default-image

এখন ব্যস্ত কী নিয়ে?

অনলাইন কনসার্ট নিয়ে। ২ অক্টোবর শান্তিনিকেতন থেকে অনলাইনে একটা কনসার্ট করব। নাম ‘হোক কলরব’। কার্পে ডিয়েম নামে এ কনসার্ট যারা করছে, তারা করোনার এই সময়ে ‘বাড়ি থেকে’ নামে একটা ভার্চ্যুয়াল কনসার্টের সিরিজ করছে। সেই সিরিজে আমার পর্বের নাম ‘হোক কলরব’। টিকিট কেটে এই অনলাইন কনসার্টে অংশ নেওয়া যাবে। আর এই কনসার্ট ধরে একটা মজার কনটেস্টও হচ্ছে। ‘হোক কলরব’ গানের কথা নিয়ে যে কারও কোনো সৃজনশীল সৃষ্টি, যেমন ছবি আঁকা, ক্যালিগ্রাফি, লেখা—এসব আমাদের জমা দিলে সেখান থেকে বাছাই করা সেরা তিনজনকে কনসার্টে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত করা হবে।

বিজ্ঞাপন

আপনার ‘হোক কলরব’ গানটা তো পশ্চিমবঙ্গে বেশ জনপ্রিয়। একটা আন্দোলনের মূল প্রেরণা ছিল গানটি। এ কারণেই কি কনসার্টের নাম ‘হোক কলরব’ দেওয়া?

অনেকেই ভাবে গানটা আমার লেখা। কিন্তু ‘হোক কলরব’ লিখেছেন রাজীব আশরাফ। আমি সুর করেছি, গেয়েছি। গানটা কখনো কোনো আন্দোলনের প্রেরণা হতে পারে, তা আমার ভাবনাতেও ছিল না। ‘হোক কলবর’ নিরীহ একটা গান। এতে অনেক অনেক প্রশ্ন তোলা হয়েছে—‘লাল না হয়ে নীল হলো ক্যান?’, ‘তাল না হয়ে তিল হলো ক্যান?’ যেমন বাচ্চারা অনেক কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করে। কিন্তু আমরা যত বড় হই, আমাদের প্রশ্ন কমতে থাকে, আমরা নির্বিকার হতে থাকি, সব চুপচাপ মেনে নিতে থাকি। এই যেমন এখন ঢাকার রাস্তা থেকে কুকুর সরিয়ে নিয়ে দূরে ফেলে আসা হচ্ছে। এ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছে না। কিন্তু তোলা উচিত। গানটা হয়তো অনেককেই প্রশ্ন তোলার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই হয়তো এটা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু আমরা ওর কথা ভেবে কনসার্টের এ নাম দিইনি।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে তো বেশ কয়েকটি অনলাইন কনসার্ট করলেন। কেমন অভিজ্ঞতা হলো? সরাসরি মঞ্চে গাওয়া মিস করেন?

তা তো অবশ্যই করি। মঞ্চের বিষয়টাই আলাদা। দর্শকের কাছে যাওয়া, কনসার্টের গমগম ভাবটা উপভোগ করা যায়। ভার্চ্যুয়াল কনসার্টে তো ‘লাইভ অডিয়েন্স’ নেই। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে গান গাইতে হয়। কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না, উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। কিন্তু আমরা এমন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যে অনলাইনে কনসার্টের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। এ ধরনের কনসার্টের একটা ভালো দিক হলো গানে থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই। খোলা মঞ্চে যেমন অনেক কারণেই মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে বলে মাঝেমধ্যে চোখ বন্ধ করে আমি গান করি। অনলাইনে মনোযোগ শুধু গানেই রাখা যায়।

লকডাউনের সময়ে গান নাকি ছবি আঁকা—কাকে বেশি সময় দিলেন?

দুটোই সমানতালে চলেছে। গত দেড়-দুই বছর আগে মনে হচ্ছিল, আমি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছি। নতুন কিছু করতে পারছিলাম না। ঢাকায় যখন ছিলাম, সবার থেকে আলাদা হয়ে একা সারা দিন স্টুডিওতে মেশিনের সঙ্গে সময় কাটাতাম। সিনেমার জন্য গান করতাম, জিঙ্গেল করতাম। কিন্তু নিজের জন্য নতুন কিছু করার আর সুযোগ পেতাম না। পরে যখন শান্তিনিকেতনে এলাম, আবার আমার শিক্ষক, স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেলাম, পুরোনো যোগাযোগগুলো ঝালাই হলো; তখন আবার নতুন করে নিজের জন্য ছবি আঁকা-গান করার তাগিদ পেলাম। নিজেকে আবার খুঁজে পেলাম।

default-image
বিজ্ঞাপন

ঢাকায় এত কাজের সুযোগ ছেড়ে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল না?

না। আমি নিজেই এর প্রয়োজন বোধ করছিলাম। বড় ক্যানভাসের পুরো চিত্র দেখার জন্য দূরে যাওয়ার দরকার। তা ছাড়া এখানে আসার পর দেখলাম, এভাবেও সচ্ছল থাকা যায়। এখান থেকে গানবাজনা করে কিছু প্রোডাকশন কোম্পানি থেকে টাকাপয়সা আসছে। ভালো থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, এখানে থেকেও তা পাচ্ছি। পাশাপাশি দিনে অন্তত দুই ঘণ্টার জন্য হলেও নিজেকে আনন্দ দেয় এমন কিছু করতে পারছি। এখানে এসে ছবি আঁকাটা ভালো হচ্ছে। আর দেখলাম, ছবি আঁকার সঙ্গে থাকলে অনেক নতুন কিছু করার আগ্রহ পাই।

আপনার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সবই শান্তিনিকেতন। ১৭ বছর সেখানে কাটানোর পর ঢাকায় ফিরে কি আপনি খাপ খাওয়াতে পারেননি? তাই আবার শান্তিনিকেতনে ফেরা?

না না, মোটেও নয়। এটা সত্য যে আমার জনপ্রিয় গানগুলোর ৭০ শতাংশই শান্তিনিকেতনে বসে লেখা, সুর করা। গানগুলো প্রসেস করেছি ঢাকায় ফিরে। ঢাকাই আমাকে অর্ণব বানিয়েছে। কিন্তু ঢাকায় সবার মধ্যে থেকে যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছিলাম। টিকে থাকার জন্য এমন অনেক কিছু করতে হচ্ছিল, যেখানে আমি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সব সময় একটা তাড়ার ভেতর থেকে গান আর হচ্ছিল না। তাই আবার শান্তিনিকেতনে ফেরা।

বিজ্ঞাপন
default-image

তাহলে গানের জন্য কি আপনি শান্তিনিকেতনেই থেকে যাবেন?

না। এখন আবার ঢাকায় ফেরার তাগিদ বোধ করছি। দেশের শ্রোতাদের জন্য আবার ঢাকায় ফিরে কাজ করতে চাই। খেয়াল করে দেখলাম, গত চার-পাঁচ বছর অনেক আলসেমি করে ফেলেছি। সবকিছুতেই ব্যালান্স খুব দরকার। তাই শান্তিনিকেতনে বেশি বেশি নিভৃতে থাকাও ভালো হবে না। দেশে ফেরা লাগবে। ফিরে একটা লক্ষ্য ধরে এগোতে হবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

আপনার জীবনে তো এমন সময়ও দেখেছেন, যখন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেছিলেন। মাদকের নেশার সঙ্গে লড়াই করে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন। সেই ফিরে আসার গল্পটা শুনতে চাই।

২০০১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে আমি উপলব্ধি করতে শুরু করলাম যে আমাকে মাদকের নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অনেক হয়েছে, আর নয়। তখন তো বয়স অনেক কম। সমবয়সীদের দেখতাম এসব করছে, তাই আমিও অনেক আগে থেকে ওসবে জড়িয়ে গেছিলাম। ২০০৩ সালে মাস্টার্স শেষ করার পর বুঝতে পারলাম, মাদকাসক্তিটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তখন আমার বন্ধু, আমার পরিবার আমাকে খুব সাহায্য করল। আনুশেহর (আনাদিল) কথা না বললেই নয়। ওই সময় আনুশেহ আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। ওর নিজেরও একটা লড়াই আছে, যেটা খুব অনুপ্রেরণাদায়ক। আসলে অ্যাডিকশনের সঙ্গে লড়াইয়ের কোনো শেষ নেই। এটা একটা চলমান সংগ্রাম। আমি ২০ বছর ধরে এ লড়াই করে যাচ্ছি। ভালো থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সময়ে সময়ে পরিবার, বন্ধু আর প্রফেশনালদের সাহায্য নিয়েছি। তবে আমি এ বিষয়ে বেশি বেশি বলে তরুণদের ভুল বার্তা দিতে চাই না। আমি চাই তাঁদের অনুপ্রাণিত করতে। আমার মাদকাসক্তির লড়াই নিয়ে বলতে আমি কখনো লজ্জা বা সংকোচ বোধ করিনি; বরং এ কথা শুনে কোনো একজন যদি মাদকের ভয়ংকর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, সব সময় এই চাওয়া থেকেই কথা বলে গেছি।

মন্তব্য পড়ুন 0