নানা রূপে গ্রেগরি পেক
নানা রূপে গ্রেগরি পেক কোলাজ: আমিনুল ইসলাম

৫ এপ্রিল ১৯১৬ সালের এই দিনে জন্মেছিলেন বিশ্বের সেরা অভিনেতাদের একজন, গ্রেগরি পেক, যিনি অভিনয় কেবল শিল্প আর মেধার খাতিরে করেননি, করেছেন মানবিক জায়গা থেকে, সমাজের মঙ্গলের জন্য। বড় পর্দায় তিনি সেই সব চরিত্র হয়ে উঠেছেন, যেগুলো দেখে একজন দর্শক ভেতর থেকে আরও ভালো মানুষ হয়ে উঠতে চান। যে চরিত্রগুলো মানুষকে আরও মানবিক হতে বলে।

৬ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার গ্রেগরি পেক তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ, বাগভঙ্গিমা আর ব্যক্তিত্বের জোরে জয় করে নিয়েছিলেন দর্শকের মন। হলিউড এ পর্যন্ত যত শিল্পী উপহার দিয়েছে, তার ভেতর গ্রেগরি পেক নামটি জ্বলজ্বল করবে শীর্ষ তালিকায়। আজ তাঁর ১১৫তম জন্মদিনে জেনে নেওয়া যাক অসাধারণ এই মানুষটা সম্পর্কে।

default-image


সান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটি আর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ১৯৪১ সালে ২৫ বছরের তরুণ গ্রেগরি পেক শুরু করেন অভিনয়। তিন বছরের মাথায় দেখা হয় সফলতার সঙ্গে। ‘দ্য কিস অব দ্য কিংডম’ (১৯৪৪) সিনেমায় অভিনয় করে তিনি পেলেন অস্কারে সেরা অভিনেতার মনোনয়ন। এরপর ‘ভ্যালি অব ডিসিশন’, আলফ্রেড হিচককের পরিচালনায় ‘স্পেলবাউন্ড’, ‘দ্য ইয়ারলিং’, ‘প্যারাডাইন কেইজ’, ‘গ্রেট সিনার’, ‘ক্যাপ্টেন হোরাশিও হর্নব্লোয়ার’, ‘ডেভিড অ্যান্ড বৎশেবা’, ‘দ্য স্নোজ অব কিলিমানজারো’—এগুলো কেবল সিনেমা নয়, গ্রেগরি পেককে সেরাদের সেরা বানানোর একেকটি সোপান।

default-image

১৯৫৩ সালে রুপালি পর্দায় মুক্তি পেল সর্বকালের সেরা সিনেমাগুলোর একটি, ‘রোমান হলিডে’। এই সিনেমা আর অড্রে গ্রেগরি পেকের জীবনের একটা বড় অধ্যায়। সেই রাজকুমারী আর সাংবাদিকের এক দিনের প্রেম এখনো বিশ্বের সেরা প্রেমের গল্পগুলোর একটি। রাজকুমারী অ্যানরূপে অড্রে হেপবার্নের সঙ্গে গ্রেগরি পেকের বদলে অন্য কেউ থাকলে সিনেমাটা কি এতটা আইকনিক হয়ে উঠতে পারত?

বিজ্ঞাপন

‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ সিনেমার জন্য তিনি হাতে তোলেন প্রথম অস্কার। এই ছবি পেকের নিজের অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দের। কিন্তু এই ছবির জন্য পেক অস্কার পাবেন, তা ভাবেননি। অ্যাটিকাস ফিঞ্চ নামের এক আইনজীবীর চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছিলেন পেক। দ্বিতীয় অস্কারটি ছুঁয়ে দেখেন এর পাঁচ বছর পর, ১৯৬৮ সালে। তবে এবার কোনো সিনেমার জন্য নয়, বরং মানবিক ক্ষেত্রে সিনেমা ব্যক্তিত্ব হয়ে অসাধারণ অবদানের জন্য। ১৯৫৭ সাল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। একাডেমি কর্তৃপক্ষ এই পুরস্কারের নাম দিয়েছে ‘জেন হারসল্ট হিউম্যানিটেরিয়েন অ্যাওয়ার্ড’। তাই সিনেমায় অভিনয় আর মানবিক কাজ—দুই ক্ষেত্রেই অস্কার আছে পেকের। এর আগেও আরও চারবার—‘দ্য কিস অব দ্য কিংডম’ (১৯৪৫), ‘দ্য ইয়ারলিং’ (১৯৪৬), ‘জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্ট’ (১৯৪৭) আর ‘টোয়েলভ ও’ক্লক’ (১৯৪৯) ছবিগুলোর জন্যও অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলোর জন্য হাতে আসেনি পুরস্কার।

default-image

গ্রেগরি পেক বিশ্বচলচ্চিত্রকে দিয়েছেন ‘রোমান হলিডে’, আর রোমান হলিডে গ্রেগরি পেককে দিয়েছে গোল্ডেন গ্লোবের মঞ্চে সেরা অভিনেতার পুরস্কার। গ্রেগরি পেক ‘রোমান হলিডে’র আগে ১৮টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ফেলেছিলেন, এর মধ্যে চারটিতে তিনি অস্কার মনোনয়নও পান। অন্যদিকে অড্রে হেপবার্ন ছিলেন হলিউডে প্রায় নতুন। গ্রেগরি পেকের চুক্তিপত্রে উল্লেখ ছিল, ছবির নামের আগে তাঁর নামটি বড় করে থাকবে। কিন্তু কিছুদিন শুটিং করার পরই গ্রেগরি নিজের এজেন্টকে ডেকে বলেন, তাঁর নামের সঙ্গে অড্রের নামটিও বড় করে রাখতে হবে। এজেন্ট অবাক! গ্রেগরি বললেন, ‘এই মেয়ে তাঁর প্রথম ছবিতে অস্কার পেতে যাচ্ছে।’ আর গ্রেগরি পেকের সেই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল।

default-image


গ্রেগরির জীবনে ঘটেছে বেশ কিছু মজার ঘটনা। তাঁর মধ্যে সম্ভবত এটিই সেরা। গ্রেগরি পেক ‘রোমান হলিডে’ ছবির শুটিংয়ের ঠিক কিছুদিন আগে দেখা পান তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ভেরোনিক পাসানির। মজার ব্যাপার হলো, সাংবাদিক হিসেবে ভেরোনিক গিয়েছিলেন গ্রেগরি পেকের সাক্ষাৎকার নিতে। আর ‘রোমান হলিডে’তে পেকের চরিত্র ছিল একজন সাংবাদিকের। তখন থেকেই দুজনের পরিচয় আর ভালো লাগা। সিনেমা মুক্তির বছর দুয়েকের মধ্যেই বিয়ে করে নেন এই জুটি। এদিকে এই সিনেমার পর থেকে অড্রে আর গ্রেগরি জুটিকে বড় পর্দার সেরা রোমান্টিক জুটিদের একটা মানা হয়। সিনেমার সেট থেকে শুরু হয়ে এই দুজনের বন্ধুত্ব ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

default-image

অড্রেকে খুব পছন্দ করতেন পেক। সেই সম্পর্ককে মিডিয়ার কেউ কেউ বলেছিল ‘প্রেম’। আবার কেউবা লিখেছিল ‘প্রেমের চেয়ে বড় কিছু’। ১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি না-ফেরার দেশে চলে যান অড্রে। ‘রাজকুমারী অ্যানে’র শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন ‘সাংবাদিক জো’। অড্রে হেপবার্নের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জনসমক্ষে গ্রেগরি আবৃত্তি করেছিলেন অড্রের প্রিয় কবিতা। ‘আই সিম টু হ্যাভ লাভড ইউ ইন নাম্বারলেস ফর্মস, নাম্বারলেস টাইমস.../ ইন লাইফ আফটার লাইফ, ইন অ্যাজ আফটার এজ, ফরএভার।’ এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, ‘অনন্ত প্রেম’, যার প্রথম দুই পঙ্‌ক্তি, ‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি/ শত রূপে শতবার, জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।’

‘রোমান হলিডে’র পরও গ্রেগরি পেক ‘স্নোজ অব কিলিমানজারো’, ‘দ্য গানস অব নাভারন’, ‘দ্য উইমেন’, ‘দ্য বয়েজ ফ্রম ব্রাজিল’ সিনেমাগুলোকে বিশ্বসেরা সিনেমার খাতায় নাম লিখিয়েছেন। ‘টুয়েলভ ও’ক্লক হাই’ সিনেমায় পেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ট্রমায় কাতর এক যোদ্ধার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেন। ‘দ্য স্কারলেট অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক’ সিনেমায় তিনি ক্রিস্টোফার প্লামারের সঙ্গে ভাগ করেন রুপালি পর্দা। এখানে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন ধর্মযাজকের ভূমিকায় দেখা দেন, যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার যুদ্ধবন্দী আর ইহুদিকে বাঁচিয়েছিল।

default-image

হলিউডের বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ থেকে ষাটের দশকের সেরা সিনেমাগুলোর বেশ কয়েকটা সেরা হয়ে উঠেছে গ্রেগরি পেকের অভিনয়ে। তাই ১৯৯৯ সালে মার্কিন ফিল্ম ইনস্টিটিউট ‘ক্ল্যাসিক হলিউড সিনেমা’র সর্বকালের সেরা ২৫ নায়কের তলিকার ১২ নম্বরে না রেখে পারেনি। অভিনয় আর রাজনীতি দুহাতে করেছেন গ্রেগরি। আমেরিকার ৩৬তম প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন আর ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনো—দুজনেই রাজনীতিতে জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য সম্মানিত করেন এই অভিনেতাকে।

default-image

২০০৩ সালের ১২ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাড়িতে ব্রঙ্কোনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ঘুমের মধ্যেই শেষবারের মতো শ্বাস নেন তিনি। স্ত্রী ভেরোনিক সে সময় পাশেই ঘুমিয়ে ছিলেন। তাই বলে চলে যাওয়া মানেই কি প্রস্থান? তা নয়। তাই তো আজও তিনি জীবিত। তাই তো ‘রাজকুমারীরা’ আজও সাংবাদিকের প্রেমে পড়ে। আর আশপাশের কেউ কিচ্ছুটি টের পায় না। তাই তো আজ জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে পেকের হাসিমুখের ছবি। প্রোফাইল পিকচার, কভার ফটো বদলে যাচ্ছে গ্রেগরি পেকে। হলিউড উদযাপন করছে তাঁর জন্মকে, যে হলিউডের একজন গ্রেগরি পেক ছিলেন।

বিজ্ঞাপন
হলিউড থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন