বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মতিউর রহমান: টেলিভিশনের প্রথম নাটক মনে আছে?

আসাদুজ্জামান নূর: সেটা ’৭৪ সালে। নাটকটার নাম হলো ‘রঙের ফানুস’। আবদুল্লাহ আল–মামুনের লেখা। নাটকের মূল চরিত্রে ছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার আর হায়দার রিজভী—আমাদের গওহর রিজভী সাহেবের বড় ভাই। আমার ২-৩ মিনিটের ছোট্ট একটা চরিত্র ছিল—পাশের বাড়িতে থাকি আরকি। এটা দিয়েই শুরু।

মতিউর রহমান: তোমার অভিনয়জীবনের একটা বড় অংশজুড়ে আছে হুমায়ূন আহমেদের নাটক–সিনেমায় অভিনয়। তো তুমি হুমায়ূন আহমেদকে কীভাবে দেখো?

আসাদুজ্জামান নূর: টেলিভিশনে আমার যা কিছু সফলতা, সেটার পেছনে আমি হুমায়ূন আহমেদকে অনেক বড় করে দেখি। আমার নিজের যেটা মনে হয়েছে, টেলিভিশনে আমাদের সময়ে যে অভিনয়টা হতো, সেটা একটু...ঠিক কী বলব?

মতিউর রহমান: সাজানো-গোছানো?

আসাদুজ্জামান নূর: অভিনয়–অভিনয় মনে হতো আরকি। শুরু থেকেই আমি এটা থেকে একটু বাইরে আসার চেষ্টা করছিলাম। সম্ভবত আমার একটা নাটক দেখে হুমায়ূনের ভালো লাগে। সে তখন বলল, ‘ওনাকে আমার নেক্সট নাটকে চাই।’ এক পর্বের একটা নাটক, নামটা মনে নেই, সেটাতে অভিনয় করলাম। তারপর থেকে ওর সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠল, আস্তে আস্তে যেটা আরও গভীর হলো। এরপর থেকে হুমায়ূন আহমেদের যতগুলো ধারাবাহিক বিটিভিতে হয়েছে—এমনকি তারপরও বেশ কয়েকটা—সব কটিতে আমি ছিলাম।

মতিউর: শুরু তো ‘এইসব দিনরাত্রি’ দিয়ে?

নূর: হ্যাঁ, ‘এইসব দিনরাত্রি’। তারপর ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’। এরপর করেছি সম্ভবত ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘আজ রবিবার’। এগুলো সিরিয়াল। আরও কিছু সিরিয়াল করেছিলাম—সামাজিক বার্তা বা জনসচেতনতামূলক—স্বাস্থ্যের ওপর, শিক্ষার ওপর। সেগুলো খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।

default-image

মতিউর: হুমায়ূনের লেখা, তাঁর সাহিত্যজীবন, পরিচালকের জীবন বা নাটক–সিনেমা জগতে বিচরণ—সব দিক থেকে এত দিন পরে তাঁকে তুমি কীভাবে মূল্যায়ন করো?

নূর: হুমায়ূনের ওই যে স্টোরি টেলিং, গল্প বলা—এটা এখন পর্যন্ত সাহিত্যের ক্ষেত্রে সেরা। গল্প বলার ক্ষেত্রে তাঁর মূল শক্তি হলো তিনি ধরে রাখেন।

default-image

মতিউর: আর নাটকের ক্ষেত্রে?

নূর: যেমন হুমায়ূনের সংলাপ এত সাবলীল যে মুখস্থ করতে হতো না। মনে হতো যেন আমার মুখে বসেই আছে। অন্যদের সংলাপ আমার মুখস্থ করতে হতো। সবাই বলে ‘বহুব্রীহি’ হাসির নাটক। আপনি কিন্তু ওখানে এমন কোনো সংলাপ পাবেন না, যেটা হাসির। বা ধরেন অভিনেতাকে কসরত করে দর্শক হাসাতে হচ্ছে—এ রকম অভিনয় করার কোনো সুযোগ নেই। গল্পটাই এমনভাবে সাজানো, সংলাপগুলো এমন সুন্দর! যেমন এক জায়গায় রহিমার মা চোখে চশমা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাড়ির কর্ত্রী জিজ্ঞেস করছেন, ‘রহিমার মা, তুমি এ রকম চশমা চোখে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?’ আসল কারণটা হলো যে তিনি চশমা নিয়েছেন একটা, সুতরাং রহিমার মা–ও নিয়েছেন। অথচ রহিমার মায়ের জবাবটা ছিল, ‘কেন, আমি গরিব বলে কি আমার কোনো শখ–আহ্লাদ নাই!’
এই যে সিচুয়েশনটা তৈরি হলো, এতে কিন্তু মানুষ হাসছে। এখনকার নাটকের সঙ্গে ওইটাই তফাত। এখন অনেক চেষ্টা করার পরও মানুষ হাসে না। তারা শারীরিকভাবে হাসানোর চেষ্টা করছে। নানা ধরনের উদ্ভট উদ্ভট সংলাপও বলা হচ্ছে, তবু লোকে হাসছে না।

মতিউর: ওই সময়ের ধারাবাহিক নাটকগুলোর মধ্যে ‘কোথাও কেউ নেই’–ই কি শ্রেষ্ঠ?

নূর: ‘কোথাও কেউ নেই’ হয়তো মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়েছে, নানান কারণে। কিন্তু আমার নিজের কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হয় ‘অয়োময়’।

default-image

মতিউর: মনে আছে, তখন আমরা ‘ভোরের কাগজ’ করি। ‘কোথাও কেউ নেই’–এর শেষ দৃশ্যে টিভিতে দেখানো হবে। তোমার বাসায় আমরা ফটোগ্রাফার পাঠিয়েছিলাম, তুমি তোমার স্ত্রী–বাচ্চাদের নিয়ে বাকেরের সেই শেষ দৃশ্যটি টিভিতে দেখছ। তখন ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট সব খালি হয়ে গেছে। অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি—প্রায় হরতালের মতো। এ রকম বোধ হয় বাংলাদেশের কোনো নাটক-সিনেমার ক্ষেত্রে আর ঘটেনি। তো পত্রিকার প্রথম পাতায় ডান দিকের তিন কলামজুড়ে ছবিটা ছাপা হয়েছিল যে নূর টিভিতে দেখছেন শেষ দৃশ্যটা। তো এটার পেছনে কতটুকু হুমায়ূনের ভূমিকা, কতটুকু আসাদুজ্জামান নূরের?

নূর: আমি সব সময় বলি, যিনি নাটক লেখেন, মূল ভিত্তিটা তিনিই তৈরি করে দেন। সেটা না হলে আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, ভালো অভিনয় বের করা খুব কঠিন। ওটা না হলে হয় না। দর্শকের কাছে অনেক সময় লেখক হারিয়ে যান। যেমন গানের ক্ষেত্রে গীতিকার হারিয়ে যান। হয়তো আমাদের ক্ষেত্রে সে রকমই হয়েছে। কিন্তু হুমায়ূন না থাকলে...নাটকটা ওইভাবে লেখা না হলে আমাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হতো না।

মতিউর: এমনিতে মঞ্চ, টেলিভিশন বা সিনেমা—এই তিন মাধ্যমে তোমার কাজ। মঞ্চ আর টেলিভিশনে অনেক, সিনেমায় কম। স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো কোন কোন মাধ্যমে?

নূর: মঞ্চের ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়, পুরো জিনিসটা মুঠোর মধ্যে আছে। কারণ, এতবার মহড়া করি, আমার সঙ্গে যারা আমার কো-অ্যাক্টরস আছে, তাদের সঙ্গে আমার যে ইন্টারেকশন, বলতে গেলে সেগুলো আমাদের একদম মুখস্থ। আমরা জানি যে কী করব। সব মিলিয়ে ওইটা অনেক বেশি নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে, ফলে অভিনয়টা অনেক বেশি ভালো করা যায়।

মতিউর: সব মাধ্যম মিলিয়ে তোমার সেরা অভিনয় কি ‘নূরলদীনের সারাজীবন’?

নূর: ‘নূরলদীন’ সবাই খুব ভালো বলেন কিন্তু আমার নিজের যদি তৃপ্তির কথা বলি, তাহলে আরও দু–একটা নাটকের কথা বলতে হয়। যেমন ‘কোপিনিকের ক্যাপ্টেন’ আমার নিজের খুব প্রিয় নাটক। তারপর ‘ওয়েটিং ফর গডো’—‘গডোর প্রতীক্ষায়’। এমন কঠিন একটা নাটক আমরা ২৫টির মতো শো করেছিলাম, সব কটিই কিন্তু হাউসফুল ছিল। নাটকটাকে সহজ করে দর্শকদের সামনে হাজির করা, আমাদের শিল্পীদের এখানে অনেকটাই কৃতিত্ব দিতে হবে। হায়াত ভাই ছিলেন, জামাল উদ্দিন হোসেন ছিলেন, আমি ছিলাম, মিজান বলে একটি ছেলে ছিল। বেকেটের নাটক, বুঝতেই পারেন।
আরেকটি নাটক আমার খুব প্রিয়, ‘মুখোশ’। (সৈয়দ শামসুল) হক ভাইয়ের অনুবাদ করা। গণহত্যার ওপরে চিলির একজন নাট্যকারের লেখা নাটকটিকে তিনি একাত্তেরর গণহত্যার সঙ্গে মিলিয়ে করেছিলেন। খুব সুন্দর নাটক।

default-image

মতিউর: ‘আগুনের পরশমণি’...সিনেমাটা দেখে আমার মধ্যে ভীষণ আবেগ তৈরি হয়। আমি অফিসে এসে হুমায়ূনকে ফোন করেছিলাম। এই সিনেমার মাধ্যমেই হুমায়ূনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ, পরিচিত হওয়া, যাওয়া–আসা শুরু হয়।

নূর: আমি তো আসলে এর আগে ছবি খুব একটা করিনি। আমার শুরু হয়েছিল তানভীর মোকাম্মেলের একটা শর্টফিল্ম দিয়ে—‘হুলিয়া’। অনেক আগে। নিজেরা নিজেরা যা হয় আরকি, সেভাবে। তারপর করলাম শেখ নেয়ামত আলীর একটা ছবি—‘দহন’। তারপর আমাদের বিটিভির জিএম ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান, তিনি করলেন হুমায়ূন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’। ওই মাধ্যম সম্পর্কে আমার তেমন ধারণাও ছিল না। ফলে আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনি। তা ছাড়া আমরা এমন একটা সময়ে অভিনয় শুরু করেছিলাম, যখন বাংলা চলচ্চিত্রে একটা মন্দা চলছে। ফলে আমাদের ভালো কাজ করার সুযোগও কমে গিয়েছিল অনেক। হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ আমার মনে হয় যে চলচ্চিত্রে একটা মাইলফলক। কাজ করে আমার নিজের ভালো লেগেছে। যে আবেগটার কথা বললেন, আমি যখন দর্শক হিসেবে ছবিটা দেখি, তখন আমার মধ্যেও সেটি কাজ করেছিল। যেহেতু আমি নিজে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ছিলাম, ফলে আমাকে ওই বিষয়গুলো খুব সহজেই স্পর্শ করে।

মতিউর: বর্তমানে আমাদের নাটক–সিনেমা জগতের যে অবস্থা, এটা কি বলা যায় যে আমরা অনেকটা পিছিয়ে গেছি আগের সময়ের চেয়ে? আমি যদি তোমাকে ষাটের দশকের সিনেমাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিই, যেগুলো আমরা হলে দেখতাম, তুমিও দেখেছ—হলিউডের সিনেমা, ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়ার সিনেমা; আবার তুমি হয়তো পাওনি—কলকাতা, মুম্বাই, লাহোর, করাচির সিনেমা...তখন কিন্তু খান আতা, জহির রায়হান—তাঁরা মিলেমিশে এই অঞ্চলের সিনেমাকে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে গেছেন। তাঁরা কিন্তু সফলও হয়েছেন। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তোমার কাছে কী মনে হয়?

নূর: এই যে সিনেমা আসা বন্ধ হয়ে গেল, এটাতে লাভ হয়নি কোনো। আমাদের সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গেল। দেড়–দুই হাজারের মতো সিনেমা হল ছিল, এখন কমে বুঝি এক–দেড় শর মতো আছে। এই ছবি আসাটা বন্ধ করার পেছনে কোনো যুক্তি ছিল না। আমি সব সময় এটা বলি। আমাদের স্বাধীনতার আগে, আপনি যেটা বললেন, একটা সময় পর্যন্ত তো ভারতীয় ছবিও এসেছে।

default-image

মতিউর: ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আমরা সব সিনেমা দেখতাম।

নূর: যুদ্ধের পর বন্ধ হয়েছে। আমি ’৬২–এর আগে ছবি দেখেছি। তখন রংপুরে থাকতাম। তিনটি সিনেমা হল ছিল সেখানে। প্রচুর ভারতীয় ছবি দেখেছি।

মতিউর: বাংলা।

নূর: বাংলা। আবার...

মতিউর: হিন্দি।

নূর: তখন কত ছবি আসত। লাহোর থেকে উর্দু ছবি। কলকাতা, বোম্বে, হলিউডের ছবি। এত কিছুর মধ্যেও তো আমাদের বাংলা ছবি দাঁড়িয়ে ছিল। সেই প্রতিযোগিতা না থাকায় বাংলা ছবির বাজারটা অনেক দিন খারাপ গেল। ইদানীং আমরা লক্ষ করছি যে বেশ কিছু নবীন নির্মাতা ভালো ছবি করছেন। কিন্তু তাঁরা যে ছবি করবেন, সেগুলো দেখাবেন কোথায়? দেখানোর জন্য তো সিনেমা হল পাওয়া যায় না। আবার সব হল তাঁদের ছবি চালাতেও চায় না। ভাবে যে এই সব ছবি তো বিক্রি হবে না। আসলে কিন্তু বিক্রি হবে। এই যে অমিতাভ রেজা একটা ছবি করলেন—‘আয়নাবাজি’, আমি তো মনে করি এটা সুনির্মিত একটা ছবি। ছবিটা বেশ ভালো চলেছেও। তার আগে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’। সেটিও ভালো চলছে। সুতরাং ছবি ভালো বানালে চলবে। চলবে না কেন? এখন কেউ কেউ আছেন, একটু বিকল্পধারার ছবি করছেন, কিন্তু দেখানোর জায়গা পাচ্ছেন না।

default-image

মতিউর: তুমি যেটা বললে, বিদেশি সিনেমা বন্ধ করে দেওয়াটা আমাদের জন্য ভীষণ ক্ষতিকারক হয়ে গেছে। এখন তো বিশ্বজুড়ে একটা বিরাট পরিবর্তন, সিনেমার বিকল্প হিসেবে হয়তো ওটিটি প্ল্যাটফর্ম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। নেটফ্লিক্স বা হইচই বা চরকি, আরও কিছু আছে, তুমি কি মনে করো যে সিনেমার ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে এই ওটিটি প্ল্যাটফর্ম কোনো বাধা তৈরি করবে? নাকি ওটিটি তার মতো চলবে, পাশাপাশি সিনেমাও নিজের মতো চলতে পারে।

নূর: আমার মনে হয় দুটোই চলবে। কারণ, যা–ই বলি না কেন, বড় পর্দায় সিনেমা দেখার একটা আলাদা মজা আছে। ধরুন আজ ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ইত্যাদি হয়েছে, কিন্তু তার আগে তো টিভি ছিল। সিঙ্গাপুর, ভারত বা ইংল্যান্ডে গিয়ে দেখেছি, শনি–রোববারে হলের টিকিট পাওয়া অসম্ভব। প্রচুর মানুষ সিনেমা দেখতে যায়। সিঙ্গাপুরে তো তরুণ প্রজন্ম দল বেঁধে যায় সিনেমা দেখতে। এটার একটা মজা আছে। আনুষঙ্গিক আরও কিছু বিষয় আছে—মানুষ যাচ্ছে, কিছু খাচ্ছে। পপকর্ন নিয়ে সিনেমা হলো ঢুকছে। বইয়ের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে। আমরা বুঝি যে বই বুঝি বন্ধ হয়ে গেল, বই তো বন্ধ হলো না, মানুষ পড়ছে তো।

আলাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন