default-image

দাদার সঙ্গে আমার শেষ দেখা, গত বছরের রমজান মাসে। চিত্রনায়ক ওমর সানীকে নিয়ে সাভারের সিআরপিতে গিয়েছি, সেখানে তখন চিকিৎসাধীন আমাদের বরেণ্য সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী। ওমর সানীকে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, তাই যাওয়া। একটু পর এন্ড্রু দাদাও সেখানে হাজির। তিনিও আলী ভাইকে দেখতে এসেছেন। আমরা অনেকটা সময় একসঙ্গে আলী ভাইয়ের পাশে কাটালাম।

এর তিন মাস পরই এন্ড্রু কিশোরের অসুস্থতার খবর পেলাম। উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুতই তিনি চলে গেলেন সিঙ্গাপুরে। সেই থেকে আমরা অপেক্ষায়, সুস্থ হয়ে তিনি ফিরবেন দেশে। 

প্রতিদিন ভোরে রমনা পার্কে হাঁটার অভ্যাসটা আমার পুরোনো। দিন তারিখ মনে নেই, তবে সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহের কথা। এক সকালে আমি হাঁটছি, হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠল। মুঠোফোন বের করে দেখলাম, হোয়াটসঅ্যাপে কল বাজছে। নাম উঠেছে ‘কিশোর দাদা’। আমি চমকে উঠলাম। কারণ, এত সকালে, তা–ও আবার দাদার নম্বর থেকে। কোনো খারাপ খবর নয় তো! কল ধরতেই ওপ্রান্ত থেকে সেই চিরচেনা কণ্ঠটি শুনতে পেলাম, ‘বাবু, কেমন আছিস?’ দাদার মৃদু কণ্ঠ। তবে একটু অস্পষ্ট।

‘দাদা, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?’ জানতে চাই। বললেন, ‘এই তো আছি, কেমো চলছে।’ তারপর তাঁর সঙ্গে যা কথা হলো, সবই তাঁর চিকিৎসাসংক্রান্ত। শেষে জানতে চাইলাম, ‘দাদা, কবে দেশে ফিরবেন?’ তিনি বললেন, ‘সবকিছু নির্ভর করছে ডাক্তারদের ওপর। তবে মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশে ফেরা হলেও হতে পারে।’ তারপর করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক বিপর্যয়ে আটকে পড়লেন সিঙ্গাপুরে। এরপর সেই তিনি ফিরলেন ১১ জুন, নীরবে। কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গেলেন রাজশাহী। নিজ ভূমে। আর ৬ জুলাই চলে গেলেন চিরতরে। আমরা তাঁকে শেষ দেখাও দেখতে পারলাম না।

এন্ড্রু কিশোর। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকের মতো। তিনি আমাকে ‘বাবু’ বলে ডাকতেন। আমি তাঁকে ডাকতাম ‘দাদা’। পরিচয়ের প্রথম দিন থেকেই তিনি আমাকে ‘তুই’ করে বলতেন। মনে আছে, ১৯৯১ সালের ২৪ ডিসেম্বর, সংগীতশিল্পী তপন চৌধুরীর বাসায় দাদার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। পরদিন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বড় উৎসব ‘বড়দিন’। দাদা এসেছেন কেক নিয়ে। প্রতিবছর বিশেষ এই দিনে তিনি তাঁর প্রিয়জনদের বাড়িতে নিজেই কেক দিতে যেতেন। তপন চৌধুরীও ছিলেন সেই তালিকায়। একটা সময় পরে সেই কেক আমার বাড়িতেও একাধিকবার এসেছে। তখন থেকেই বুঝে গিয়েছিলাম যে আমি তাঁর স্নেহধন্য হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

অডিও অ্যালবামের জন্য আমি গান লেখা শুরু করি ১৯৮৮ সাল থেকে। আর চলচ্চিত্রে প্রথম গান লিখি ১৯৯৪ সালে। ছবির নাম অগ্নি সন্তান। পরিচালক আবুল খায়ের বুলবুল। ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন প্রয়াত আবু তাহের। তিনিই আমাকে প্রথম চলচ্চিত্রে গান লেখার সুযোগ দেন। সেই ছবিতে আমি দুটি গান লিখি। সৌভাগ্যবশত দুটি গানই গেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর। একটিতে তিনি কণ্ঠ দেন আরেক কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লার সঙ্গে। আরেকটি গানে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ইফফাত আর নারগিস। ‘এই প্রেম চিরদিন থাকবে, আমাকে অমর করে রাখবে’, চলচ্চিত্রে আমার লেখা প্রথম এই গান ধারণ করা হয়েছিল শ্রুতি রেকর্ডিং স্টুডিওতে। গানটিতে কণ্ঠ দিয়ে প্যানেল রুমে ফিরে এসে দাদা আমাকে বললেন, ‘তুই খুব ভালো লিখেছিস।’ তাঁর কথার প্রমাণও মিলল। চলচ্চিত্রে প্রথম গান লিখেই আমি শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে ১৯৯৫ সালে পেয়ে যাই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি পুরস্কারের মনোনয়ন।

সেই প্রাপ্তি আমাকে অনুপ্রাণিত করে চলচ্চিত্রে নিয়মিত গান লিখতে। এরপর থেকে এ পর্যন্ত আমি আট শতাধিক চলচ্চিত্রে গান লিখেছি। এর মধ্যে দেড় শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন এন্ড্রু কিশোর।

এন্ড্রু কিশোর ছিলেন একজন বহুমাত্রিক শিল্পী। যেকোনো ধরনের গান গাইবার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। বিরহ, রোমান্টিক, লোক, চটুল এমনকি রক ধাঁচের গানেও ছিলেন অনন্য। পর্দায় যেকোনো নায়কের ঠোঁটে তাঁর গান চমৎকার মানিয়ে যেত। নায়করাজ রাজ্জাক, জাফর ইকবাল থেকে সালমান শাহ, মান্না, রিয়াজ, ফেরদৌস, শাকিব খান—সবার জন্যই তিনি গেয়ে গেছেন। দ্বৈত গানে তিনি রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন থেকে সামিনা চৌধুরী, কনক চাঁপা—সবার সঙ্গেই জুটি বেঁধে দিয়ে গেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। স্টুডিওতে ছবির গান গাইতে এসে তিনি একজন সুরকারের (নবীন হলেও) সামনে বসতেন ছাত্রের মতো। গানটি আগে ভালোভাবে তুলে নিয়ে তারপর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেন কণ্ঠ দিতে। দেখেছি সহশিল্পী নতুন প্রজন্মের কেউ হলে তাঁকে ভালো গাইবার জন্য সাহস দিতেন খুব।

মানুষ হিসেবে আগাগোড়াই তিনি নিপাট ভদ্রলোক। কেউ আঘাত পান, এমন কথা কখনোই তাঁকে বলতে শুনিনি। সমালোচনার মধ্যে তিনি ছিলেন অনুপস্থিত। যেকোনো সমস্যায় তাঁর পরামর্শটা ছিল সমঝোতার। সবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল বন্ধু, বড় ভাই, অভিভাবকের মতো।

প্রথম আলো পত্রিকার জন্মদিন ৪ নভেম্বর। একই দিনে শিল্পী এন্ড্রু কিশোরেরও জন্মদিন। প্রতিবছর এই দিনে তাঁকে আমি শুভেচ্ছা জানাই। তিনিও প্রথম আলোকে শুভেচ্ছা জানান। কখনো আমি আগে, কখনো কিশোর দাদা। পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে একাধিকবার তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে বরাবরই তিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন, ‘আমি প্রথমে একজন মানুষ। তারপর একজন কণ্ঠশ্রমিক, তারপর অন্য কিছু।’

এ লেখার শেষ টানব আমার লেখা একটি গানের কথা দিয়ে। গানটি ২০০৫ সালের ৫ নভেম্বর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত হয়েছিল। তিনজন শিল্পী গানটি গেয়েছিলেন। ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, এন্ড্রু কিশোর ও কুমার বিশ্বজিৎ। গানটি সুর করেছিলেন আলী আকবর রুপু ও রাজেশ। গানটির কথা ছিল, মানুষেরই আছে মনুষ্যত্ব/ চিরকাল এ কথাটি সত্য, এই সত্যকে আমরা মানব/ শান্তিকে বড় বলে জানব/ শত্রুকে আরও কাছে টানব/ বিভেদের দেয়ালটা ভাঙব।

এ কথাটি হয়তো আমি লিখেছি, কিন্তু এটি আসলে একজন এন্ড্রু কিশোরের মনের কথা। তিনি সবকিছুতে এ রকমই দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। এমন শিল্পী ক্ষণজন্মা। বহু যুগেও আসে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন