default-image

কাশ্মীরের পাহাড়ের উপত্যকায় সুফি গানের সঙ্গে বাজত শততন্ত্রী বীণা। সেই যন্ত্রকে মার্গীয় যন্ত্রে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন পণ্ডিত উমাদত্ত শর্মা। ছেলে শিবকুমারের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটি বাজাও। এই যন্ত্রের বদৌলতে একদিন তোমার নাম-খ্যাতি হবে।’ সংশয়ে যন্ত্রটি হাতে নিয়েছিলেন পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা। পরে তাঁর স্পর্শে শততন্ত্রী বীণা হয়ে যায় ‘সন্তুর’। ভবিষ্যদ্রষ্টা উমাদত্তের কথাই সত্য হলো। শিবকুমারের খ্যাতি এখন জগৎজোড়া। ঢাকায় উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে এসে গত বছর ১ ডিসেম্বর প্রথম আলোকে এ সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হারুন আল রশীদ
বীণা উপমহাদেশের আদি সংগীতযন্ত্র। বৈদিক যুগেও বীণা বাজত। সন্তুর তো তারই গোত্রভুক্ত?
সবচেয়ে প্রাচীন যন্ত্রটির নাম রুদ্রবীণা। এর সঙ্গে বৈদিক আচারের সম্পর্ক ছিল। আরও একটি প্রাচীন বীণা ছিল, যার নাম পিনাকী বীণা। এই পিনাকী বীণাকে বলা হতো শততন্ত্রী বীণা। কারণ, এর মধ্যে ১০০টি তার ছিল। এই শততন্ত্রী বীণাই পরে সন্তুরে পরিণত হয়। কাশ্মীরে এটি সুফি গানের সঙ্গে বাজত।
পিনাকী বীণার ধারণা কোত্থেকে এসেছে?

পিনাকী বীণা শব্দের সঙ্গে তির-ধনুকের সম্পর্ক আছে। ধনুক থেকে তির ছুড়লে যেমন টঙ্কার ধ্বনি হয়। সন্তুরের শব্দও অনেকটা সে রকম। যে কারণে ধারণা করা হয়, ধনুকের টঙ্কার ধ্বনি থেকে পিনাকী বীণার উৎপত্তি।

তা বৈদিক যুগের অখ্যাত একটি যন্ত্রকে মার্গীয় যন্ত্রে রূপ দেওয়ার সাহস পেলেন কীভাবে?

সাহস আমি দেখাইনি। সাহস দেখিয়েছিলেন আমার বাবা উমাদত্ত শর্মা। তিনিই প্রথম যন্ত্রটি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। পরে আমি আরও গবেষণা করে ধনুকের টঙ্কার ধ্বনিকে বশ করে সুরে এনেছি, যা আজকের সুরেলা যন্ত্র সন্তুর।

সংগীতে হাতেখড়ি বাবার কাছেই?

পাঁচ বছর বয়স থেকে বাবার কাছে গান শিখতে শুরু করি। পরে তালজ্ঞান নিতে তবলা, বেহালা, হারমোনিয়াম বাজিয়েছি। তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে হঠাৎ করে বাবা আমার হাতে সন্তুর তুলে দিয়ে বললেন, এটি বাজাও। তারপর বাজাতে শুরু করলাম।

সন্তুরকে প্রথম কবে কাশ্মীর উপত্যকার বাইরে নিয়ে গেলেন?

১৯৫৫ সালে মুম্বাইতে হরিদাশ সংগীত সম্মেলনে। কিন্তু শ্রোতা-দর্শকদের প্রতিক্রিয়া অনুকূলে ছিল না। সবাই বললেন চমৎকার ধ্বনি। কিন্তু এই যন্ত্রে শাস্ত্রীয় সংগীত হবে না। কারণ, আলাপ-এর সুযোগ নেই। এরপর কলকাতায় অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে বাজালাম। সেখানেও সবার কথা শুনে হতাশ হলাম। গুণীরা বললেন, তুমি মেধাবী। কিন্তু বাজাচ্ছ ভুল যন্ত্র। এটা ছেড়ে দিয়ে অন্য যন্ত্র হাতে নাও। নাম হবে।

হতাশ হয়ে পড়েছিলেন নিশ্চয়?

হ্যাঁ। বুঝলাম গুণীরা যা বলছেন, তা সত্য। কিন্তু বাবার আদেশ, সন্তুর বাজাতেই হবে। তাই বিষয়টাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিলাম। বসে গেলাম গবেষণায়। ব্রিজ আর তার নিয়ে অনেক গবেষণা করলাম। শুনতে ভালো লাগে না, এমন টঙ্কার ধ্বনি এড়াতে স্পাইকের বদলে যন্ত্রটিকে পায়ের ওপর বসালাম। জাপানের ‘কোতো’ যন্ত্র থেকে ধারণা নিয়ে কাজ করার পর মীড় আর গমকের কাজ হতে শুরু করল। এভাবে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করার পর সন্তুরের নিজস্ব একটা স্টাইল দাঁড়ায়। তারপর আসরে বসলাম। এবার গুণীরা বললেন, হচ্ছে। তুমি এগিয়ে যাও।

অনেকেই বলেন, এ যুগের শিল্পীদের মধ্যে ধ্যান আর তপস্যার অভাব আছে।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে ক্রিকেটের অদ্ভুত মিল আছে। আদিতে টেস্ট ক্রিকেট জনপ্রিয় ছিল। সেখানে আভিজাত্য ও ধ্যান-জ্ঞান বলে কিছু একটা ছিল। ব্যাটসম্যান বোলাররা ছিলেন শিল্পীর তুল্য। শিল্পী যেমন তুলি দিয়ে ছবি আঁকেন, তেমনি ব্যাটসম্যান ব্যাট হাতে তাঁর ইনিংসকে শিল্পের তুল্য করে তুলতেন। কিন্তু এখন বনেদি দর্শক ছাড়া অন্যরা টেস্ট ক্রিকেট দেখেন না। সাধারণ দর্শক সীমিত ৫০ ওভার বা টি-টোয়েন্টিই বেশি পছন্দ করেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের অবস্থাও তা-ই হয়ে গেছে। শিল্পী মনের আনন্দে এক ঘণ্টার আলাপ শেষে ২০ মিনিটের গৎ বাজাবেন, সেই সুযোগ কম। কারণ, এ যুগের শ্রোতাদের বেশির ভাগ বড় কম্পোজিশন বা গুরুগম্ভীর রাগ পছন্দ করেন না। তাঁরা পনেরো-বিশ মিনিটের ফিউশন, ধুন বা দ্রুত আনন্দদায়ক ছোট ছোট রাগ পছন্দ করেন। বেশির ভাগ শিল্পীও শ্রোতাদের সেই আবেগে সাড়া দিয়ে ফরমায়েশি বাজনা বাজিয়ে যাচ্ছেন। তবে অনেক শিল্পী আছেন, যাঁরা ৫০ ওভার বা টি-টোয়েন্টির পাশাপাশি টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজেও বাজিয়ে থাকেন। এঁদের আমার ভালোই লাগে।

আপনার ছেলে রাহুল শর্মা কোন মেজাজের শিল্পী? টেস্ট ক্রিকেট, নাকি সীমিত ওভারের?

রাহুল দুটোই বাজাচ্ছে। সে কিন্তু মঞ্চে ওঠার জন্য তাড়াহুড়ো করেনি। ১৯৯৭ সালে সে যখন প্রথম আমার সঙ্গে মঞ্চে ওঠে, তখন তার বয়স ২৫। এখন তার অ্যালবামের সংখ্যা ৬০-এর ওপরে। বিস্ময়কর বটে। বেশির ভাগই ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি আদলের। তবে রাহুল মৌলিক বাজনাও দারুণ বাজায়। কারণ, আমি তাকে সেইভাবে গড়ে তুলেছি। 

বিজ্ঞাপন
আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন