আপনি সিলেট গিয়েছেন কবে?

২০–২৫ দিন আগে সিলেটে প্রথম বন্যা হয়। তখন আমরা কথা দিয়েছিলাম সিলেটের মানুষের পাশে থাকব। সেই সময় আমাদের সিঙ্গাপুরে একটি শো ছিল। আমরা চেয়েছিলাম শো থেকে পাওয়া আয় নিয়ে সিলেট যাব। তখন পানি নেমে যাবে। মানুষের দুর্ভোগটা আরও বাড়বে। শো শেষে ১৩ জুন দেশে ফিরে ১৪ তারিখে সিলেট আসি কথা রক্ষার জন্য। আমরা এক লাখ টাকা নিয়ে আসি। সেদিন থেকেই কাকতালীয়ভাবে সিলেটে পানি ও বৃষ্টি বাড়তে শুরু করে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই, পরিস্থিতি ভালো না, এক লাখ টাকায় হবে না।

default-image
শো শেষে ১৩ জুন দেশে ফিরে ১৪ তারিখে সিলেট আসি কথা রক্ষার জন্য। আমরা এক লাখ টাকা নিয়ে আসি। সেদিন থেকেই কাকতালীয়ভাবে সিলেটে পানি ও বৃষ্টি বাড়তে শুরু করে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই, পরিস্থিতি ভালো না, এক লাখ টাকায় হবে না।

তখন তো আবার ফান্ড সংগ্রহ শুরু করলেন?

হ্যাঁ, ভাবছিলাম এক লাখ টাকায় কী করতে পারব? তখন একটি ছবি পোস্ট করে বলি, ‘এক-দুই লাখ টাকা পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না। আমি সিলেট থেকে কোনোভাবেই পালিয়ে যেতে চাই না। আপনারা পাশে দাঁড়ান।’ এর ঠিক ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টায় ১৪ লাখ টাকা দিয়ে মানুষ পাশে দাঁড়ায়। পরে আমাদের নম্বরগুলো লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে। এটাও পর্যাপ্ত ছিল না। গত পরশু আমরা আবার তৃতীয়বারের মতো ফান্ড রাইজিং করি। সেখানে অবিশ্বাস্যভাবে এক দিনে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি টাকা মানুষ পাঠিয়েছে। মানুষের এই ভালোবাসা আমাকে ইমোশনাল করে দিয়েছে। ইচ্ছা করছে, অর্থসহায়তা দেওয়া প্রতিটি মানুষের পা ছুঁয়ে সালাম করি। তারা আমাদের মতো তরুণদের অনেক বড় একটা স্বপ্ন দেখাল।

অনেক দুর্গম এলাকায় ত্রাণসহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন, সেখানে পৌঁছাতে গিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন?

অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছানোটাই গুরত্বপূর্ণ ছিল। তখন নিজেদের কথা ভাবিনি। আমি যদি প্রত্যন্ত এলাকায় ঢুকতে না পারি, তাহলে দেশের অনেক মানুষ বন্যার প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে না। ঝুঁকি নিয়ে এমন সব এলাকায় গিয়েছি, যেখানে টিনের চালে চালে মানুষ। চোখের সামনে দেখছি মানুষ, পশু, ঘরবাড়ি স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এমনও হয়েছে, নৌকার অভাবে ত্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। দায়রা বাজার, গুচ্ছগ্রাম, টিলাগাঁও কোনোভাবেই যেতে পারিনি। পরে সেনাবাহিনী আমাদের অনেক সহায়তা করেছে।

পরশু আমরা আবার তৃতীয়বারের মতো ফান্ড রাইজিং করি। সেখানে অবিশ্বাস্যভাবে এক দিনে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি টাকা মানুষ পাঠিয়েছে। মানুষের এই ভালোবাসা আমাকে ইমোশনাল করে দিয়েছে। ইচ্ছা করছে, অর্থসহায়তা দেওয়া প্রতিটি মানুষের পা ছুঁয়ে সালাম করি। তারা আমাদের মতো তরুণদের অনেক বড় একটা স্বপ্ন দেখাল।
default-image

সেই মুহূর্তগুলো কেমন ছিল?

আমাদের মাথায় একটা চিন্তাই কাজ করছিল, মানুষ বিপদে আছে, তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে।

অনেক মানুষ আপনাদের প্রশংসা করছেন...

আমি তেমন কিছুই জানি না। আমরা প্রতিদিন ভোরে বাসা থেকে বের হই, আবার ফিরতে ফিরতে রাত দুইটা–তিনটা বেজে যায়। সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা ঘুমাতে পারি। তাঁরা আমাদের লাইভ শেয়ার করেছেন। পুরো দেশের মানুষ ভরসা করেছেন—এটা আমাদের অন্য রকম প্রাপ্তি।

default-image

আপনারা টিম নিয়ে থাকছেন কোথায়?

ম্যাক্সিমাম সময় যেখানে রাত হচ্ছে, সেখানেই থাকি। থাকা–খাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা নেই।

আপনাদের এখন পরিকল্পনা কী?

আমাদের দুই শতাধিক সদস্য রয়েছেন। এর আগে পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পরেছি। এবার সবাই মিলে পরিকল্পনা করছি আগামী চার দিন সিলেট থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন, এমন ১০ হাজার পরিবারের পাশে দাঁড়াব। প্রতিটা পরিবারে ১০ থেকে ১৫ দিনের খাবার পৌঁছে দেব। শুকনা খাবারের সঙ্গে এবার যোগ হবে চাল–ডালসহ অন্যান্য খাবার।

default-image
এবার সবাই মিলে পরিকল্পনা করছি আগামী চার দিন সিলেট থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন, এমন ১০ হাজার পরিবারের পাশে দাঁড়াব। প্রতিটা পরিবারে ১০ থেকে ১৫ দিনের খাবার পৌঁছে দেব। শুকনা খাবারের সঙ্গে এবার যোগ হবে চাল–ডালসহ অন্যান্য খাবার।

আপনি ফেসবুক লাইভে বলেছিলেন, একজন গর্ভবতী নারীকে সহায়তার জন্য নৌকার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। পরে কি হয়েছিল?

অনেক কষ্টে নৌকার ব্যবস্থা করেছিলাম। ওই নারীর বোন আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এত পানি, তিনিও বাড়ি ঠিকমতো চিনতে পারছিলেন না। পরে সেই বাড়ি খুঁজে পেয়েছিলাম। গিয়ে শুনলাম তাঁরা অন্য একটি নৌকায় সিলেটের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এখন খুশি হব ক্যামনে, সিলেট যেতে এখান থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। পানির যে স্রোত, পৌঁছাতে পারবে কি না, সেই চিন্তা হচ্ছিল। এমন পারিবারিক হাজারো পরিস্থিতি মর্মাহত করেছে। আমাদের পরিচিত একটি ছেলে শুরুর দিকে ফেসবুক লাইভে পানি বেড়ে যাওয়া নিয়ে সতর্ক করছিল, সে–ও মারা গেছে। অনেক খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শুরুটা কি এবারই প্রথম?

ছোটবেলা থেকে আমার ইচ্ছা ছিল সামর্থ্য হলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ইচ্ছা পূরণ করব। পরে যখন আমি গান শুরু করি, তখন কিছুটা অর্থ হাতে আসতে থাকে। মানুষের ইচ্ছা পূরণ করতে করতেই করোনা দেখা দেয়, তখন একটু বড় পরিসরে মানুষের পাশে দাঁড়াই। বন্ধু ও পরিচিতজনের চোখের অপারেশন, কারও মায়ের অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়াই। একসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমার কাছে নেশা হয়ে দাঁড়ায়।

default-image

মানুষের পাশে দাঁড়ানো নিয়ে কখনো নেতিবাচক কোনো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি হতে হয়েছেন?

১০ লাখ কমেন্টের মধ্যে ১০টিও নেগেটিভ কমেন্ট দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা, আমার মন ফ্রেশ। যখন যা হচ্ছে, আমি ফেসবুকে শেয়ার করছি। আমাদের সব খরচ বিস্তারিত লেখা আছে। যে কেউ চাইলে সঙ্গে সঙ্গে দেখাতে পারব। এখন প্রশাসনের লোক সঙ্গে আছেন, তাঁদের কাছেও শেয়ার করছি আমাদের ফান্ডে কত টাকা আছে। সবার সঙ্গে পরিকল্পনা করেই কর্মসূচি নেই। সন্দেহের জায়গাটা রাখি না। আগামী দিনে ইচ্ছা আছে ফাউন্ডেশন করার। অনেকেই এই কথা বলেছেন। কিন্তু এখানে অনেক সময় দিতে হবে, পারব কি না এটাই ভয়। দেখা যাক।

আপনার নিজ জেলা নেত্রকোনার খবর কী?

এখানে কাজ শেষ করে দু–তিন দিনের মধ্যে দু–এক দিনের জন্য নেত্রকোনা চলে যাব। তাদের পাশেও দাঁড়াব।

default-image

গান করা শুরু কীভাবে?

আমি লুকিয়ে লুকিয়ে গান লিখতাম, সুর করতাম, গাইতাম। ২০১৬ সালে ভাইয়া বলল, তুমি যেহেতু গান লেখো, সুর করো, প্রকাশ করো না, তুমি তাহলে ইউটিউবে প্রকাশ করো। তোমার প্রতিভা থাকলে মানুষ তোমার গান শুনবে, খুঁজে বের করবে। ‘এক বছর’, ‘বেহায়া মন’, ‘পোষা পাখি’ একাই কাভার করি। পরে এলাকার ছোট ভাই, ভার্সিটির বন্ধু, ভাই মিলে ব্যান্ড গড়ি।

নতুন গানের কী খবর?

‘কুঁড়েঘর’ নামে আমাদের একটি গানের দল আছে। ২০১৭ সাল থেকে ব্যান্ডটি নিয়ে যাত্রা শুরু করি। ‘আমি মানে তুমি’, ‘ব্যাচেলর’, ‘ময়নারে’সহ ৯০টির মতো মৌলিক গান রয়েছে। দেশ ও দেশের বাইরে কনসার্ট করছি। বর্তমানে ত্রাণ কার্যক্রম শেষ হলেই গানে ফিরব।

১০ লাখ কমেন্টের মধ্যে ১০টিও নেগেটিভ কমেন্ট দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা, আমার মন ফ্রেশ। যখন যা হচ্ছে, আমি ফেসবুকে শেয়ার করছি। আমাদের সব খরচ বিস্তারিত লেখা আছে। যে কেউ চাইলে সঙ্গে সঙ্গে দেখাতে পারব।
default-image
আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন