স্মরণে জ্যাকসন

একজন সম্রাটের গল্প

বিজ্ঞাপন
default-image

শুধু গিটার বাজিয়ে তো আর সংসার চলে না। টানাপোড়েনের দিনে ক্রেন অপারেটরের কাজও নিতে হয়েছে জোসেফকে। স্ত্রী ক্যাথরিনও দুই পয়সা আয়ের জন্য ক্ল্যারিনেট আর পিয়ানো বাজান। দুই কক্ষের ছোট্ট বাড়িতে ছেলেপেলে অনেক। এদেরকে কাজে লাগিয়ে দিলে খরচ উঠে যায়! এরাও গান-বাজনা আয়ত্তে এনে গানের দল গঠন করে ফেলল। কিশোর বয়সী পাঁচ ভাই মিলে দলের নাম দিল ‘জ্যাকসন ফাইভ’। ষাটের দশকে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে জ্যাকসন পরিবারের এই দল। তবে দর্শক-শ্রোতার মন কেড়ে নেয় সবচেয়ে ছোট সদস্য মাইকেল। অথচ কঠোর পিতা চাননি মাইকেল গান করুক। ভাইয়েরা জোর করে বাবাকে মাইকেলের গান শুনতে বলে। শোনার পর বাবা আর না করতে পারেননি। দল থেকে বের হয়ে মাইকেল শুরু করেন তাঁর একক ক্যারিয়ার। ধীরে ধীরে সংগীতের দুনিয়ায় নিজেকে নিয়ে যান জনপ্রিয়তার শীর্ষে। পপ, রক, ব্লুজের মিশেলে তৈরি করেন গানের এক অন্য জগৎ। সঙ্গে যোগ করেন নিজের অনন্য নাচ। বিশ্বের কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে বনে যান পপসম্রাট। হ্যাঁ, তিনি সেই মাইকেল জ্যাকসন, যিনি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে মারা যান পঞ্চাশ বছর বয়সে।

সেদিন ছিল ২৫ জুন। ঠিক এই মাসটাই। সাল ২০০৯। অতিরিক্ত প্রপোফল সেবনে মৃত্যু হয় পপসম্রাটের। কিছুতেই ঘুমাতে পারছিলেন না বলে চিকিৎসককে একরকম জোর করেই ওষুধ দিতে বলেন। তারপর সেই যে ঘুমালেন আর জাগলেন না।

প্রথম যেদিন পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছিলেন মাইকেল, সেদিনটা ছিল ২৯ আগস্ট, ১৯৫৮। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানার গ্যারিতে এক কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে জন্ম নেন তিনি। গায়ের রংটা কালোই ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কী যে এক বদখত ত্বকের রোগ দেখা দিল তাঁর। চামড়ার রং সাদা হতে শুরু করে। ট্যাবলয়েডগুলো ছাপতে থাকে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নাকি তিনি ফরসা হতে চেয়েছেন। কিন্তু এসব খবরে খুব দুঃখ পান মাইকেল। এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি শুধু নাকের সার্জারি করিয়েছিলেন, ত্বকের না। এটা ছিল তাঁর ত্বকের রোগ। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ রোদে গেলে কালো হয়ে যায়। আর আমার হয় ঠিক তার উল্টো। কই তখন তো অন্যদের কেউ জিজ্ঞেস করে না তাঁরা কেন কালো হয়েছে। এটা আমার রোগ। আমি কিছুই করতে পারব না।’ চামড়ার রঙের অস্বাভাবিক তারতম্যের জন্য তিনি ভারী মেকআপ ব্যবহার করতেন সব সময়। তবে একটা সময় নিজের চেহারা নিয়ে খুব মন খারাপ হতো তাঁর। কৈশোরে বাবা তাঁকে ‘কুৎসিত’ বলতেন। চেহারায় অনেক ব্রণ হতো। নিজের মুখটা আয়নায় দেখতে ভয় পেতেন। একবার এক নারী ভক্ত জ্যাকসন ফাইভকে দেখে ছোট্ট মাইকেলকে খুঁজছিলেন। কিন্তু তাঁকে দেখে খুব হতাশ হলেন। লজ্জায় মাইকেলের তখন কোথাও পালিয়ে যেতে মন চাইছিল। বাবা যে শুধু মাইকেলকে এসব নিয়ে ত্যক্ত করতেন তা নয়, পরিবারের সবাইকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখতেন জোসেফ জ্যাকসন। বাচ্চাগুলোকে ধরতে পারলে খুব পেটাতেন। কোনোরকম ভুল করা যেত না কোনো কাজে। দশ ভাইবোনের মধ্যে মাইকেল ছিলেন অষ্টম। ছোট বলে রেহাই মিলত না তাঁর। এসব ঘটনা মাইকেলকে দুঃখ দিলেও বাবাকে অনেক ভালোবাসতেন তিনি।

হয়তো শৈশব সুখের হয়নি বলেই নিজের প্রাসাদতুল্য বাড়ি ‘নেভারল্যান্ড’-এ শিশুদের জন্য তৈরি করে গেছেন আমিউজমেন্ট পার্ক। ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুরা তাঁর এই পার্কে আসত। তিনি নিজে তাঁদের বিনোদনের খোরাক হতেন। অসুস্থ শিশুদের জন্য বিশেষ বিছানার ব্যবস্থাও আছে। শুয়ে শুয়ে মজার সব শো দেখতে পায় বাচ্চারা। যিনি শিশুদের এত ভালোবাসতেন, তাঁর বিরুদ্ধেই কিনা দুইবার ওঠে শারীরিকভাবে শিশুদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ। কিন্তু কোনোবারই তাঁকে অভিযুক্ত প্রমাণ করা যায়নি। এই মানুষটা নিজেকে মন থেকে পিটার প্যান হিসেবে দাবি করেছিলেন। যে পিটার প্যান কোনো দিন বুড়িয়ে যায় না। শিশুর মতো যার মন। ভক্তরাও বিশ্বাস করেনি শিশু মনের মানুষটা এমন জঘন্য কাজ করবে।

একবার গুজব ওঠে, নেভারল্যান্ডে এমন এক কক্ষ আছে, যেটায় মাইকেল ঘুমান। সেটা নাকি অক্সিজেন কক্ষ। এই কক্ষে ঘুমালে নাকি অনেক বছর বেশি বাঁচা যায়। ট্যাবলয়েডগুলোর এহেন খবরে খুব অবাক হয়েছিলেন মাইকেল। হাসতে হাসতে পরে বলেন, ‘এমন কোনো কক্ষ নেভারল্যান্ডে নেই। আমি এমন কোনো কক্ষে ঘুমাই না।’

default-image

‘মিউজিক ভিডিও’ কথাটায় খুব একটা নজর দেননি মাইকেল। তিনি এগুলোকে মনে করতেন স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি, সংগীতের ছবি। তাঁর ছবিতে থাকত গল্প। সেই সঙ্গে যোগ করেছিলেন নিজের উদ্ভাবিত নাচ ‘মুনওয়াক’। এখনো তাঁর সেই সব মিউজিক্যাল ছবি সাফল্যের শীর্ষে। তাঁর থ্রিলার অ্যালবামটি ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত হিসেবে নাম লিখিয়েছে। আশি সপ্তাহ ধরে শীর্ষ তালিকায় ছিল ১৯৮২ সালের এই অ্যালবাম। বত্রিশ সপ্তাহ ছিল প্রথম স্থানে। গ্র্যামিতে ১২টি মনোনয়ন পেয়ে ৮টিই বাগিয়ে নেন মাইকেল জ্যাকসন। নিজেকে তিনি মনে করতেন সংগীতের উপাদান, ছন্দের গোলাম। তাই থেমে থাকতেন না কখনো। ছন্দ শুনলে আপনা আপনি নেচে উঠতেন নিজস্ব ভঙ্গিমায়। কখনো ভেবেচিন্তে নাচেননি। আর তাঁর এমন নাচই হয়ে গেল অনন্য। তিনি হয়ে গেলেন নৃত্যশিল্পীও। প্রয়াতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত তিনি সব সংগীত তারকার শীর্ষে রয়েছেন।

পপসংগীতের সম্রাটের উপাধি তিনি পেয়েছিলেন হঠাৎ করেই। হলিউড তারকা এলিজাবেথ টেলর তাঁকে একবার পুরস্কার প্রদানকালে হুট করে বলে ফেলেছিলেন, ‘পপ-রকের সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন’। এরপর মাইকেলের বাড়ির সামনে ভক্তরা ভিড় জমিয়ে সমস্বরে ধ্বনি দিতে থাকে, ‘কিং অব পপ, কিং অব পপ’। সেই থেকে তিনি হয়ে গেলেন ‘কিং অব পপ’ বা পপসম্রাট।

আদর্শ ছিলেন আরেক কিংবদন্তি সংগীত তারকা এলভিস প্রিসলি। তাঁর মেয়ে লিসা মেরি প্রিসলিকে ভালোবেসে বিয়ে করেন ১৯৯৪ সালে। কিন্তু দেড় বছরের বেশি টেকেনি সেই সংসার। মাইকেলের মৃত্যুর পর লিসা জানান, মাইকেলকে চিকিৎসকেরা এত বেশি ওষুধ দিতেন যে লিসার মনে হয়েছিল বাবার মতোই স্বামীর অবস্থা হবে। হয়তো বাবার মতোই হঠাৎ একদিন বাথরুমে মৃত পাওয়া যাবে মাইকেলকে। ঘাবড়ে গিয়েছিলেন লিসা। মাইকেলের শরীরের ব্যথা আর ঘুম না হওয়ায় অনেক ওষুধ সেবন করতে হতো। এদিকে মাইকেল চাইতেন ফুটফুটে সন্তান দিয়ে ভরে যাক তাঁর ঘর। কিন্তু লিসা প্রস্তুত ছিলেন না। রাগ করে মাইকেল বলেছিলেন, ‘তুমি আমাকে সন্তান না দিতে চাইলে ডেবি দেবে, ও বলেছে আমাকে।’ ডেবি ছিলেন মাইকেলের নার্স। এ কথা শুনে অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন লিসা। ছেড়ে চলে আসেন মাইকেলকে। বাধা দিয়েছিলেন মাইকেল। কিন্তু লিসা তখন ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, স্বীকার করেন। তাঁদের বিচ্ছেদের পর সেই ডেবি রোয়িকে বিয়ে করেন মাইকেল ১৯৯৬ সালে। তাঁদের ঘরে জন্ম হয় প্রিন্স আর প্যারিস জ্যাকসনের। ডেবিও বেশিদিন মাইকেলের ঘরে থাকলেন না। তাঁদের বিচ্ছেদ হয় ১৯৯৯ সালে। মাইকেলের তৃতীয় সন্তান ব্ল্যাঙ্কেটের জন্ম হয় সারোগেসির মাধ্যমে।

সন্তান ও ভাইবোনদের খুব ভালোবাসতেন তিনি। তাঁদের ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করতেন। এই যে এত খ্যাতি তিনি পেলেন জ্যাকসন ফাইভ থেকে সরে এসে, এতে কি ভাইদের মনে আঘাত লাগেনি, হিংসা হয়নি? এমন প্রশ্নের জবাবে সাফ জানিয়েছিলেন মাইকেল, ভাইয়েরা তাঁকে অনেক ভালোবাসেন। তাঁর সাফল্যে ভাইয়েরা অনেক বেশি খুশি। এই খুশিটা এখনো ম্লান হয়ে যায়নি। ভাইবোনেরা তাঁদের সাক্ষাৎকারে সব সময় মাইকেলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছেন। মাইকেলের মৃতদেহ কাঁধে নেওয়ার মতো দুঃখ হয়তো তাঁর ভাইয়েরা কোনো দিন পাননি।

মাইকেল হয়তো প্রথম স্ত্রী লিসাকে সারা জীবন ভালোবেসে গেছেন। নয়তো শেষের দিকে ফোন দিয়ে লিসাকে জিজ্ঞেস করতেন না, ‘তুমি কি আমাকে এখনো ভালোবাসো?’ লিসা উত্তরটা নিজেও জানতেন না। উত্তর পেয়েছিলেন মাইকেলের মৃত্যুর পর। এখনো ভালোবাসেন। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, লিসা যে বাড়িতে বেড়ে উঠেছিলেন, তার ঠিক অপর পাশের বাড়িতেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন মাইকেল জ্যাকসন।

 ‘ওয়াকো জ্যাকো’ ডাক নামটা মোটেও পছন্দ ছিল না মাইকেলের। তাই ‘পপসম্রাট’ই সই। এই সম্রাটকে একনজর দেখতে, একটু ছুঁয়ে দিতে, হায় মানুষের সে কী স্রোত, কী চিৎকার! এমনটা আর কারও বেলায় এত করে হয়েছে কি? একজন সম্রাটের গল্প তো এমনই হয়।

সৈয়দা সাদিয়া শাহরীন

আইএমডিবি, রোলিং স্টোন, বায়োগ্রাফি ডটকম, অপরাহ উইনফ্রের নেওয়া সাক্ষাৎকার ‘মাইকেল জ্যাকসন টকস উইথ অপরাহ’ এবং মার্টিন বশিরের প্রামাণ্যচিত্র ‘লিভিং উইথ মাইকেল জ্যাকসন’ অবলম্বনে

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন