default-image
>

ঈদ সামনে রেখে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছিলেন আফজাল হোসেন। এর মধ্যে কালজয়ী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে ডকু ফিকশন ‘মানিকের লাল কাঁকড়া’–এর শুটিং করার কথাও ছিল। হঠাৎ করে করোনাভাইরাস সংক্রমণে সবকিছু থেমে গেছে। ফোনে কথা হলো তাঁর সঙ্গে।

‘মানিকের লাল কাঁকড়ার’ কাজ তো শেষ করতে পারেননি...
শহরের অংশের কাজ প্রায় শেষ। গ্রামের অংশের লোকেশন দেখাদেখি চলছিল। পরিস্থিতির জন্য সব গুটিয়ে ফেলতে হলো।

করোনা সংক্রমণের এই সময়টায় কতটা সতর্ক আপনি?
যতটুকু সম্ভব সতর্ক থাকার চেষ্টা করছি পুরো পরিবার মিলে। বাসা থেকে শুধু নয়, আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং থেকে অতি জরুরি দরকার ছাড়া কেউই বের হচ্ছেন না। কোনো অতিথিও আসবেন না আশা করে প্রবেশ দরজায় তালা মেরে রাখা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুরো প্রাঙ্গণ যেন পরিষ্কার রাখা হয়। দরজার হাতল, সিঁড়ি, লিফট দিনে বেশ কয়েকবার দূষণমুক্ত রাখা হচ্ছে। বাসার ভেতরে আমরা অল্পসংখ্যক মানুষ, তবু সচেতনভাবে পরস্পর থেকে দূরত্ব বজায় রাখছি। দিনে কতবার যে হাত ধোয়া হয় হিসাব করা হয় না।

default-image


সময়টা কাটছে কীভাবে?
সময়টা আলস্যে ঘরে শুয়ে-বসে কাটানোর নয়। কেউই মনে করছে না অবসর বা ছুটি চলছে। প্রথম কয়েকটা দিন মন দিয়ে ছবি এঁকেছি। তারপর বন্দী থাকার অনুভব অস্থিরতা এনে দিয়েছে। কোনো কিছু খুব মনোযোগ দিয়ে করা যাচ্ছে না। পড়া, ছবি আঁকা, লেখালেখি, সিনেমা দেখা, গান শোনা, যখন যেটা করতে ভালো লাগছে করছি। হঠাৎ মনে হলো, ঘর এলোমেলো লাগছে, ব্যস দেখা গেল তাতেই ব্যস্ত হয়ে গেলাম। এর মধ্যে একদিন মনে হলো এত দিনের সংসার, যে বাসায় বসবাস করি তার অনেক কিছু কখনোই মনোযোগ দিয়ে দেখা হয়ে ওঠেনি।

অনুমান করা যায় আরও লম্বা সময় এভাবে কাটাতে হতে পারে। পরিকল্পনা কী?
মনকে এখন পরিকল্পনা দিয়ে বাঁধার যাবে না বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তেমন নয়। বলেছি, অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা চলছে। গড়িয়ে যাচ্ছে দিন। কোনো কিছু পুরো মনোযোগ দিয়ে করা যাচ্ছে না।

default-image


এই অস্থিরতা বিষয়ে নিজের ব্যাখ্যা
অস্বাভাবিকতার চাপ। বুকভরে শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। বহু মানুষ এখনো গায়ে মাখছে না। যতটা গুরুত্ব দেওয়া কর্তব্য ততটা করছে না। অজ্ঞানতার কারণে বিপজ্জনক আচরণ করে চলেছে। কী হতে চলেছে জানা নেই। কত দিন এমন কাটাতে হবে, ধরে নেওয়া যাক সংকট কেটে গেল—সবকিছু সহজে মিটে যাবে না। এই দুঃসময়ের জের এক এক জীবনের ওপর একেক রকমের দুর্ভোগ এনে দেবে।

এভাবে ভাবছেন?
আমার যখন প্রথম স্টেট পরানো হয়, তখন ঠাট্টাচ্ছলে কেউ একজন বলেছিল, তোমার জন্য যা বরাদ্দ আছে, সেটা যদি রয়ে সয়ে ভোগ না করো, তাহলে সেটার ফল তো ভোগ করতেই হবে। হিসেব ছাড়া তো কোনো কিছু নাই। শৈশবে আমার অঙ্ক কষার কথা মনে হলেই মাথা ধরত। ছবি আঁকতে পারতাম। ছবি আঁকতে ভালোও লাগত। শিল্পী হওয়ার জন্য আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছি সেটা ঠিক না। আমি আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছি অঙ্কের ভয়ে। ভাবছিলাম, এই সাবজেক্টে ভর্তি হলে অঙ্ক থেকে পালানো যাবে। আর কখনোই অঙ্ক কষতে হবে না। পরে দেখলাম, জীবনের কোনো বিষয় আসলে অঙ্ক ছাড়া নেই। কথা যে বলি, সেখানেও অঙ্ক লাগে। লিখি যে সেখানেও অঙ্ক লাগে। আঁকাআঁকিতেও অঙ্ক লাগে। আমাদের আচার-ব্যবহার খাওয়া–পরা, সবকিছুতে অঙ্ক লাগে। কোনো কিছুই অঙ্ক ছাড়া নেই।

default-image


একজন শিল্পী হিসেবে করোনাভাইরাসের এই সময়টায় আপনার আহ্বান কী?
আমি দেশটা নিয়ে খুব ভাবছি। নিজের দেশটা একমাত্র বাঁচতে পারি যদি সবাই সজ্ঞানে থাকি, সাবধানতা ও সচেতনতায় থাকি।

করোনা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি?
করোনার এই সময়টায় আমি লিখেছি—প্রভাব, প্রতিপত্তি, দাপট এগুলো আসলে কিছু না। আমরা হয়তো উপভোগ করি—এগুলো যে আসলে কিছু, করোনা আমাদের তা উপলব্ধি করিয়েছে। এটা কি ঠিক নয় যে মানুষের যত প্রয়োজন বাড়ছে, চাহিদা বাড়ছে—মানুষ তত বেশি অসচেতন হচ্ছে, সবকিছুর সঙ্গে আপস করছে। আমি জীবনকে এভাবে কখনো দেখিনি। দেখতামও না। শুধু জীবন না, জীবনে জড়িয়ে অনেক ক্ষুদ্র বিষয়কেও বড় করে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যা কিছু অনেক বড় হয়েছিল, তা যে অতিশয় ক্ষুদ্র সেই উপলব্ধি হয়েছে। বাঁচার জন্য আমরা সবাই দৌড়াতাম না, সেই দৌড় তো এখন কেউ দৌড়াচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0