বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফরাসি পরিচালক ফ্রঁসোয়া ক্রফোর বিচারে বেলমন্দো তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ইউরোপীয় অভিনেতা। অথচ প্রচলিত নায়ক বললেই আমাদের চোখে যে ধরনের মুখ ভেসে ওঠে, তার একেবারে বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে বেলমন্দোর মুখ। ব্রেথলেস দেখে টাইম ম্যাগাজিনে বজলি ক্রাউদার অভিনেতা বেলমন্দো সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘মোহিনী ধরনের কুৎসিত চেহারার নয়া তরুণ’। ভাঙা নাক, ভরাট ঠোঁট, রুক্ষ মুখমণ্ডল—এক কথায় মূর্তিমান এক অ্যান্টিহিরো। তারপরেও এই রূপেই তিনি হয়ে ওঠেন তাঁর কালের ইউরোপের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ।

default-image

আর কোনো ছবি তাঁর এই রূপকে অতটা যথার্থভাবে তুলে ধরতে পারেনি, যতটা পেরেছে ব্রেথলেস। অথচ চরিত্রটা বিষয়ে গদারের নির্দেশনা ছিল, যাকে বলে মিনিমালিস্ট। পরে এক সাক্ষাৎকারে বেলমন্দো বলেন, ছোট ছোট তিনটা পাতা আমাকে দিয়েছিল গদার। তাতে লেখা ‘সে মার্সেই ছেড়ে যায়। সে একটা গাড়ি চুরি করে। মেয়েটাকে আবার সে বিছানায় নিতে চায়, কিন্তু মেয়েটা চায় না। শেষে হয় সে মরবে অথবা চলে যাবে—ঠিক করতে হবে।’ বেলমন্দোকে চরিত্রটা নিয়ে ইচ্ছাস্বাধীন খেলার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন গদার। পুরো চরিত্রটাই ইমপ্রোভাইজেশনের ওপর গড়ে তোলেন। আর এই ধরনটাই ছিল তাঁর পছন্দ, ‘সবকিছু আমাকে আগেভাগেই বলে দিলে কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে যাই।’

১৯৩৩ সালের ৯ এপ্রিল প্যারিসের শহরতলি নিউলি-সুর-সিনে ফরাসি ভাস্কর পল বেলমন্দো ও শিল্পী সারাহ রেনু–রিচার্ডের ঘরে জন্ম নেন বেলমন্দো। পড়াশোনার থেকে খেলাধুলাতেই মনোযোগ ছিল বেশি।

default-image

হাইস্কুলে থাকতেই পড়াশোনা শিকেয় ওঠে, অপেশাদার বক্সিংয়ে নাম লেখান, কিন্তু অচিরেই বুঝতে পারলেন, খেলোয়াড়ি জীবন গড়ার জন্য যে ধরণের শৃঙ্খলা দরকার, তা তাঁর নেই। ঠিক করলেন, নাটকের স্কুলে ভর্তি হবেন। কারণ বক্সিংয়ের মতো নাটকেও দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। ’৫৬ সালে ন্যাশনাল কনজারভেটরি অব ড্রামাটিক আর্টসে থেকে স্নাতক করেন। কিছুদিন আঞ্চলিক থিয়েটার করার পর চলচ্চিত্রে ছোটখাটো রোলে কাজ করতে থাকেন। এ সময়ই স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি শার্লট অ্যান্ড হার বয়ফ্রেন্ডস করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে গদারের সঙ্গে পরিচয়। সেই ছবি আর বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায়নি, তার আগেই তহবিল জোগাড় হয়ে যাওয়ায় ব্রেথলেস–এর কাজ শুরু হয়ে যায়। গদারের বয়স তখন ২৮ বছর, আর বেলমন্দোর ২৬। বাকিটা ইতিহাস।

ছয় দশকের ক্যারিয়ারে ৯০টার মতো ছবিতে কাজ করেছেন বেলমন্দো। তাঁর প্রজন্মের ফরাসি পরিচালকদের অধিকাংশের সঙ্গেই কাজ করেছেন। জঁ–পিয়ের মেলভিল, অ্যালা রেনে, লুই মাল, ফ্রঁসোয়া ক্রফো, জঁ লুক গদার, ক্লদ শ্যাব্রল, ক্লদ লেলুশ—কত নাম বলব? ক্যাথরিন দেন্যুভ, সোফিয়া লরেন, ক্লডিয়া কার্ডিনেল, আনা কারিনা, উরসুলা আন্দ্রেজ—এঁরা ছিলেন তাঁর নায়িকা।

default-image

রুক্ষসুক্ষ সমাজবিচ্ছিন্ন অপরাধী ধরনের চরিত্রে হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে টাইপকাস্ট হয়ে থাকতে চাননি বেলমন্দো। জঁ–পিয়ের মেলভিলের লিও মরি, প্রিস্ট ছবিতে এক যাজক চরিত্রে অভিনয় তাঁর অন্যতম সেরা কাজ। ভিত্তরিও ডে সিকার টু ওম্যানে তিনি আদর্শবাদী এক বুদ্ধিজীবী। কমিক রোলও পছন্দ করতেন। আ ওম্যান ইজ আ ওম্যান, দ্যাট ম্যান ফ্রম রিও এই ধারারই কাজ। ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ করা শুরু করেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা সেরিটো।

default-image

দুবার বিয়ে করেছিলেন বেলমন্দো। দুবারই বিচ্ছেদ হয়ে যায়। জেমস বন্ডখ্যাত উরসুলা আন্দ্রেজ আর সত্তর দশকে ইতালীয় অভিনেত্রী লরা আন্তনেলির সঙ্গে দীর্ঘকাল সম্পর্ক ছিল। তাঁর এক ছেলে, দুই মেয়ে।
২০১৬ সালে সারা জীবনের কাজের জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব তাঁকে স্বর্ণ ভালুক প্রদান করে।

হলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন