default-image
বাংলাদেশের প্রখ্যাত গীতিকবি, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক গাজী মাজহারুল আনোয়ার পদার্পণ করলেন ৭৯-এ। জন্মদিন উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশান ক্লাবে ছিল তাঁর লেখা ৫০টি গানের পেছনের গল্প নিয়ে ‘অল্প কথার গল্প গান’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। এবারের ভালোবাসা দিবসেও বেরিয়েছে তাঁর লেখা গান। জন্মদিন, এখনকার গান ও চলচ্চিত্র অঙ্গন নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

প্রতিবছর জন্মদিন আসে, আবার চলে যায়—জন্মদিনে আপনার কেমন লাগে?

আমি সব সময় মনে করি, মানুষের ভালোবাসার মধ্যে থাকলেই হলো। আমার যদি সৃজনশীল কর্মের প্রেরণা থাকে, প্রতিদিনই আমার কাছে জন্মদিন মনে হয়—এটা আমি বিশ্বাস করে আসছি এবং এখনো করি। আমার জীবনে শারীরিক সুস্থতার অভাব হলেও লেখার সুস্থতার অভাব এখনো পরিলক্ষিত করি নাই। তা ছাড়া আমার উৎসটা যেখানে, সেই উৎস থেকে পারিবারিকভাবে চারিদিক থেকে এমনভাবেই জড়িয়ে আছি, সেখানে সংস্কৃতির সব লোক আছে, আমার স্ত্রী, মেয়ে, মেয়ের জামাই, ছেলে, পুত্রবধূ, এবং নাতি-নাতনি—সবাই মিলে আমাকে সাংস্কৃতিকভাবে দারুণভাবে পরিবেষ্টিত করে রেখেছে। ইচ্ছে করলেও আমি তাদের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। সবার কাছে একটাই প্রত্যাশা, যত দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তত দিন কলমটা হাতে ধরে রাখার শক্তিটা যেন আমার থাকে। আমি লিখতে চাই, আনন্দ পেতে চাই, মানুষকে সুখবর দিতে চাই। একই সঙ্গে যেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য এত কষ্ট করলাম, সেই মুক্তিযুদ্ধের সফলতা যেন অনুভব করতে পারি। আমার প্রাপ্তি নয়, সৃষ্টির জন্য যেন কলমটা হাতে থাকে।

default-image
বিজ্ঞাপন

দেশের সব গীতিকবি, সুরকার, সংগীত পরিচালক, সংগীতশিল্পী, সংবাদকর্মী থেকে শুরু করে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন আপনি সফল ও সার্থক গীতিকবি, পরিচালক ও প্রযোজক। আপনি নিজেকে কতটা সফল ও সার্থক মনে করেন?

সার্থক মনে করি যখন দেখি সবার ভালোবাসায় আমি সিক্ত হয়েছি। ব্যক্তিজীবনে আমার কিছু অপারগতা এবং ব্যর্থতাও আছে—আমি যা করতে চাই, তা পারছি কি না, এ নিয়ে নিত্যই দ্বন্দ্বে থাকি। তবে সৃষ্টিকর্তার রহমত এবং সবার ভালোবাসা ও দোয়ায় এখন পর্যন্ত অকৃতকার্য হওয়ার মতো কোনো ঘটনা আমার জীবনে ঘটেনি অন্তত সৃজনশীল কর্মে। অতএব আমার বয়সের ভারে ক্লান্ত না হয়ে যেন সবার ভালোবাসায় আর সংগ্রামী হয়ে এগিয়ে যেতে পারি। মৃত্যুর সময় আমার হাতে যেন কলম থাকে—এটাই আমার চাওয়া।

আপনাদের সময়ে আপনারা যা লিখে গেছেন, তৈরি করে গেছেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সংগীতাঙ্গনে এই প্রজন্মে যাঁরা আছেন তাঁরাও আপনাদের সেই সব সৃষ্টি নতুন সংগীতায়োজনে গাইছেন। কিন্তু এখনকার গানগুলো কেন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না?

অনেকে পেট ভরার জন্য খায়। খাওয়ার পরে তৃপ্তিটা কতক্ষণ রাখতে পারে সেটাও কিন্তু দেখার বিষয়। এটা যিনি খাচ্ছেন তাঁর ওপরও নির্ভর করছে। আমরা সবাই সৃজনশীল কর্মেই আছি। কোন সৃজনশীল কর্মটা বাস্তবসম্মত হয়ে আমাকে আকর্ষণ করছে, সেটাই দেখার বিষয়। ছোট্ট উদাহরণ দিই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, গানবাজনা বাড়িতে আসতে হবে। তাঁর মতো মানুষের কি খেয়েদেয়ে কোনো কাজ ছিল না? তিনি কেন বললেন? এই কারণে বললেন, যে গানটা বাড়িতে গাওয়া যায়, বাড়িতে বাজানো যায়, সেটার একটা পারিপার্শ্বিকতা থাকে। অর্থাৎ গানটা সর্বজনীন হবে। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের গান এখন অনেকটাই মোবাইলভিত্তিক হয়ে গেছে। আমার বন্ধুর কাছে মোবাইলে বললাম, আমার বন্ধু আবার আরেকজনকে বলল—এটার সীমাবদ্ধতা কঠিন হয়ে আরও গভীর সীমাবদ্ধতায় আটকে গেছে। সর্বজনীন হচ্ছে না। যা সর্বজনীন নয়, তা কখনো চিরস্থায়ী হতে পারে না। আমি কাউকে ছোট করছি না, আমাদের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে ইমোশনের ব্যবধান থাকতে পারে। চিত্রশিল্পীদের কথা বলেন, লেখকদের কথা বলেন—একটা কথা মনে রাখতে হবে, এই দেশটা কী দেশ। কীভাবে আমরা এই দেশটা পেলাম। এই দেশের মানুষ কারা? আমাদের সীমার বাইরে গিয়ে, আকাশের ওপরে গিয়ে সাংঘাতিক কিছু কল্পনা করলে তো লাভ হবে না। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে অর্থে সীমাবদ্ধ থেকেও আমরা সারা বিশ্বের মধ্যে নিজেদের প্রচারিত ও প্রসারিত করতে পেরেছি। সেখানে যে আবেগটুকু, তাঁর সঙ্গে প্রাপ্তির কোনো সম্পর্ক নেই, তৃপ্তিটাই বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু ইদানীং আমার যেটা মনে হচ্ছে, তৃপ্তির চেয়ে প্রাপ্তির পেছনে আমরা বেশি দৌড়াচ্ছি। যার কারণে সেই প্রাপ্তিটা উপযুক্ত পরিমাণে আমাদের কাছে না এলে আমরা নিজেদের কিছুটা ব্যর্থ মনে করি। আমি সেটা মনে করি না। সৃজনশীল ব্যক্তিদের দরকার হলো সৃজন করা। সৃজন যখন মানুষের কাছে আদৃত হবে, মানুষের কাছে যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, মনে হবে আমার জীবনে না চাইতেও আমি অনেক কিছু পেয়ে গেলাম। রবীন্দ্রনাথ এই কথা নিজেও বলে গেছেন, ‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসিখেলায়/ আমি যে গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়...’—এই ‘মনে রাখার’ শব্দটি তিনি রেখে গেছেন।

default-image

আপনারা যাঁরাও ইদানীং গান তৈরি করছেন সেই গানগুলো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এর কারণ কী?

এখানে একটা কথা বলতে চাই, প্রচারযন্ত্রের একটা সমস্যা আছে। ভালো কাজের পৃষ্ঠপোষকতা যেভাবে হওয়া দরকার, তা মোটেও হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে আমাকে একবার সংবর্ধনা দিয়েছিল। সেখানে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হোয়াট ইজ ইউর আইডেনটিটি? আমি বলেছিলাম, ‘যদি আমাকে জানতে সাধ হয়, বাংলার মুখ তুমি দেখে নিও, যদি আমাকে বুঝতে মন চায়, এ মাটির শ্যামলিমায় এসো প্রিয়, এখানে বৃষ্টি ঝরে রিমঝিম শ্রাবণের সেতারে, কুমারী নদীর বুক কেঁপে ওঠে প্রণয়ের জোয়ারে, যদি কখনো দেখতে সাধ হয়, আমার মনের চঞ্চলতা, তবে বরষার কোন নদী দেখে নিও’—অর্থাৎ আমি বাংলার সঙ্গে মিশে আছি। এখন ভালো কাজ প্রচারের ক্ষেত্রে উদাসীনতা আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম ও প্রচারযন্ত্র পক্ষপাতের মধ্যেও পড়ে থাকে। একটা অনুষ্ঠানে আমাকে গানের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয়। সেখানে একজন গানের তালে তালে নাচছেন। অনেক পরে ক্লান্ত হয়ে যখন সামনে এলেন, তখন জিজ্ঞেস করলাম, আপনি যে নাচলেন, কী গানটার সঙ্গে নাচলেন? দুটো লাইন বলেন তো। তিনি বললেন, ওসব লাইন টাইন নিয়ে আমি ব্যস্ত ছিলাম না। তাল বেজেছে আমি নেচেছি। তো আমার প্রশ্ন, ওই অনুষ্ঠান থেকে অতিথি ও দর্শকেরা কী নিয়ে যাবেন! গ্রহণযোগ্যতারও একটা পরিমাপ থাকতে হবে, প্রচারেরও পরিমাপ থাকতে হবে। আমার অনেক বয়স হয়েছে, শুধু একটা কথা বলতে চাই, গ্রহণ করা এবং ত্যাগ করার জিনিসপত্রগুলো কিন্তু সাংবাদিকদের হাতে আছে, সার্বিকভাবে মানুষের অন্তরের সত্যটাকে প্রকাশ করার মতো সুখ, আনন্দ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তাহলে দেখবেন সৃজনশীল কর্ম অনেক সুন্দর হয়েছে।

default-image
বিজ্ঞাপন

সিনেমা পরিচালনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন কেন?

গুটিয়ে নেওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। সবকিছুর মধ্যে ক্রমাগতভাবে আমাদের কিছুটা দৈন্য এসে গেছে। যেকোনো সৃজনশীল কর্মই করি না কেন, আমার বুঝতে হবে, কাদের জন্য লিখছি, কাদের জন্য চলচ্চিত্র বানাচ্ছি এবং কী করতে চাই এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। অনেকেই বলেন, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিক্ষা হয়। একটা বাড়িতে দাওয়াতে গিয়ে যদি যতটুকু দরকার তার চেয়ে বেশি খেলে, সেই খাদ্যটা বমি করেই ফেলে দিতে হবে। আমি কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারব এবং কতটুকু বর্জন করে আমি সুখে থাকতে পারব, এই পরিমিতি জ্ঞান থাকতে হবে, যেটাকে বলে সেন্স অব রেস্ট্রিকশন। এটাকে যেকোনো নির্মাতা সৃজনশীল ক্ষেত্রেই হোক বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক, এটা যদি মনে রাখে, জিনিসটা কতটুকু মনে রাখার ক্ষমতা আমার দর্শকের, জনগণের মনে কতটুকু উচ্চতার মাপে আছে—তাহলে ব্যর্থতার কোনো কারণ থাকতে পারে বলে মনে হয় না। একটা কথা আছে, ওল্ড অর্ডার চেঞ্জেস ইয়েল্ডিং প্লেস টু নিউ, নতুনভাবে একটা স্বভাব নিয়ে হয়তো এগুলো আসতে পারে। আসলেও এমনভাবে আসতে হবে, সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতার ঊর্ধ্বে না ওঠে। গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে থাকতে হবে। আর সংস্কৃতিকে সুন্দরভাবে বাড়িতে আনতে হবে। যাঁরা ঔপন্যাসিক ছিলেন, এই শরৎচন্দ্রের কথাই যদি বলি, তাঁদের উপন্যাস আমরা রাতের অন্ধকারে, মোমবাতি জ্বালিয়ে, মা-বাবা ফাঁকি দিয়ে গোপনে পড়তাম। তার অর্থ বিষয়বস্তু এমন আকৃষ্টসম্পন্ন ছিল, যা সারাক্ষণ না পড়লে ঘুমও আসত না। তো আমি মনে করি, সে ধরনের ওষুধ যদি আমরা সৃজনশীল কর্মের মধ্যে দিয়ে দিতে পারি, আমাদের সব রোগী ভালো হবে। ভালো হলেই আমাদের সৃজনশীল কর্ম সফল হবে। কি চলচ্চিত্রে, কি গানে, কি নাটকে—সবখানে হবে। আমরা যদি মনে করি, আত্মম্ভরিতার জন্য আমরা কিছু করে ফেললাম, সেখানে ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু আসতে পারে না।

default-image

জন্মদিন উপলক্ষে অল্প কথার নতুন বই প্রকাশ করছেন। ‘অল্প কথার গল্প গান’ বইটি কোন ভাবনা থেকে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন?

জীবনের লম্বা সময় ধরে গান লিখছি। গান লেখার পেছনের ইতিহাস জানাতে চেয়েছি। বইটি আমার সন্তানদের উদ্যোগ। তারা উদ্যোগী হয়েই বাবার সৃষ্টিকর্মকে যতটা সংরক্ষণ করা যায়, সে চেষ্টা করছে। আমার লেখা অনেক গান অন্যের নামে দেখেছে তারা। বই প্রকাশ বলা যায় আমার গান সংরক্ষণের একটা প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে জনপ্রিয় সব গানের পেছনের গল্পও পাঠকদের জানানোর একটা উদ্যোগ।

আপনি হাজার হাজার গান লিখেছেন। বাংলাদেশে আপনার পরে যাঁরা গীত রচনায় এসেছেন তাঁদের অনেকেরই অনুপ্রেরণা আপনি। আপনার কাছে শুনতে চাই, আপনার প্রিয় গীতিকবি কে?

এটা আমার জন্য বলাটা মুশকিল। তারপরও বলতে পারি, মোহাম্মাদ রফিকউজ্জামান আমার দৃষ্টিতে খুব ভালো লেখেন। ক্রমাগতভাবে আরও অনেকে লিখছেন। কবির বকুলও লিখছে। তবে আমি বলতে চাই, যে লেখাটা আপনি বা আপনারা লিখলেন বা যে বুলেটটা ছুড়লেন, সেই বুলেটটা যদি টার্গেটকে স্পর্শ না করে তাহলে সেই ধরনের হাজারটা বুলেট ছুড়েও লাভ নেই। সেই বুলেটে কোনো শত্রু কখনোই মরবে না।

কখনো শুনি ২০ হাজার, কখনো ২৫ আবার কখনো ৩০ হাজার গান আপনার। আসলে আপনার লেখা গীতিকবিতার সংখ্যা কত?

হাজার ত্রিশের মতো হবে। অসংখ্য গান নানাভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। সব সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন