বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মধ্যে অনেক বছর গানে ছিলেন না।

আমার মাথাটা নব্বই দশকের। তখন আমি নিজেই গিটার বাজাতাম। তখন আমরা একভাবে ভয়েস থ্রো করতাম। তখনকার শ্রোতাদের কান একভাবে প্রস্তুত ছিল। যখন নতুন করে শুরু করলাম, আমার সংগীত পরিচালকেরা ভেবেছিলেন, সেই রক অ্যান্ড ব্লুজ শিল্পীকে নিয়ে কাজ করছেন। আমার গান আর ভিডিওগুলো সেভাবেই তৈরি করা হয়। দেখলাম, ওই ধরনের গান বা স্বর এখনকার শ্রোতারা নিচ্ছেন না। অন্য কিছু চান তাঁরা। শুরুতে ব্যাপারটা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। আমার দর্শন আধ্যাত্মবাদ দ্বারা প্রভাবিত। আমার প্রত্যাবর্তনের শুরুর দিকের গানগুলোও হয়তো এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তারপর কাকতালীয়ভাবে একটি নাটকে ফোক গান গাইলাম। দর্শক-শ্রোতার কাছে সেটা গ্রহণযোগ্যতা পেল। তখন মনে হলো, তাহলে ফোকে হয়তো আমার কিছু করার আছে। এরপর বেশ কয়েকটি ফোক গান করলাম, ভালো সাড়াও পেলাম। ভারতের শম্পা বিশ্বাসের সঙ্গে ‘বিনোদিনী রাই’ তো দুই বাংলায় ভীষণ জনপ্রিয় হলো। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, নতুন সময়ের মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মনে হলো, নিজেকে আমার নবায়ন করতে হবে। নব্বই পর্যন্ত যা জানতাম, এর সঙ্গে নতুন কিছু শেখার বিষয় আছে। আমি একেক সময় একেক জন বিদেশি কোচের শরণাপন্ন হতে শুরু করলাম। তাঁরা অনলাইনে আমাকে ট্রেইনড করলেন। আমার যে পরিবর্তনটুকু, সেটার পেছনে তাঁদের অবদান অনেক। আমার ২০১৭ আর ২০২১ সালের গানগুলো শুনলে টের পাবেন। ভোকালের নতুন কৌশলগত প্রয়োগ আমাকে শিখতে হয়েছে।

default-image

নব্বই আর এখনকার শিল্পীদের মধ্যে কাদের গান আপনার ভালো লাগে?

জেমস ভাই, (আইয়ুব) বাচ্চু ভাই, আজম খানের গান ভালো লাগে। এ ছাড়া যে ব্যান্ড ও শিল্পীরা আছেন, তাঁদের অনেকের গানই আমার ভালো লাগে। আমাদের এখনকার তরুণেরাও ভালো করছেন। দেশের বাইরের অজিত কৌর, নিল ইয়ং, থম ইয়র্ক; গানের দল মাইল্ড অরেঞ্জ, ক্যাস্টের গানও আমার প্রিয়।

এপিরাসের সঙ্গে বেশ কয়েকটি কাজ করলেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো কী করে?

আমি তাদের বড় ভক্ত। দুই ভাই খুব মেধাবী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিবার তারাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে গান গাইয়েছে। আমি প্লাবন কোরাইশি, ফুয়াদ আল মুক্তাদিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। এপিরাস আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে মুম্বাই থেকে। জানাল, তারা বলিউডে কাজ করে। তখন অমিতাভ রেজা চৌধুরীর পরিচালনায় আমার ‘হর্ষ’ গানের ভিডিওটি বের হয়েছে। বলল, আমাকে নিয়ে কাজ করতে চায়। তখনো আমি তাদের জানতাম না। তারা বলল, ‘আমরা বলিউডে কাজ করি, ইডিএম বেজড।’ আমি এ সম্পর্কে ভালো জানতাম না। আমি বললাম, ‘আমি ডেলিভার করতে পারব কি না, নিশ্চিত নই।’ তারা বলল, ‘আমাদের মনে হয়, আপনি পারবেন।’ তারপর ওদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমার বেশ ভালো লাগল। শেষবার যেটা হলো, নিউইয়র্ক টাইমস সারা পৃথিবীর বিভিন্ন শিল্পীদের দিয়ে ওশান ক্রাইমের ওপর গান করাচ্ছে। বলল, ‘আমরা আপনার কণ্ঠে একটা গান করাতে চাই।’ আমি বললাম, ‘ইংরেজি?’ বললাম, ‘ইংরেজি গান আমি আগে গেয়েছি কিন্তু প্রকাশিত হয়নি।’ তারা বলল, ‘আমাদের ওপর ছেড়ে দেন।’ নারী ও শিশু অধিকারের বিষয়গুলো আমাকে সব সময়ই প্রভাবিত করে। মানব পাচার, শিশু পতিতাবৃত্তি, ফোর্স প্রস্টিটিউশনের মতো বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি। সেই সব ভেবেই লিরিক লেখা। ‘ড্রাউনিং’ গানে খেয়াল করলে দেখবেন, শুরুতে শান্ত একটা স্বর, তারপর হঠাৎ বিদ্রোহী স্বর। এটাই আমার নিজস্বতা। শাহরিয়ার পলক (ড্রাউনিং–এর সংগীতচিত্রের পরিচালক) ভিজ্যুয়ালে সেটাই ফুটিয়ে তুললেন।

default-image

গান নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো লক্ষ্য আছে, নাকি মনের আনন্দের জন্য গান করে যাবেন?

এখন পর্যন্ত তা-ই। তবে দেখলাম, গান করে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে নাড়া দেওয়া যায়। সেটা দেখে একটা চিন্তা এসেছে। বৈশ্বিক যে সংকটগুলো আছে, আমার আধ্যাত্মবাদী দর্শনকে সেসবের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের ভাষায় বা ভিন্ন ভাষায় গান করা যায় কি না, ভাবছি।

লেখালেখি কি ছেড়ে দিয়েছেন?

কেন যেন বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে অবশ্য বেশ কিছু ইংরেজি কবিতা লিখেছি। একটি কবিতা আন্তর্জাতিক এক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। দুটি বই লেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু কেন যেন হচ্ছে না। এখন কেবলই ইংরেজি আসছে।

আপনার মা সাহিত্যিক আশরাফুন্নেসা দুলু আপনার লেখালেখি নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। লেখা ছেড়ে দেওয়ায় তাঁর প্রতিক্রিয়া কী?

মা হয়তো চেয়েছিলেন আমি লেখালেখি করি। কিন্তু গানটাও তো মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। হাতেখড়ি তাঁর কাছে। তিনিই গানের ওস্তাদ ঠিক করে দিয়েছিলেন। আমাকে গানের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় তাঁরই সিদ্ধান্তে। তারুণ্যে যখন গান করতাম, পরিবার থেকে তেমন সাড়া পাইনি। এখন আবার গানে ফেরাটা তাদের কাছে একটু অদ্ভুত লেগেছে। অনেক মানুষ চিন্তা করে, চল্লিশের পরের বয়সটা হবে শেষ বয়স। অনেক অভিজ্ঞতা জমা হয়, এ সময় মানুষ লেখালেখি করে। এ বয়সে লেখালেখিটাই মানায়, গান করা ঠিক মানায় না। আমি আসলে আমার মনের ডাকে সাড়া দিয়েছি। বয়স বা পেশার সঙ্গে খাপ খায়, সেসব ভেবে আমি কাজ করি না। আমি মনে করি, পৃথিবীর কোনো শিল্পীরই তা করার কথা না।

করপোরেট দায়িত্ব, গান, পরিবার—সমন্বয় করেন কীভাবে?

আমার যতগুলো গান বেরিয়েছে, বিরতি দিয়ে। গত তিন বছরে চারটি করে গান, কঠিন কিছু না। শুক্র-শনিবার ফাঁকা থাকে। আমি প্র্যাকটিস করি রাতে। কোচের সঙ্গে কথা হয় সপ্তাহে এক দিন রাতে। স্টুডিওতে যাই ভয়েস দিতে, খুব বেশি সময় লাগে না। আস্তে আস্তে ভিডিও থেকে বেরিয়ে আসব। ‘বিনোদিনী রাই’য়ের ভিডিওটা স্টুডিও ভার্সন। ফলে ভিডিওতে আলাদা করে সময় দিতে হয়তো আর হবে না। আমার মনে হয়েছে, সংগীত ইতিবাচকভাবে অন্য কাজগুলোকে প্রভাবিত করে। আত্মিক শান্তি যদি আসে কোনো কাজ থেকে, সেটা অন্য কাজের ওপর ইতিবাচক প্রভাব রাখে।

পরের গান কবে আসছে?

বেশ কিছু গান রেডি। হয়তো ডিসেম্বরে একটা ছাড়ব। লাকি আখান্দের সুর ও গোলাম মোর্শেদ ভাইয়ের লেখা। ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল ঘরানার সুর। এপিরাসের সঙ্গে একটা কাজ করেছি অ্যারাবিক সুরে। শম্পা বিশ্বাসের সঙ্গে একটি ডুয়েট গানের কাজ প্রায় শেষ।

default-image

গান ছাড়াও আপনার কাছ থেকে আমরা আর কী পেতে পারি?

আমি স্বরে নিজস্ব একটা স্টাইল ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি। স্বরের মাধ্যমে কীভাবে চরিত্র হয়ে ওঠা যায়, সেটা আমি আয়ত্ত করেছি। আমি শিখেছি, মানুষ কীভাবে মিউজিক থেকে আত্মিক প্রশান্তি পেতে পারে, মানুষ কীভাবে নিজের স্বর খুঁজে পেতে পারে। মানুষ যাতে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সংগীতের যোগটা বুঝতে পারে, ভবিষ্যতে হয়তো এটা নিয়ে আমি কাজ করতে পারি। সেটা হতে পারে ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে। এতে অনেক মানুষ লাভবান হতে পারে।

আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন