আপনাকে ফোনে পাচ্ছিলাম না।

বেতারে এসেছিলাম অভিনয়ের কাজে। বেশ কিছুদিন পর আবার বেতারের নাটক করলাম। তারা এখন অনেককেই ডাকে। মঞ্চ, টেলিভিশনের অনেকেই থাকেন। একসঙ্গে কাজ করে মজাই লাগে। এমনিতে সবার সঙ্গে দেখা হয় না। এই সময় দেখা হয়, আড্ডা হয়।

আপনি কি অভিনয় করবেন, নাকি পরিচালনা?

বেতারে অভিনয়ের জন্য যাওয়া। দুই বছর ধরে বেতারে এমন একজন আছেন, যিনি দেখি সবাইকে সংযুক্ত করেন। তিনি যেহেতু রেডিওতে কাজ করেন, ভাবেন যে রেডিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্ব বজায় রাখতে প্রোডাকশনটা যেন তেমন মানের হয়, সেই চেষ্টা করেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও দেখি প্রোডাকশনের সময় উপস্থিত থাকেন। বোঝা যায়, আগের চেয়ে বেতারও এখন খুব আন্তরিক।

সার্বিক সহযোগিতা কেমন পান?

আগে মানুষ অনেক সময় দিতে পারত। এখন আমরা বলতে পারব না যে অনেক সময় দিতে পারি। যেটুকু সময় দেওয়া যায়, তার মধ্যে যতটা ভালো করা যায় আরকি। তাঁরাও চেষ্টা করেন, শিল্পীরাও চেষ্টা করেন। দুইটা/তিনটা বিষয় আমার চোখে পড়েছে। যেমন অভিনয়ের মানুষদের ডেকে এনে নাটক করানো, রেডিওর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করা, দর্শকের সঙ্গে সর্ম্পক তৈরির চেষ্টা করা, যাতে রেডিওর নাটকও দর্শকেরা সিরিয়াসলি নেন। এতে শিল্পীদের অনেক লাভ বলে মনে করি। আমাদের দেখা–সাক্ষাৎ পরস্পরের সঙ্গে সাধারণত হয় না। বেতারের নাটক করতে এসে বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ এক জায়গায় মিলিত হন। একটা ঘরে নাটক হওয়া মানে, জমে যায় বিষয়টা। রেডিওতে অভিনয়ের কিন্তু আলাদা একটা আর্ট আছে। প্রতিটা মাধ্যমেরই আলাদা বৈশিষ্ট্য। সবাই যখন স্ক্রিপ্ট নিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ান, চেষ্টা করেন নিজের ভেতর থেকে সবকিছু উজাড় করে দিতে। সব মিলিয়ে ভালোই।

default-image

আজকের নাটকে কে কে ছিলেন?

আজাদ আবুল কালাম, মনির খান শিমুল, চাঁদনি, হৃদি হক, নাজনীন চুমকি, দিলারা জামান। গানের মুহিনও অভিনয় করল।

নাটকের নাম কী?

তিন পর্বের এই নাটকের নাম ‘জীবন মানে সিনেমা নয়’। নাটকটি লিখেছেন তারিক মনজুর, প্রযোজক যাত্রী ফেরদৌসী। রেডিওর জন্য মজার একটি কাজ।

‘জীবন মানে সিনেমা নয়’ নাটকের নামটি শুনে প্রশ্নটা মাথায় এল। আপনার কাছে জীবন মানে কী?

(হাসি) জীবন মানে হচ্ছে অভিজ্ঞতা। জীবনের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্তে নতুন কিছু জানতে পারছি, বুঝতে পারছি। নানান বিষয়ে অভিজ্ঞতা হয়েছে। খুবই ইন্টারেস্টিং। আমরা ছোটবেলায় রাফ খাতায় লিখতাম পেনসিল দিয়ে। এরপর সব মুছে আবার নতুন করে লিখতাম। জীবনে মোছামুছির সুযোগ নেই। জীবনটা রাফ খাতা নয় (হাসি)। আমার কাছে সবকিছুর পরও মনে হয়, জীবনের এই অভিজ্ঞতা আনন্দময়। এটা আবার নির্ভর করে, কে কীভাবে দেখছে—সে বিষয়ের ওপর। দুঃখটাও আনন্দময়। কারণ, নতুনভাবে নতুন কিছু দেখার ব্যাপার।

জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেছেন। এমন কিছু কি আছে, যা অর্জিত হয়নি কিন্তু অর্জন করতে চান?

প্রথমত আমার জীবনে কোনো চাওয়া নেই। চাওয়ার দরকারই কী আছে? কিন্তু মনে হয়, আমি একটু ভালো লিখি। ভালো আঁকি। সবকিছু আলাদা করে যেন ভাবতে পারি। চাওয়া মানেই যে এটা আমার দরকার, ওটা আমার দরকার, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়।

আপনার নির্মাণ, অভিনয়, আঁকাআঁকি—সব মিলিয়ে একটা বর্ণাঢ্য জীবন। তারপরও মনের মধ্যে অনেক ধরনের প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তির হিসাব থাকে।

তুমি যেটা বললে যে বর্ণাঢ্য জীবন, এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কতজনেরই জীবন বর্ণাঢ্য হয়! মানুষ সাফল্য, সম্মান, মর্যাদা—নানান কিছু খোঁজে। অর্থ, বিত্ত, বৈভব কত কিছুই খোঁজে। কিন্তু জীবন একটা এবং সেটা বর্ণাঢ্য—এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। তাহলে পলে পলে তুমি উন্মুখ করেছ, করছ—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মৃত্যু অবধারিত বিষয়। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে যে সময়, সেটা রঙিন । নানান কিছুতে পূর্ণ। সেটা যদি দুঃখেও হয়, হতাশায়ও হয়, তবু সেগুলো প্রাপ্তি।

default-image

মৃত্যু কি আপনাকে ভাবায়?

একদমই না। শুধু মনে হয় যে ঘরে অসুস্থ মা আছেন, অসুস্থতার কষ্টটা অবশ্য পীড়া দেয়। মৃত্যু তো অবধারিত। দীর্ঘকাল কষ্ট করে মৃত্যুটা বেদনাদায়ক। নির্মমতা হচ্ছে, আমরা মায়ের রোগে ভোগার কষ্টটা দেখি। তারপরও কিন্তু আমরা চাই যে মা আমাদের সঙ্গে থাককু আরও অনেকটা সময়। শত কষ্টে হোক। জীবন খুবই অদ্ভুত। আমরা কেউই চাই না, মা চলে যাক।

বিনোদন অঙ্গনের অনেকেরই অভিমত, আপনাকে অভিনয়ে একটু নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে। সবাই এতে আনন্দিত। আপনাকে কতটা আনন্দিত করছে?

আমরা যখন অভিনয় শুরু করি, তখন আমাদের প্রধান এবং প্রথম ভালোবাসা ছিল অভিনয়। থিয়েটার, নাটক এটাই ছিল কিন্তু। একটানা অনেক দিন কাজ করার পর পরিধিটা বাড়ল। আমরা চেয়েছিলাম যে একটা টেলিভিশন থেকে বহু হোক। কাজের ক্ষেত্র বাড়ুক। তারপর আমরা দেখেছি কি, বহু টেলিভিশন হয়েছে ঠিকই কিন্তু বহু নাটক হতে গিয়ে, এটার যে আনন্দময় দিক, সেটা মাইনাস হয়েছে। একটা সময় মনে হয়েছে, আমি অভিনয় করব কেন! নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। হয়তো কখনো কখনো আনন্দ ছিল না, তাই। কখনো কখনো অভিনয় ভালোবাসি বলেই যুক্ত থাকার জন্য, কখনো কেউ ভিন্ন কিছু করতে চাইলে, যতটুকু পারা যায় যুক্ত থেকেছি। এখন একটু পরিবর্তন এসেছে। টেলিভিশন এখন এলোমেলোভাবে এগিয়ে যাওয়ার ফল ভোগ করছে। কিছু কিছু মানুষকে বলতে হয়, ইউটিউবে দর্শকসংখ্যা এত! কিন্তু ভাবতে হবে এটা টেলিভিশনের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটার কথা কিন্তু আমরা বলি না। আমরা বলি, অমুক টেলিভিশনের নাটক ইউটিউবের ভিউ এত! তার মানেটা কী? তার মানে, যে মাধ্যমের জন্য আমরা কাজ করছি, সে মাধ্যমকে আমরা গৌণ করে ফেলছি। অন্য একটা মাধ্যমের আশ্রয় চাচ্ছি, এটা একটা ব্যর্থতা। অথচ এটা কেউ ভাবেনও না। যাঁরা নাটক করছেন এবং গৌরব করছেন, নাটকের ভিউ এত, তাঁরাও কিন্তু গৌরবটা টেলিভিশন নিয়ে করেন না। কিন্তু কাজটা করেন টেলিভিশনের জন্য। যা–ই হোক, এসবের পরও এর মধ্য দিয়েই একটা নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। নতুন প্রজন্ম ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করেছে। তারা কাজটা করার সময় শুধু মাথায় রাখে না, আমার দেশের দর্শকেরাই দেখবে। আমার দেশের দর্শকের এই জিনিস পছন্দ, এটা খায়, সেটাই তুলে ধরি, তা নয়। তাকে এখন সমস্ত বিশ্বের সামনে দাঁড়াতে হয়। এ কারণে যেকোনো ভাষার লোক এই কনটেন্ট দেখবে। এই বিশ্বাস মাথায় রেখে কাজ করতে হচ্ছে। তার মানে মানটার মধ্যে একটা আন্তর্জাতিকতা তৈরি হয়ে পড়েছে, যাতে করে পরিবেশনা আলাদা হচ্ছে। তাতে মনে হয়েছে, আমরা যারা আবেগ দিয়ে অভিনয় করতে চাইতাম, ভালো করি বা মন্দ করি—আমাদেরও একটা সুযোগ তৈরি হলো। এই সময়ে এসে কেউ একটা চরিত্র লিখছে। একটা গল্প বলে মানুষকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। হয়তো একটা ভালো চরিত্র লিখছে, যেটা একজন অভিনেতার জন্য সুযোগ। সেই সুযোগ পাচ্ছি—এটা ভীষণ আনন্দের। অনেক দিন ধরে কাজ করি। ৭৪ সাল থেকে অভিনয় করি, এখন ২০২২। এখন যারা ২০–২২ বছরের ছেলে–মেয়ে, যারাই এই মাধ্যমে কাজ করছে, নতুন চিন্তা নিয়ে কাজ করছে। সেই চিন্তার সঙ্গে আমরা যে যুক্ত হচ্ছি, আমরাও কিন্তু চমকাচ্ছি এই ভেবে যে এইভাবেও ভাবে ওরা। এই ভাবনার সঙ্গে যে আমাদের যোগ হচ্ছে, এটা এ সময় এসে খুব ভালো লাগছে।

‘মিষ্টি কিছু’তে অভিনয় করে কেমন অভিজ্ঞতা হলো? এটাতে আমরা দেখেছি, মিষ্টির দোকানে জিন থাকে। এ রকম উপকথা আপনারাও শুনেছেন শৈশবে...

আমি এগুলো নিয়ে খুব একটা তর্ক করি না। কিছুদিন আগে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমি ভূতে বিশ্বাস করি কি না? সরাসরি বলেছি, করি। তার কাছে মনে হবে যে আমার মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা কম। কিন্তু আমার ছেলেবেলাটা গ্রামে কেটেছে। নানান ঘটনার মধ্যে কেটেছে। কোনো কোনো ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও পাইনি। বিষয়গুলো ভুতুড়ে ছিল, অলৌকিক ছিল। ব্যাখ্যা মানুষ সবকিছুই করতে পারে। ভূতের গল্পটাও ও রকম। আমরা ওই অলৌকিক বিষয়গুলো উপভোগ করেছি। ভালো লেগেছে এবং এত দিন পর একটা আধুনিক ছেলে, যার বয়স খুব বেশি নয়, যে বিশ্বসাহিত্য ও বিশ্ব চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানে, তার মধ্যে অধুনামনস্কতা তো আছেই, সেই–ই ভূতের গল্প নিয়ে ভাবছে! ইটস আ নিউ থিং। অবশ্যই এটা বুঝতে হবে, এটা খুবই আধুনিক একটা ভাবনা। একটা পুরোনো বিষয় নতুনভাবে উপস্থাপন করছে এবং নতুনভাবে উপস্থাপনের কারণে মানুষের যে অশরীরি অনুভব, সেটা বিন্দুমাত্র কমছে না। কিন্ত মানুষ শিহরিত হচ্ছে, চমকাচ্ছে। একটা চমৎকার বিষয়কে ফিরিয়ে আনা। চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে সেসব অনভূতি মানুষকে দেওয়া খুব কঠিন কাজ, বিশেষ করে ভূতের। আমার কাছে মনে হয়েছে, বহুদিন পর এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে।

default-image

প্রচারের পর কতটা সাড়া পেয়েছেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আপনার অভিনয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

আমি এখন একটু কাজের মধ্যে আছি। কৌতূহল থাকায় একটু দেখে নিয়েছি। আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশ করার মতো বহু ঘটনাও ঘটে, আবার আশা জাগানিয়াও বহু ঘটনা ঘটে। তেমন একটা উল্লযোগ্য বিষয় হলে আলাপ হয়, নানা কথা হয়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। তাতে নতুনের প্রতি আকর্ষণ থাকে। কেন নতুন? কেন বিশেষ? এসব আরকি। আর যদি একটা ভালো কিছু হওয়ার পর কোনো উল্লেখ করা না হয় কোথাও তেমনভাবে, তাহলে সেটা ক্ষতি হয়। একটা পরিবর্তন আনার মতো বিষয় যদি জনে জনে জানতে পারে, তার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আসে। আমরা সেই চেষ্টা খুব একটা দেখি না। সামাজিক যোগাযোগাযোগমাধ্যমে দেখি মানুষ সরব হয়, ভালো কিছু হলে। যেটা আমি এটার বেলায় দেখেছি।

আপনি আর হুমায়ূন আহমেদ কি একসঙ্গে কাজ করেছিলেন?

‘বহুব্রীহি’ নাটকে অভিনয় করেছিলাম।

এরপর?

আর না। ‘বহুব্রীহি’ নাটকে আমার সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটেছিল, এরপর আর করা হয়নি।

হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় কাজ করেছেন। এখন তাঁর ছেলে নুহাশ হুমায়ূনের সঙ্গেও কাজ করছেন। দুই সময়ের দুই নির্মাতার সঙ্গে কাজ করে অভিজ্ঞতা কেমন?

আমার কাছে হুমায়ূন আহমেদকে লেখক মনে হয়, অসাধারণ লেখক। আর নুহাশকে হয়তো আমরা সবাই বলব কালকের ছেলে, সে অসাধারণ লেখক এবং অসাধারণ নির্মাতা।

আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন