বঙ্গবন্ধু চরিত্রে কোরিওগ্রাফিতে পূজা সেনগুপ্ত
বঙ্গবন্ধু চরিত্রে কোরিওগ্রাফিতে পূজা সেনগুপ্তছবি: সংগৃহীত
গত মাসের শেষ দিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্ত। তাঁর পরিবেশনাটি প্রশংসিত হয়। তরুণ প্রজন্মের এই নৃত্যশিল্পী করোনাকালেও ভার্চ্যুয়াল নৃত্যচর্চা করছেন। নাচ নিয়ে তাঁর ভাবনাসহ আরও নানা প্রসঙ্গে কথা বললেন তিনি।

বছরের প্রথম দিন মহামারির কারণে পুরো দেশ লকডাউন। এ অবস্থায় নতুন বছরকে বরণ করবেন কীভাবে?

লকডাউন মনটাকে খুব খারাপ করে দিচ্ছে। তারপরও বিভিন্ন রকম কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছি। ভালো থাকার চেষ্টা করছি। বাংলা নতুন বছরে বৃহত্তর স্বার্থে বাসাতেই থাকছি। নিজেরও স্বার্থে। কিছু অনলাইন অনুষ্ঠানে অংশ নেব। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা জমবে ভার্চ্যুয়ালি। মাকে ছাড়াই এবার আমার প্রথম বৈশাখ। আমার জীবনজুড়েই আসলে আমার মা। তাঁকে ছাড়া যেহেতু প্রথম বৈশাখ, চেষ্টা করব মায়ের জন্যই খুশি থাকতে। আমি খুশি থাকলে নিশ্চয় আমার মা খুশি থাকবেন।

default-image

কদিন আগে ‘অদম্য’ নামে একটি নৃত্যনাট্যে বঙ্গবন্ধু চরিত্রে অভিনয় করলেন। কেমন সাড়া ফেলেন?

আমি সত্যিকার অর্থে ভাবিনি, এতটা সাড়া পাওয়া যাবে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এটি আর্টিস্টিক কাজ। বঙ্গবন্ধু একজন মহান পুরুষ, আমি সেই চরিত্রটা করছি। আমার ধারণা ছিল, যাঁরা শিল্প বোঝেন, তাঁরা হয়তো এ কাজটা বুঝতে পারবেন। কিন্তু হয়েছে একদম বিপরীত, একেবারে সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে শিল্পবোদ্ধা, জ্যেষ্ঠ নৃত্যশিল্পীরা, মঞ্চে যাঁরা কাজ করেন, সবাই ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এতটা অবশ্য আশা করিনি।

বিজ্ঞাপন

এই করোনায় তুরঙ্গমি রেপার্টরি ড্যান্স থিয়েটার ও তুরঙ্গমি স্কুল অব ড্যান্সের কার্যক্রম কেমন চলছে?

আপাতত আমরা অনলাইনে ক্লাস করছি। প্রতিদিনই ওয়ার্কআউট ক্লাস হয়, যেন আমরা সুস্থ থাকতে পারি। পাশাপাশি বই পড়ার ক্লাসও হয়। গত বছরের লকডাউনে সবাই বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়েছি। সবাই এই বই নিয়ে আলোচনা করেছি। প্রতিদিনই ২০-২৫ জন পাঠচক্রের এই ক্লাসে অংশ নিত। আমাদের এই দলে ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী যেমন আছে, তেমনি ৩০ বছরেরও আছে।

default-image

নাচে এমন কোনো স্বপ্ন দেখেন, যা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে?

নাচকে একটা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দেখতে চাই। সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। ইন্ডাস্ট্রি মানে শুধু নাচের শিল্পীরা নাচ নিয়েই থাকবে, তা নয়। নাচসম্পর্কিত অনেক কিছু থাকবে। নাচের ভিডিও বানানো, নাচের সম্পাদনা, মেকআপ, কস্টিউম, পেশাদার নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার তৈরি হওয়া। কোরিওগ্রাফার মানে তাঁকে লাইট ডিজাইন, সেট ডিজাইন বুঝতে হবে। শুধু নাচতে জানলে হবে না। নাচের আনুষঙ্গিক যে কাজ, তা–ও একজন কোরিওগ্রাফারকে ভালোভাবে জানতে হবে। তাহলে সে কাজটা আন্তর্জাতিক মানের হবে। ওর মধ্য দিয়ে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। আমি একা গিয়ে মঞ্চে নেচে এলাম, এটা কোনো দিন ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করতে পারবে না।

চলচ্চিত্রের মতো বড় মাধ্যম নিয়ে আপনার নিজস্ব ভাবনা কী?

চলচ্চিত্র থেকে আমার সঙ্গে কারও যোগাযোগ হয়নি। ডাক পাইনি। সে রকম কাজের জন্য যদি আমাকে ডাকে, তাহলে অবশ্যই কাজ করব। কারণ, যেকোনো কাজ সেলুলয়েডে বন্দী হওয়া মানেই অমর হয়ে যাওয়া। সেই জায়গাটায় আমাদের নৃত্যশিল্পীদের আরও অংশগ্রহণ থাকা উচিত। চলচ্চিত্রের মানুষের সঙ্গে আমাদের সেতুবন্ধটা তৈরি হচ্ছে না। তৈরির জন্য আমাদের যদি কিছু করণীয় থাকে, আমরা অবশ্যই করব।

আপনার সমসাময়িক ও অগ্রজদের মধ্যে কারা নাচ নিয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন?

এটা খুব কঠিন প্রশ্ন।

default-image

মাঝেমধ্যে তো কঠিন প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হয়

আমার খুব ভালো লাগে, খুব তরুণ যারা আছে তাদের কাজ দেখে। আমার সঙ্গে যারা কাজ করছে, ওদের মধ্যে কাজের যে স্পিরিট, তা আমাকে মুগ্ধ করে।
এটা তো আপনার দলের কথা বলছেন। এর বাইরে অন্যদের কথা শুনতে চাচ্ছি।
আমি ওভার অল তরুণদের কথা বলছি। আমার দলের বাইরেরও অনেক তরুণ নৃত্যশিল্পী আমার সঙ্গে কাজ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমি নৃত্যের যে কাজগুলো দেখেছি, তার মধ্যে উপমাকে বেশ ভালো লেগেছে। আমার মনে হয়েছে, ওর মধ্যে দারুণ চিন্তাভাবনা কাজ করে। যেভাবে কাজ করা দরকার, সেভাবে সে কাজ করেছে। বাকিদের অনেকেও ভালো কাজ করছে। কিন্তু কোথায় যেন টোটালিটির অভাব আছে। খুব ভালো নাচ করি—এটাই কিন্তু সব না। সব মিলিয়ে একটা ভাবনার জায়গা তৈরি হওয়াটা জরুরি। নাচের সঙ্গে মিউজিক, আবহ, কস্টিউম—সবকিছু মিলেই একটা ব্যাপার থাকতে হয়।

বিজ্ঞাপন

কেন এমনটা বলছেন?

অনেককে দেখি, কন্টেম্পরারির নামে কিছু বিদেশি নাচ করল, যা আসলে খাপছাড়া লাগে। সব মিলিয়ে একটা গল্প তৈরি হচ্ছে না। নাচের মাধ্যমে একটা গল্প তৈরি হওয়াটা জরুরি। দিন শেষে আমি কিন্তু দর্শকের সঙ্গে কথা বলছি। দর্শককে তো কিছু বুঝতে হবে। আমি মনে করি, শিল্প মনোরঞ্জনের জন্য না। দর্শককে খুশি করার জন্য আমরা কাজ করছি না, কিন্তু দর্শকের সঙ্গে আমাদের একটা যোগাযোগ তৈরি করতেই হবে। সেটা করতে না পারলে তো কাজটা ব্যর্থ হয়ে যাবে। সেই যোগাযোগের জায়গাটা আমি নাচের অনেক শিল্পীর কাজে পাই না। এটা ঠিক, তাঁরা অনেক পরিশ্রম করছেন, অনেক খাটছেন, কিন্তু দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনটা হচ্ছে না। এ জায়গায়টা নিয়েই ভাবতে হবে। আর এই কারণে নাচ শিল্পের অন্য ক্ষেত্রের চেয়ে একটু পিছিয়ে আছে। এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারলে, নাচ নিয়েও দর্শকের অনেক সাড়া পাওয়া সম্ভব।

নাচে আপনার আদর্শ কারা?

আমার অনেকের কাজ ভালো লাগে। বর্তমান সময়ে আমি চায়নিজ ডিরেক্টর ওয়াং চাও যে, তিনি অসাধারণ কাজ করেন। আকরাম খানের কাজ অনেক আগে থেকে ভালো লাগে। ভারতীয় উপমহাদেশে লীলা স্যামসনের কাজ সব সময় ভালো লাগে।

default-image

নিজের দেশে কার কথা বলবেন?

আমার দুর্ভাগ্য বুলবুল চৌধুরীর কোনো নাচের ক্লিপ আমি দেখতে পারিনি। চেষ্টা করেছি খোঁজার, কিন্তু কোনো ভিডিও ক্লিপ পাইনি। তাঁর নাচের স্থিরচিত্রগুলো দেখি। সেই সময় তাঁর নাচের প্রযোজনার বেশ নামডাক ছিল। আনারকলি নামে একটা প্রযোজনা করেছিলেন, খুবই আধুনিক কস্টিউমে। আফরোজা বুলবুলের লেখা বুলবুল চৌধুরীর আত্মজীবনী আমি পড়েছি। তাঁর কাজগুলো আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। তবে আমি যাঁর দ্বারাই অনুপ্রাণিত হই, আমি কখনো কারও মতো হওয়ার চেষ্টা করি না। সব সময় চেষ্টা করেছি মৌলিক কাজ করতে।

পূজা সেনগুপ্ত নৃত্যশিল্পী না হলে কী হতো?

অনেক ধরনের স্বপ্ন কাজ করত। মূল স্বপ্নটা ছিল, শিল্পী হওয়া। শিল্পী হওয়া তো লম্বা ভ্রমণ। যখন থেকে একটু বুঝতে শিখেছি, তখন মনে হয়েছে ভালো মানুষ হওয়াটা জরুরি এবং এটাই খুব কঠিন। সত্যি বলতে, নৃত্যশিল্পী হওয়ার জন্যই আমার জন্ম হয়েছে। এটাই আমার কপালে লেখা ছিল। আমি পদার্থবিজ্ঞানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স–মাস্টার্স করেছি। দ্বিতীয় মাস্টার্স করেছি রবীন্দ্রভারতী থেকে নাচের ওপরে। পদার্থবিজ্ঞানে আমার আন্তর্জাতিক প্রকাশনাও ছিল, চাইলে গবেষণায় যেতে পারতাম। এখনো পারি। কেন জানি মনে হয়, নিজেকে ইনকম্পলিট মনে হতো। পেশাদার নাচে আসার পর এখন আমাকে অনেক পরিপূর্ণ মনে হয়। আমাকে কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, গর্বের সঙ্গে বলি, আমি একজন নৃত্যশিল্পী। এই পরিচয় আমি খুব উপভোগ করি।

default-image

ভবিষ্যতে নিজের পড়াশোনার বিষয়ে আপনাকে পাওয়া যেতে পারে?

আমি আমার পদার্থবিজ্ঞানের মেধাকে নাচে প্রয়োগ করেছি। আমার প্রোডাকশনের লাইট ডিজাইন, স্পেস ডিজাইন, টপোলজি, জিওম্যাট্রিক সেন্সের ব্যবহার নাচে করেছি। পদার্থবিজ্ঞানের পড়া বিফলে যায়নি। কোনো জ্ঞানই আসলে বিফলে যায় না।

আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন