default-image
হঠাৎ করেই আলোচনায় সোহেল মণ্ডল। ‘তাকদির’ ওয়েব সিরিজ প্রচারের পর থেকেই তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে ‘ভাইসা’ নামে। ২০০৬ সাল থেকে অভিনয় করেন তিনি। প্রথম সিনেমা আন্ডার কনস্ট্রাকশন–এ সুযোগ পেতেও সাত বছর লেগে যায় তাঁর। এরপর একে একে করেছেন ‘মুসাফির’, ‘আয়নাবাজি’, ‘রংঢং’, ‘মায়ার জঞ্জাল’, ‘হাওয়া’। কথা হলো তাঁর অভিনেতা হয়ে ওঠা ও বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে।

অভিনয়ের ‘ভূত’ কোত্থেকে চাপল?

সে এক লম্বা গল্প। একসময় আমরা ঢাকায় থাকতাম। পরে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে গ্রামে চলে যাই। আমি এমনিতেই অন্তর্মুখী মানুষ। তারপর সবাই নানা কিছু বলে খেপাত। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকায় চলে আসি। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলাম না। হতাশ হয়ে পড়লাম। তখন আমি জীবনে কিছুই করতে চাইতাম না, কিছুই হতে চাইতাম না। ভর্তি হলাম সরকারি বাঙলা কলেজে। একাডেমিক পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ না থাকলেও আমি প্রচুর বই পড়তাম। পত্রিকা পড়তাম। প্রথম আলোর বিনোদন আর আনন্দ পাতায় দেখতাম নাটকের বিজ্ঞাপন। কোনো কাজ ছিল না। তাই নাটক দেখতে যেতাম। নাটক দেখতে গিয়েই একদিন দেখলাম, নাগরিক নাট্যাঙ্গন অভিনয় শেখাবে। কিছু না বুঝেই ভর্তি হয়ে গেলাম। এরপর ২০০৯ সালে যুক্ত হলাম প্রাচ্যনাটের সঙ্গে। ২০১০ সালে ইমোজিন বাটলার কোল নামে একজন ব্রিটিশ নির্দেশক এসেছিল। তিনি আমাদের সঙ্গে ‘পিনিক’ নামে একটা প্রজেক্ট করেন। এরপর আমার স্বপ্ন বড় হতে থাকে। মনে হলো, আমি নিজে দু–তিন ঘণ্টার নাটক করতে চাই। পাভেল ভাইকে (আজাদ আবুল কালাম) সামনে থেকে নির্দেশনা দিতে দেখাও একটা বড় স্কুলিং। আমার অভিনয়ের হাতেখড়ি মূলত তাঁর নির্দেশনা দেখে। একেকটা চরিত্র যেভাবে তিনি তৈরি করেন, তা অসাধারণ। এখন আমি মঞ্চ ছাড়া বাঁচি না। একটা কথা এখানে বলতে চাই, আপনি চাইলে লিখতে পারেন। ছোটবেলা থেকেই আমার ‘আনন্দ পাতা’ পড়তে খুব ভালো লাগত। আমি সংগ্রহে রাখতাম আর ভাবতাম, একদিন প্রথম আলোও আমার ছবি ছাপবে। ইন্টারভিউ ছাপা হবে। আজ আমি এখানে বসে ইন্টারভিউ দিচ্ছি। মনে হচ্ছে, স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাসায় পুরো ব্যাপারটা কীভাবে নিল?

আমার বাসা থেকে কোনো কিছুর জন্য কোনো চাপ ছিল না। আমি ভালো আছি, এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল।

ছোটবেলা থেকেই আমার ‘আনন্দ পাতা’ পড়তে খুব ভালো লাগত। আমি সংগ্রহে রাখতাম আর ভাবতাম, একদিন প্রথম আলোও আমার ছবি ছাপবে। ইন্টারভিউ ছাপা হবে। আজ আমি এখানে বসে ইন্টারভিউ দিচ্ছি। মনে হচ্ছে, স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে
default-image

এই সময়টা আপনার খরচ চলত কীভাবে?

আমি সম্পাদনার কাজ করতাম। একেবারে শুরু থেকেই। যদিও আমি কোথাও শিখিনি। অসংখ্য বিজ্ঞাপন, নাটক, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের এডিটিং করেছি। ‘ইতি তোমারই ঢাকা’ ছবির নুহাশ হুমায়ূনের অংশটা আমার এডিট করা। অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘ঢাকা মেট্রো’ আমার সম্পাদনা করা।

আপনার পরিবারের কেউ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল?

না। সেভাবে কেউ ছিল না। তবে মনে আছে আমার মামা একসময় যাত্রা করত। একবার শীতের রাতে মঞ্চে মামাকে বেদম পেটাচ্ছিল। দর্শকসারিতে বসে আমি কাঁদছিলাম। আমি ছোট ছিলাম। তখন নাটক বিষয়টা অতটা বুঝি না। এইটুকু স্মৃতি আছে আমার। এখন মনে হচ্ছে, কোনো না কোনো প্রভাব হয়তো ছিল। তাই নানা অলিগলি ঘুরে অভিনয়ের কাছেই ফিরেছি। বগুড়ায় থাকতে প্রচুর বাংলা সিনেমা দেখতাম। ‘আম্মাজান’ আমি হলে গিয়ে পাঁচবার দেখেছি। এখন বিশ্বের সব দেশের সিনেমা দেখি। কী ইতালির, আর্জেন্টিনার, তুর্কির! সম্পাদনার জন্য দেখতে হয়।

default-image

‘তাকদির’–এর পর কী হলো?

আমার ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম ভরে গেল নানা বার্তায়। একজন আমাকে মেসেজে একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, আমার অভিনয় দেখে একটা ছোট্ট বাচ্চা কাঁদছে। ওদের অনুভব তো একেবারেই জেনুইন। আমার মনে হয়েছে, আমি ঠিকঠাক দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি। সুবর্ণা মুস্তাফা ম্যাম আমার অভিনয়ের প্রশংসা করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এখানে আমি থ্যাঙ্কিউ মন্তব্য করলে তিনি লিখেছেন, শোনো, এই একই ধরনের চরিত্র তোমার কাছে আরও অনেক আসবে। তোমাকে সেই লোভ সংবরণ করতে হবে। বৈচিত্র্যময় চরিত্রে প্রমাণ করতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, ইউটিউবে আমার একটা চ্যানেল আছে। সেখানে আমার টুকটাক কাজ তুলে রাখা। ‘তাকদির’ প্রকাশিত হওয়ার পরে সবাই খুঁজে খুঁজে আমার সেসব নাটক, শর্টফিল্ম দেখছে। সবচেয়ে বড় কথা, এখন আমি কাজ করছি।

বিজ্ঞাপন

‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ আর ‘মায়ার জঞ্জাল’–এ কাজ পেলেন কীভাবে?

আমি এমনিতেই প্রচণ্ড ইন্ট্রোভার্ট ছিলাম। মঞ্চে কাজ করতে গিয়ে আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলা শিখলাম। ওখানে আমার একটা সার্কেল তৈরি হলো। তাদেরই একজন আমাকে জানিয়েছে যে ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’–এর জন্য অডিশন চলছে। গেলাম আর নির্বাচিত হলাম। আমি অন্তর্মুখী। তার ওপর আবার নিজের গায়ের রং, চেহারা নিয়ে আমার ভেতরে ভীষণ হীনম্মন্যতা ছিল। তাই আমি নিজে কোনো পরিচালক কিংবা প্রযোজকের কাছে গিয়ে কিছু বলতাম না। কেমন সংকোচ লাগত। তবে আমি নিজের কাজ নিয়ে অত্যন্ত যত্নশীল। আমার দ্রুত কিছু করে ফেলার বা কিছু হয়ে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। আমি আস্তে ধীরে সুন্দর করে নিজের কাজটা করে যেতে চাই। একটা একটা করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাই।

default-image

আর ‘মায়ার জঞ্জাল’?

এটার একটা ইন্টারেস্টিং গল্প আছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি কি ফেব্রুয়ারিতে কবিদা (পরিচালক ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী) ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি এই প্রথম আলোতে এসেছিলেন। তিনি এখান থেকে বের হওয়ার পরে আমি কাওরান বাজারেই তাঁর সঙ্গে দেখা করি। নির্মাতা মেসবাউর রহমান সুমন আমার কথা তাঁকে বলেছিলেন। আমাকে দেখে তাঁর মনে হয়েছে যে তিনি যে চরিত্রের অভিনেতার খোঁজে এ দেশে এসেছেন, আমি সেই চরিত্রের জন্য ঠিকঠাক। আমি খুব অল্প সময়ে দুর্দান্ত সব পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি। রুবাইয়াত হোসেন, কবিদা, মেসবাউর রহমান সুমন, রেজওয়ান শাহরিয়ার, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ প্রমুখ।

আপনার প্রিয় অভিনয়শিল্পী কারা?

হুমায়ুন ফরীদি, আসাদুজ্জামান নূর, খালেদ খান, গোলাম মুস্তাফা, আলী যাকের, তারিক আনাম খান। এখনকার সময়ে নিশো ভাই (আফরান নিশো), সিয়াম, চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম প্রমুখ। একদম নতুনদের ভেতর খাইরুল বাশার। রুনা খানকেও আমার দুর্দান্ত লাগে। তিনি খুবই ভালো অভিনেত্রী। সুবর্ণা (সুবর্ণা মুস্তাফা) আপাকে কার না ভালো লাগে। ভালো লাগে আফসানা মিমি, অপি করিমকেও। দেশের বাইরে ইরফান খান, নিরাজ কবি, শেফালি শাহ, ম্যাথিউ রাইস, নাটালি পোর্টম্যান, রিচা চাড্ডা, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ঋত্বিক চক্রবর্তী। ঋত্বিকের সঙ্গে ‘মায়ার জঞ্জাল’–এ কাজ করে এলাম। এ রকম অনেকে আছেন।

আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন