default-image

ইনবক্সে একটা দাওয়াত আসে। ‘দাওয়াত’ নামে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা দেখার দাওয়াত। মেয়েটা প্রথমবারের মতো দেশে আসবে। বাবা কিছুটা উচ্ছ্বসিত, অনেকটাই গর্বিত। বন্ধু ও নিকট আত্মীয়দের ইনবক্সে জানিয়েছেন সে কথা। আগাম দাওয়াত দিয়ে রেখেছেন, মেয়ের বানানো প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাটা যেন সময় করে দেখে আসেন তারা।

উৎসুক বাবা কিংবা অপেক্ষারত মেয়ের মনের আশা পূরণ হয়নি। করোনা কত কী আটকে দিচ্ছে, আর এ তো এক তরুণ বিদেশিনীর বাবার দেশে বেড়াতে আসার স্বপ্ন! কতবার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে আসা হয়নি সুস্বনা চৌধুরীর। নতুন বছরে বাংলাদেশে হয়ে গেল একটা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। তাঁর প্রযোজিত সিনেমার সঙ্গে তিনিও বেড়াতে আসবেন বাংলাদেশে, হলো না। নিঃসঙ্গ বাবা শাহবাগের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে বসে উপভোগ করলেন মেয়ের বানানো স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা। সংক্রমণ সতর্কতায় একটি করে আসন ফাঁকা রেখে বসেছিলেন সবাই। তবে সুস্বনা এলে অবশ্যই বাবার পাশে বসতেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

সুস্বনার জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানেই বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। মা-বাবা পুরোপুরি বাঙালি হলেও তিনি আমেরিকান-বাঙালি। ঘরের বাইরে, স্কুল-কলেজে আমেরিকান সংস্কৃতি, ঘরের মধ্যে কিছুটা আমেরিকান, কিছুটা বাঙালিপনা। এটা হয়তো সব প্রবাসী বাঙালির অন্দরের কাহিনি। গত ২২ জানুয়ারি বিকেলে ১৯তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নারী নির্মাতাদের প্রদর্শনীতে ছিল সুস্বানা প্রযোজিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ‘দাওয়াত’। যৌথভাবে ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন পুষ্পল ইসলাম ও সুস্বনা চৌধুরী। ছবিতে অভিনয় করেছেন সীতা সরকার, শিরিন বকুল, নাফিউল বারি, রেশমা চৌধুরী প্রমুখ। ছবিটি পরিচালনা করেছেন জুহি শর্মা। পরিবারের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে নিজের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে নানা বাধা অতিক্রম করতে হয় ‘দাওয়াত’-এর সীতাকে। একটি প্রবাসী বাঙালি পরিবারে নৈশভোজের দাওয়াত ঘিরে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির গল্প। মা-মেয়ে দুই প্রজন্মের দূরত্বের সংকট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেখানে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোয়ালিশন অব সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং হোম ইজ ডিসট্যান্ট শোরস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটির প্রদর্শনী হয়েছে।

ছবির গল্পের সীতা সৃজনশীলতার চর্চা করতে চায়। সিনেমা ও সাহিত্য নিয়ে পড়তে চায়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করতে যাওয়া তার মা চান অন্য কিছু। বাড়িতে মাংস রান্না করতে করতে মা সীতাকে বলেন একটা নিরাপদ চাকরি পেতে হলে তাকে অর্থনীতি নিয়ে পড়তে হবে। কিন্তু মেয়ের মন পড়ে থাকে সিনেমা, আর্ট-কালচারে। সীতাদের বাড়িতে দাওয়াত খেতে আসা প্রবাসী বাঙালিরা পোলাও-গরুর মাংস খেতে খেতে আলাপ করেন সীতার ভবিষ্যৎ নিয়ে। সীতার এক ছেলেবন্ধুর সঙ্গে অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দেন তার মা। গর্বের সঙ্গে জানান, ‘ও কিন্তু সিলেটি। আর সীতা ইকোনমিকসে পড়া শেষ করলেই পেয়ে যাবে একটা সিকিউর চাকরি।’

default-image

‘সীতা’ প্রবাসী বাঙালি মা-বাবার অগ্নিপরীক্ষায় অঙ্গার হওয়া সন্তানের প্রতিনিধি। সিলেটি বর, নিরাপদ চাকরি যার পিছু ছাড়েনি বংশপরম্পরায় এমনকি প্রবাসেও। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের আকাঙ্ক্ষার চাপ সীতাদের সইতে হচ্ছে মার্কিন মুলুকেও। নির্মিত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্যে সেই ছবিটাই ধরে রেখেছেন সুস্বনা।

শিক্ষার্থী সুস্বনার সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছিল মেজর। মাইনর ছিল দর্শন ও নিউ মিডিয়া আর্ট। ওপরের ক্লাসে উঠতে উঠতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, সাংবাদিকতাই করবেন, তবে প্রিন্ট থেকে বেশি মনোযোগ দেবেন ভিডিওর দিকে। তিনি বলেন, ‘একজন নৃত্যশিল্পী ও থিয়েটারপ্রেমী হিসেবে আমি সব সময়ই ভিজ্যুয়াল আর্টের প্রতি দুর্বল ছিলাম। হাইস্কুলে মিডিয়া স্টাডিজ নিয়ে পড়তে গিয়ে বুঝতে পারি আমাদের সমাজের ওপর ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার বেশ প্রভাব রয়েছে। আমরা তো দেখেই শিখি।’ এমনকি সাংবাদিকতা ও নিউ মিডিয়া আর্টসের ক্লাসে ভিডিওর ওপর তাঁদের শিক্ষকেরাও বেশ জোর দিচ্ছিলেন। সুস্বনা এসবের সঙ্গে জুড়ে নেন একটা চিত্রনাট্য লেখার কোর্স। ব্যস, নির্মাতা হিসেবে যা যা দরকার, সেই পড়াশোনার একটা প্যাকেট নিজেই বানিয়ে ফেলেন। একসময় লিখে ফেলেন নিজের প্রথম সিনেমার চিত্রনাট্য। তিনি বলেন, ‘ভিজ্যুয়াল নিয়ে কাজ করলেও আমি সাংবাদিকতার মূলনীতি থেকে সরে আসিনি। হরফ দিয়ে যা লেখা হয়, সেটাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি ভিডিওতেও।’

বিজ্ঞাপন
default-image

এই গল্প কি সুস্বনার জীবনেরই গল্প? তিনি জানান, পুরোটাই নয়। বাবা-মা তাকে নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে ও এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু তাঁদেরও তীব্র প্রত্যাশা ছিল, তাঁদের মেয়ে যেন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অর্জন করে। কিন্তু আমেরিকান-বাঙালি পরিবারগুলোর বাবা-মায়েদের সার্বিক প্রত্যাশা নিয়েই স্বল্পদৈর্ঘ্যের গল্প।

সুস্বনাদের পরিবার সৃজনশীলতার চর্চা করে আসছেন অনেককাল ধরে। কবিতা, লেখালেখি, সংগীত, নৃত্য, চলচ্চিত্র তাঁদের রক্তে মিশে আছে। মা পারভিন সুলতানা নিউইয়র্কে গিয়েও আবৃত্তিচর্চা চালিয়ে গেছেন অনেক দিন। বাবা রওশন জামিল চৌধুরী মেয়ের জন্মের আগে থেকেই লেখক হিসেবে খ্যাতিমান। ঢাকার ঠাটারীবাজারে থাকতেন সুস্বনার বাবা, মা ও ভাই। তাঁর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। অনেক আত্মীয় এখনো ঢাকায়, বাংলাদেশে থাকেন, যাঁদের কেবল ভিডিও কলেই দেখেছেন সুস্বানা। ইচ্ছে আছে, একদিন বাংলাদেশে এলে তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখাও হবে। রাজধানীতে, যেখানে বাবা বেড়ে উঠেছেন, সেই জায়গাটা দেখার বড্ড ইচ্ছে তাঁর। রাজশাহীতে, যেখানে মা বড় হয়েছেন, মামারা এখনো থাকেন, সেখানেও বেড়াতে যেতে মন চায় সুস্বনার। মামার বাড়ির আমগাছের আম পেড়ে খেতে ইচ্ছে করে।

ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ব্যাপারে ভীষণ সজাগ ও সচেতন সুস্বনা। এসব পেতে কতটা হারাতে হয়েছে, সে ব্যাপারেও জানা আছে তাঁর। এই ভাষা ও সংস্কৃতিকে তিনি হারাতে দেবেন না। বরং এগিয়ে নিতে যা যা করা দরকার, করবেন। সে কারণেই নিজের প্রথম কাজটি বাংলা ভাষায় করেছেন। একসময় পরিচালনাও করবেন।

default-image
হলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন