বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হকের সঙ্গে গুরু–শিষ্যের সম্পর্ক আরেক রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অণিমা রায়ের। গতকাল সকালে মারা যান অণিমার এই সংগীতগুরু। মাস তিনেক আগে বাবাকেও হারান অণিমা রায়। বাবার পর গুরু, স্বল্প বিরতিতে অণিমা রায়ের কাছের দুজন মানুষ মারা গেলেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে। কথা হলো এই শিল্পীর সঙ্গে।
বিজ্ঞাপন

ফেসবুকে আপনার পোস্ট পড়ে মনে হলো রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হকের প্রয়াণ আপনার পরিবারের একজন হারানোর মতোই বেদনা।

একদমই তা–ই, তিনি আমার গুরু। মা–বাবার মাধ্যমে একজন মানুষ পৃথিবীতে আসে। আর পৃথিবীতে আসার পর সেই মানুষের আরেকটা জন্ম হয়। মা–বাবার সন্তান অণিমা রায়ের বাইরে শিল্পী কিংবা শিক্ষক হিসেবে আমার যে পরিচিতি, তা মিতা হকের কারণেই। ১৭–১৮ বছর আগে যদি তাঁর সঙ্গে আমার দেখা না হতো, তাহলে আজ আমি এখানে থাকতাম না। মা–বাবা প্রথম জন্মদাতা, দ্বিতীয় জন্মটা মিতা হকই দিয়েছেন।

default-image

গুরুর মৃত্যুর খবরটা কখন পেলেন?

আমি ঘুমে থাকতে খবরটা পাই, তানভীর (তানভীর তারেক, অণিমা রায়ের স্বামী) বলেছিল। সে জানে, মিতা হক আমার কাছে কী! কখনো মনে হতো তিনি আমার বন্ধু, কখনো বোন, আবার কখনো মা। ভালোবাসা দিয়ে তিনি তাঁর সব ছাত্রছাত্রীকে আগলে রাখতেন। গুরু হয়ে শিষ্যের কোনো সাফল্যে তিনি এতটা আনন্দিত হতেন, যা অন্য কারও কাছে দেখিনি।

সংগীতের এই পথচলায় অনেকেরই সান্নিধ্যে এসেছেন। মিতা হক কেন আপনার দৃষ্টিতে অনন্য?

মানুষ হিসেবে তিনি এতটাই অতুলনীয়, বলে শেষ করা যাবে না। যে মানুষই তাঁর কাছে গেছে, সে তাঁর ভালোবাসায় সিক্ত না হয়ে পারেনি। গুণীদের আমি শ্রদ্ধা করি। অনেকের কাছেই আমি শিখেছি। শিক্ষক হিসেবে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা আপা, সাদী মোহাম্মদ স্যার, লাইসা আহমেদ লিসা আপা, আজিজুর রহমান তুহিন ভাই, অদিতি মহসিন আপা, ওয়াহিদুল হক স্যার, নীলুফার ইয়াসমীন আপাসহ অনেকের কাছে শিখেছি। আমি সত্যিই খুবই সৌভাগ্যবান, একাধারে অনেক গুণী সংগীত শিক্ষকদের কাছে গান শেখার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শুধু মিতা আপার কাছেই শিখেছি। কখনো যেতে না পারলে ফোনে পরামর্শ নিতাম। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী। সেই দাবিতে বলব, মিতা আপার বেশি কাছে যেতে পেরেছি বলে তাঁকে বেশি বুঝতে পেরেছি, চিনতে পেরেছি। অন্যদের এতটা কাছে যেতে পারিনি। হয়তো মিতা আপার মতো কেউ এত কাছে টেনেও নেননি। যে কারণে হয়তো অতটা জানার সেই সুযোগ হয়ে ওঠেনি। শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও তাঁর অসংখ্য ভক্ত। সংগীতে মিতা আপার অনার্স–মাস্টার্স নেই। সংগীত দিয়ে মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য যে কোনো ডিগ্রি লাগে না, মিতা আপা তাঁর অনন্য উদাহরণ।

করোনায় বিপর্যস্ত সংস্কৃতি অঙ্গন। ফেসবুকে প্রায়ই দুঃসংবাদ। একের পর এক চলে যাচ্ছেন বিনোদন অঙ্গনের বটবৃক্ষরা। অনেকেই বলছেন, অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছেন সবাই। আপনি কী মনে করছেন?

একদমই তা–ই। তিন মাস আগে বাবা মারা গেল। আজ চলে গেলেন আমার গুরু। আমার জীবনের চড়াই–উতরাই সবই তিনি জানতেন। সবাইকে তিনি খুব কাছে টেনে নিতে পারতেন। আমার জীবন যে তিনজন মানুষ পরিপূর্ণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে দুজন করোনায় নেই হয়ে গেলেন। আরও কতজন যে আপনজন হারাচ্ছেন। সংস্কৃতি অঙ্গনও এই করোনায় অনেক গুণীজন হারিয়েছে। সত্যিই আমরা আপনজন ও অভিভাবক হারানোর যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

গত কয়েক বছরে খুব দ্রুত গানের অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির উন্নয়নের এই পরিবর্তন আপনার চোখে কেমন?

সময়ের দাবিতে এই পরিবর্তন। এ নিয়ে আসলে বলার কিছু নেই। রবীন্দ্রনাথের গান তো চোখে দেখার নয়, এটা উপলব্ধির বিষয়। মিউজিক ভিডিও দিয়ে যদি রবীন্দ্রনাথের গান বোঝাতে হয়, তাহলে সেই গানকে আসলে হত্যা করা হয়। রবীন্দ্রনাথ কী বলে গেছেন, তা চোখ বন্ধ করে উপলব্ধি করতে হবে। যার যার মতো সেই উপলব্ধি। গানের ভিডিও মানে তো একটা গল্পের মধ্যে বেঁধে ফেলা, আটকে দেওয়া। রবীন্দ্রসংগীত তো অনির্বচনীয়। একটি কথা দিয়ে বহু অর্থের প্রকাশ। একজন শ্রোতা তাঁর মতো করেই কল্পনায় গেঁথে নেবেন।

আপনারও তো গানের ভিডিও প্রকাশিত হয়...

করতে হয়, কিছু তো করার নেই। তবে আমার গানগুলোতে কোনো গল্প বেঁধে দেওয়া হয় না। আমি আমার গানে কোনো মডেল ব্যবহার করি না, শ্রোতাদের কাছে ছেড়ে দিই।

default-image

আপনার এই কথা কী শুধু রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাকি আধুনিক গানের ক্ষেত্রেও...

আমি যেহেতু আধুনিক গান করি না, তাই বলা মুশকিল।

শ্রোতা হিসেবে তো শোনেন নিশ্চয়?

আসলে গান বিষয়টাই অন্য রকম। প্রতিটি গানের নিজস্ব একটা গল্প থাকে। সেই গল্পকে শ্রোতার মাঝে ছেড়ে দিতে হয়। গানের ভিডিওতে গল্পকে বেঁধে দিচ্ছে। মিউজিক ভিডিও নিয়ে অন্যভাবেও ভাবা যেতে পারে, যাতে শ্রোতার কল্পনাও ঠিক থাকে। প্রযুক্তির ব্যাপারটাও বজায় থাকে।

default-image

গান আর নাটকে, সবাই এখন ভিউ নিয়ে মেতেছে। এই ভিউ নিয়ে আপনার ভিউ কী?

সত্যিকারের শিল্পীরা কোনো দিন ভিউ কাউন্ট করেন না। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, যে যত ভালো শিল্পী, তাঁর ভিউ তত কম। আমি হাতে গুনে বলে দিতে পারব, লিজেন্ড শিল্পীদের বলতে গেলে কোনো ভিউই নেই। সব তো...কী বলব। এসবে দুঃখের মধ্যেও হাসি পায়। কাদের ভিউ বেশি, তা আমরা সবাই জানি। আমরা আসলে খুব সস্তা হয়ে গেছি, যা কিছু চকচক করে, তা নিয়েই মেতে থাকি।

মাস তিনেক আগে করোনায় বাবা মারা গেলেন। গানে মনোযোগী হতে পেরেছেন কী?

বাবার মৃত্যুর পর অনেক দিন পর্যন্ত কিছুতেই মন বসছিল না। পরে ভাবলাম, গানটাই আশ্রয়, এ ছাড়া পরিত্রাণের পথ নেই। এরপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ভার্চ্যুয়ালি ক্লাস শুরু করলাম। ভেবেছিলাম এপ্রিল থেকে ফিজিক্যালি ক্লাস শুরু করব, কিন্তু পরিস্থিতি যা, এখন তো মোটেও সম্ভব না।

default-image

আপনার কাজের খবর বলুন?

কয়েকটা কাজের ব্যাপারে কথা হচ্ছিল, ভারতে। সামনে ২৫ বৈশাখ ঘিরে। এখন তো আবার অনিশ্চয়তা। দেখি সামনে কী হয়...

আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন