default-image

আড়াই শ বছরের পুরোনো গানগুলো ঠোঁটস্থ সুষমা দাশের। হালের লোকগানও। বয়স ৯১ পেরিয়েছে। ইংরেজি মাস মনে নেই, মনে আছে বাংলা ১৩৩৪-এর অগ্রহায়ণে জন্মেছিলেন তিনি। স্মৃতি মাঝেমধ্যে প্রতারণা করলেও, গান ভুল হয় না তাঁর। গাওয়ার সময় গানের খাতা দরকার হয় না। কেবল চোখ বন্ধ করলেই হয়।

১৯৭৬ সাল থেকে এখনো বাংলাদেশ বেতারে পল্লিগীতিশিল্পী হিসেবে গান করছেন সুষমা দাশ। বাংলা লোকসংগীতের কিংবদন্তিতুল্য এই শিল্পী ২০১৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর স্বামী প্রাণনাথ দাশের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামে। পৈতৃক বাড়ি একই জেলার দিরাই উপজেলার পেরুয়া গ্রামে। বাবা রসিক লাল দাশ ও মা দিব্যময়ী দাশ। মা-বাবাও গান লিখতেন, গাইতেন। বাবাই সুষমার গানের ওস্তাদ। তাঁর ছোট ভাই পণ্ডিত রামকানাই দাশও লোকসংগীতে অবদানের জন্য ২০১৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছিলেন।

১৯৮৮ সালে স্বামীর সঙ্গে সিলেট শহরে আসেন সুষমা। তাঁদের চার ছেলে ও দুই মেয়ে। এখন নগরের হাওলদারপাড়া এলাকায় থাকেন তিনি। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না সুষমার। কোমরে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট। বিছানায় শুয়েই সময় কাটাতে হয়। ছেলেদের আর্থিক অবস্থা নাজুক। খাবার আর ওষুধের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কখনো কখনো এই শরীর নিয়েও গাইতে যেতে হয়। গান করলে কিছু টাকা পান, নয়তো খরচের টাকায় টান পড়ে। করোনাকালে গানের আয়োজন বন্ধ হয়ে ভীষণ কষ্টে কাটছে তাঁর। জানালেন, ইনহেলার, অন্যান্য ওষুধ আর খাবারের খরচ মিলে অনেক টাকা লেগে যায়। সেই অংক অনেক বড় নয়, কিন্তু তাঁর জন্য অনেক বড়। সেটা জোগাড় করা তাঁর জন্য কঠিন।

বিজ্ঞাপন
default-image

সুষমা দাশ বলেন, ‘আমার জন্ম হাওরে। হাওর মানেই লোকগানের খনি। একে তো পরিবারের সবাই গান-বাজনার সঙ্গে জড়িত, এর মধ্যে গ্রামে কোনো উৎসব মানেই নানা ধরনের গান গাওয়া হতো। পাড়া-প্রতিবেশীরা ঘটা করে গানের আয়োজনে অংশ নিতেন। সেসব দেখে দেখে ছোটবেলা থেকেই আমার গান গাওয়া এবং শেখা। বাড়ির পাশ দিয়ে নৌকার মাঝি গান গেয়ে যেত, জ্যৈষ্ঠ মাসে সন্ন্যাস গান হতো, বর্ষা মৌসুমে বিয়ের ধুম পড়লেই হতো ধামাইল গানের আয়োজন। বৈশাখ থেকে চৈত্র মাস, বছরজুড়ে কতশত ধরনের গানের আয়োজন লেগে থাকত। উঠতে-বসতে গান। এই গানের মধ্যেই আমার বেড়ে উঠা। হাওরের মানুষ, গান তাই রক্তে মিশে আছে।’

দাদু-ঠাকুমা, দিদিমা, মা–বাবাসহ অনেকের কাছ থেকে লোকগান শিখেছেন সুষমা। কিছু গান আড়াই শ বছরের পুরোনো। কোনোটির গীতিকবির নামও অজানা। চণ্ডীদাস থেকে শুরু করে সৈয়দ শাহনূর, দীন ভবানন্দ, শিতালং শাহ, রাধারমণ, কালা শাহ, আজিম ফকির, অধর চান্দ, লুচন দাশ, রূপমঞ্জুরি, শ্যাম সুন্দর, ব্রজনাথ, শ্রীরুক্ষিণী, রামজয় সরকার, হরিচরণ সরকার, দুর্গাপ্রসাদ, রসিকলাল দাশ, মধুসূদন, কামাল উদ্দিন, শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ, গিয়াসউদ্দিন আহমদ প্রমুখের গান করেন তিনি। সেসবের মধ্যে আছে কীর্তন, সূর্যব্রত, ধামাইল, গোষ্ঠ, সুবল মিলন, পালা, হোলিগান, পদ্মপুরাণ, বাউলা, সন্ন্যাস, বটকিরা ও কবিগান।

default-image

করোনাকালে ঘরে বসে ফেসবুক লাইভে গেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আগে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সবার সম্মুখে গাইতাম, এখন গাই মুঠোফোনের সামনে। হয়তো শিগগিরই আবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে গাইতে পারব। ঘরবন্দী হয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না।’ তাঁর ইচ্ছা, তাঁর কণ্ঠের গানগুলো কেউ ধারণ করে রাখুক, যাতে পরম্পরায় পাওয়া গানের মূল সুর টিকে থাকে। জানালেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর কিছু গান সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ধারণ করিয়েছিলেন।

শৈশবের স্মৃতিচারণা করে সুষমা বলেন, ‘আমার তখন ৪ বছর বয়স। পাশের উপজেলা বানিয়াচংয়ে লাল জ্বর ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন সে জ্বর মানে নিশ্চিত মৃত্যু। আমাদের ১১ বছর বয়সে আশপাশের গ্রামগুলোতে কলেরা ও বসন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন সেসব রোগের চিকিৎসা ছিল না। এসব রোগে তখন প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছে। অনেক পরে সেসব রোগের চিকিৎসা বেরিয়েছে। শুরুর দিকে করোনাভাইরাসেরও কোনো চিকিৎসা ছিল না, টিকা আসছে শুনলাম। আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, মনে সবার সাহস থাকুক, এ বিপদও অতিক্রান্ত হবে। দুঃসময় কাটবেই।’

বিজ্ঞাপন
গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন