেন, ছোট কাগজ সম্পাদনা করেন...
কথা শেষ করতে দেন না সৌমিত্র। বলেন, ‘গত পাঁচ দশক ধরে নিরন্তর ছবিও আঁকছি। ওটাও আমার আরেকটি ভালোবাসা।’

নিজে থেকেই বললেন, ‘ছেলেবেলায় চেহারা নিয়ে খুব হীনমন্যতায় ভুগতাম। তবে এর কারণ ছিল। টাইফয়েড হয়েছিল। রোগা পটকা ছিলাম। বাড়ির লোকেরা বলত, এ রকম একটা ছেলে হলো আমাদের বাড়িতে! একে তো কালো, তার ওপর নাক-চোখ তেমন নেই। মনে মনে সংকোচ বোধ করতাম। খেলাধুলাতে উৎসাহ ছিল, তবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো নয়।

default-image

একবার একনাগাড়ে ৬৩ দিন জ্বর ছিল শরীরে। ডাক্তার বাবু আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। শরীর আরও ভেঙে যায়। পড়াশোনা মোটামুটি করতাম—এমন নয় যে সবাই ধন্য ধন্য করবে। কিন্তু খুব ছোটবেলা থেকে যখনই অভিনয় করতাম, সবাই ভালো বলত। ওই লোভটা আমার ভেতরে দ্রুত বেড়ে উঠেছিল। ভাবলাম, অভিনয় করলে নিজেকে আড়াল করা যাবে। সবাই ভাববে, এ তো অভিনয় করছে, বাস্তবে এমন না।’

default-image

৩.শেষের কবিতার অমিত রায়ের আবৃত্তিগুলো দারুণভাবে আলোড়িত করত আমাদের। ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’, ‘চুমিয়া যেও তুমি’, ‘দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর’, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও’—ভরাট কণ্ঠের এই অমিত রায়ই সত্যজিৎ রায়ের ৩৪টি সিনেমার ১৪টিতেই অভিনয় করা সৌমিত্র, সেটা জেনে রোমাঞ্চিত হয়েছেন কত তরুণ! তাই অবধারিত প্রশ্ন এবার, ‘অভিনয়ের জন্য কি আবৃত্তিটা বিশেষ প্রয়োজন?’

‘আবৃত্তি অভিনয়ের জন্য ভীষণ রকম দরকার। যারা এটা বোঝে না, তারা এখনো চোখ বুজে আছে। অভিনয়ের প্রারম্ভিক কাজ কথা বলা, সেটা আবৃত্তিচর্চা ছাড়া হয় না। আমি প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে আবৃত্তি ও গান করি। সর্বোপরি একজন অভিনেতাকে চার অক্ষরের একটি শব্দকে আঁকড়ে রাখতে হয়, তা হলো— ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া কিছু হয় না।’

default-image

‘আবৃত্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেই আমার “ঋষি ঋণ”’, বললেন সৌমিত্র। ‘রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ নিয়ে আমার পরিবারের লোকেরাও নানা কথা বলত। ওই সময়ে আবৃত্তির রেকর্ডিংগুলো খারাপ মানের ছিল। তবে দেশের বাইরে যে দু-একটা রেকর্ডিং আছে, তা শুনেই বুঝেছি, তাঁর কণ্ঠে কী গভীরতা ছিল।’

default-image

.সৌমিত্রর অভিনয়জগতে আসার গল্প এখন নতুন কিছু নয়। সবাই জানে, কীভাবে ‘অপরাজিত’ ছবিতে অপুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সত্যজিৎ রায়ের কাছে এসেছিলেন তিনি। কিশোর অপুর চেয়ে তাঁর বয়স ছিল একটু বেশি। তাই সত্যজিতের পরবর্তী ছবি ‘অপুর সংসার’ই হয়ে গেল সৌমিত্রের চলচ্চিত্রজগতে ভিত্তি গড়ে তোলার গল্প। ‘এ সময় আমার চিকেন পক্স হলো।

বিজ্ঞাপন

সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে গেলে তিনি আমাকে দেখে বললেন, ‘আরে কই! সবাই যে বলাবলি করছিল, মুখে দাগটাগ হয়েছে, কই তেমন তো দেখছি না!’ একদিন সত্যজিৎ রায় আমাকে ছবি বিশ্বাসের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, “ছবিদা, এর নাম সৌমিত্র। এ হচ্ছে আমার ‘অপুর সংসার’-এর অপু।” সেদিন থেকে বিপুল লড়াই, সংগ্রাম করে ৫৫ বছর ধরে টিকে আছি।’

default-image

৫.সময় কম। লিফটের কাছে যেতে যেতে আরেকটি প্রশ্ন করি, আশি পেরিয়ে এখনো আপনি এ রকম তরুণ থাকলেন কী করে?’
সেই চিরচেনা স্মিতহাসি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ঠোঁটে। ‘ব্যাপারটা আসলে ঠিক তা নয়। বাইরে থেকে হয়তো লোকেরা চিরসবুজ ভাবে। আসলে তো কেউ চিরসবুজ থাকে না। বিশেষ করে চিরসবুজ থাকার জন্য মানুষের মাঝে যে ইচ্ছা জন্মায়, সেটা হয়তো এই হতে পারে যে আমি এখনো কর্মক্ষম আছি কিংবা কাজে ব্যস্ত আছি। এখনো নাটক করছি, নাটক লিখছি। কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানে নিয়মিত ডাকা হয় এবং আমি তাতে অংশগ্রহণ করি। হয়তো সে জন্যই লোকে ভাবছে যে সমানতালে ঘোড়া ছুটছে। আর অসুখ-বিসুখ কিছুটা তো আছেই, সেগুলো নিয়েই তো জীবনটা চলছে।’

default-image
মন্তব্য পড়ুন 0