সদ্য প্রয়াত নাট্যজন আলী যাকেরের প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে শুরু হয় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ৪০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান
সদ্য প্রয়াত নাট্যজন আলী যাকেরের প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে শুরু হয় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ৪০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতার পরে একদল যুবক থিয়েটার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কেটে যায় বেশ কয়েক বছর। থিয়েটারকে আরও বেগবান এবং থিয়েটারসংশ্লিষ্ট স্বার্থ রক্ষায় তৈরি হলো নতুন এক সংগঠন—বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন। ১৯৮০ সালের ২৯ নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি এখন পরিণত হয়েছে নাট্যাঙ্গনের মহিরুহ হিসেবে। পার করেছে চার-চারটি দশক, তৈরি হয়েছে প্রায় ৪০০ সদস্য।

৪০ বছরের পথচলায় সংগঠনটি থিয়েটারকে যেমন নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্র অনাবাদি থেকে গেছে খানিকটা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এখনো থিয়েটারের পেশাদারি চর্চা গড়ে ওঠেনি এ দেশে। প্রতিবছর এই দিনে সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুই মিলিয়েই  স্মৃতিচারণা করেন সংগঠনের নেতারা। তবে রোববার করোনাকালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ৪০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানটি ছিল ব্যতিক্রম। আয়োজন ঘিরে ছিল বেদনার আবহ। তাই বের হয়নি বর্ণিল শোভাযাত্রা। ওড়ানো হয়নি রঙিন বেলুন। করোনা মহামারিতে আলী যাকেরসহ সংস্কৃতিজনদের চলে যাওয়ার বিষাদ ভর করেছিল বর্ষপূর্তির এ আয়োজনে। ফেডারেশনের চার দশক পূর্তির অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয় আলী যাকেরকে।

বিজ্ঞাপন

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে নাট্যশালার বাইরের বারান্দায় প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় এ বছরের প্রয়াত সংস্কৃতিজনদের। এরপর সবাই মিলে চলে আসেন নাট্যশালার ভেতরের লবিতে। সেখানে রাখা ছিল হাস্যোজ্জ্বল অভিব্যক্তিতে দৃশ্যমান আলী যাকেরের প্রতিকৃতি। ফুল আর প্রদীপের আলোয় আলোকিত প্রতিকৃতির নিচে আলী যাকেরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখা ছিল, ‘তুমিই তো একদিন দেখালে পারি আমরাও, অভিনয় নিয়ে যেতে শিল্পের সমুন্নত শিখরে/নূরলদীনের মতো নিভৃত কোলাহলে তুমি উদ্‌যাপিত হবে ভাবীকালে...’। সাদা-কালোর প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ, আতাউর রহমান, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, লাকী ইনাম ও ম হামিদ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ।

default-image

আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। লাকী ইনামের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন আতাউর রহমান, মামুনুর রশীদ, ম হামিদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, দেবপ্রসাদ দুলাল দেবনাথ, ঝুনা চৌধুরী, কামাল বায়েজিদ ও আকতারুজ্জামান। শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মো. নওশাদ হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন কামাল বায়েজীদ। আলোচনার আগে প্রয়াত সংস্কৃতিজনদের স্মরণে পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা।

প্রসঙ্গত, মঞ্চনাটককে অনেকেই চিহ্নিত করেন মুক্তিযুদ্ধের ফসল হিসেবে। যুদ্ধোত্তর দেশে মঞ্চনাটক যাঁদের হাতে গড়ে ওঠে, সমৃদ্ধি পায়, শক্তিশালী ‘গ্রুপ থিয়েটার’ আন্দোলন দাঁড়ায়, তাঁরা নিজেরা নানা মাত্রায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম নাটক মঞ্চায়ন করে আরণ্যক নাট্যদল।

default-image

১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে নাটকটির প্রথম মঞ্চায়নে আলী যাকের, সুভাষ দত্ত, ইনামুল হক ও মামুনুর রশীদের মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা অংশ নিয়েছিলেন। পরের বছর ১৯৭৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ‘বাকী ইতিহাস’ মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দর্শনীর বিনিময়ে প্রথম নাটক প্রদর্শিত হয়। কালের পরিক্রমায় সেই মঞ্চনাটক দেশের শিল্পমাধ্যমে নিজের একটি আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

default-image

এই গৌরবোজ্জ্বল যাত্রাপথে আলো ছড়িয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন, সাঈদ আহমদ, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিম আল দীন, এস এম সোলাইমান, হুমায়ুন ফরিদী, খালেদ খান, মমতাজউদ্দীন আহমেদ, আলী যাকের, আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদ, ফেরদৌসী মজুমদার, সারা যাকের, তারিক আনাম খান, জামিল আহমেদ, সুবর্ণা মোস্তফা, আফজাল হোসেন, লাকী ইনাম, শিমূল ইউসুফ, রোকেয়া রফিক বেবী প্রমুখের মতো নাট্যজনেরা। মঞ্চকর্মীরাই আলোকিত করে রেখেছেন বাংলাদেশের নাটক, চলচ্চিত্র আর সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন মাধ্যমকে।

বিজ্ঞাপন

গত চার দশকে থিয়েটারে ছড়িয়েছে ডালপালা। নতুন নতুন নাট্যদল গড়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গেও যোগাযোগ বেড়েছে। শেক্‌সপিয়ারের বিশ্বখ্যাত গ্লোব থিয়েটার জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ করে হ্যামলেট। দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যতত্ত্বের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে নাট্যচর্চা করে যাচ্ছেন নাট্যকর্মীরা। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব শিক্ষার বিষয় হয়ে উঠেছে দেশের বেশ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) কেন্দ্রীয় সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেছেন রামেন্দু মজুমদার। বর্তমানে তিনি এ সংগঠনের সাম্মানিক সভাপতি।

default-image

বিগত বছরগুলোয় দেশের নাট্যকর্মীরা শুধু দেশীয় গল্প বা স্থানীয়দের লেখায় সীমাবদ্ধ রাখেননি দেশের থিয়েটারচর্চা। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের মঞ্চে শেক্‌সপিয়ার, স্যামুয়েল বেকেট, ব্রের্টল্ট ব্রেখট, জাঁ পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কামু, মলিয়ের, হেনরিক ইবসেনদের উপস্থিতি ঋদ্ধ করে চলেছে থিয়েটার চর্চাকে। নাট্যচর্চা ছড়িয়ে পড়েছে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতারা মনে করেন, মঞ্চনাটকের ক্রমাগত পরিবর্তন হয়েছে মূলত নাট্যকর্মীদের আন্তরিকতার কারণে।
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার

ফেডারেশনের যাত্রা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে আমি ১৯৮০ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে নাট্যদলগুলোর একটি প্রতিনিধি সভা আহ্বান করেছিলাম। মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে সেদিনের সভায় ঢাকার ২১টি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৭টি মোট ৩৮টি নাট্যদলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছিলেন। সেদিনের সভায় নাট্যদলগুলোর একটি ফেডারেশন গঠনের ব্যাপারে সবাই একমত হন। তাই ২৯ নভেম্বরকেই পরবর্তী সময়ে চিহ্নিত করা হলো গ্রুপ থিয়েটার দিবস হিসেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৪০ বছরের এই সময়ে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালে অর্জন-ব্যর্থতা দুই-ই চোখে পড়ে। তবে নিঃসন্দেহে অর্জনের পাল্লা অনেক ভারী। ফেডারেশন আজ নাট্যকর্মীদের সমবেত শক্তি। এত রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও ফেডারেশনের ঐক্যে কোনো ফাটল ধরেনি এবং সহজে ধরবে না বলেই আমার বিশ্বাস। পাশাপাশি কিছু ব্যর্থতার জন্যও মনটা বিষণ্ন হয়ে যায়। বাংলাদেশের নাটকের সামগ্রিক মানোন্নয়নে আমরা তেমন কোনো অবদান রাখতে পারিনি। নাটক করা সবার গণতান্ত্রিক অধিকার, তাই কোনো প্রযোজনাকে খারাপ বলতে পারি না।’

default-image
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রথম সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। শুরু থেকে আমি ফেডারেশনের বিরোধিতা করেছিলাম। আজকে বুঝতে পারছি, আমার সেই বিরোধিতা অমূলক নয়। কারণ, সাংগঠনিকতা বৃদ্ধি পাওয়াতে সৃজনশীলতা কমে যাচ্ছে। যার কারণে নাটকের মানও এখন নিম্নমুখী। ঢাকার বাইরের নাটকের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ঢাকার নাটকের উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বাইরের নাটকের উৎকর্ষ না হয়, তাহলে আমি মনে করি, নাটকের সামগ্রিক মান এখনো অনুন্নত।
মামুনুর রশিদ
default-image

মামুনুর রশীদ বলেন, ‘গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রথম সভায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। শুরু থেকে আমি ফেডারেশনের বিরোধিতা করেছিলাম। আজকে বুঝতে পারছি, আমার সেই বিরোধিতা অমূলক নয়। কারণ, সাংগঠনিকতা বৃদ্ধি পাওয়াতে সৃজনশীলতা কমে যাচ্ছে। যার কারণে নাটকের মানও এখন নিম্নমুখী। ঢাকার বাইরের নাটকের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ঢাকার নাটকের উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বাইরের নাটকের উৎকর্ষ না হয়, তাহলে আমি মনে করি, নাটকের সামগ্রিক মান এখনো অনুন্নত।’

default-image

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, বিগত ৪০ বছরে মঞ্চনাটকের বিকাশে কাজ করেছে ফেডারেশন। ধারাবাহিকভাবে নাট্য আন্দোলন চালিয়ে গেছে। আন্দোলনের কারণে মঞ্চনাটকে বিলোপ হয়েছে সেন্সরশিপ। এ ছাড়া কর্মশালাসহ নানা আয়োজনের মাধ্যমে কাজ করছে ফেডারেশন। তবে সেই অর্থে নাট্যচর্চা ছড়িয়ে যায়নি সারা দেশে। ঢাকার বাইরে বলতে গেলে নাটকের উপযোগী মঞ্চ নেই। তাই জেলা-উপজেলায় নাটকের জন্য মঞ্চ গড়তে হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রসঙ্গত, ফেডারেশনের নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নাট্যবিষয়ক কর্মশালা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, নাট্যোৎসব আয়োজন, মে দিবস পালন, বিজয় উৎসব উদ্‌যাপন, গুণী নাট্যজনদের সংবর্ধনা প্রদান, দেশব্যাপী নাট্যবিষয়ক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও তাতে সহায়তা প্রদান ইত্যাদি।

default-image

১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ফেডারেশন পথনাটক, মিছিল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি করে এই সংগঠন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ফেডারেশনভুক্ত নাট্যকর্মীরা ভূমিকা পালন করে আসছেন। অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিলের ক্ষেত্রে ফেডারেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতারা মনে করেন, মঞ্চনাটকের ক্রমাগত পরিবর্তন হয়েছে মূলত নাট্যকর্মীদের আন্তরিকতার কারণে। তবে শুধু গ্রুপ থিয়েটার বা মঞ্চনাটকের কর্মীরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে যথেষ্ট নন। দেশের অন্যতম প্রধান এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তা, ধনী ব্যক্তি ও ফাউন্ডেশনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

default-image
মন্তব্য করুন