আজম খান
আজম খান প্রথম আলো

আমাদের একজন আজম খান ছিলেন। আশ্চর্য সেই আজম খান। যিনি স্কুল পালিয়ে গাইতেন, জীবন বাজি রেখে ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করেছেন, অভিনয় করতেন, বিজ্ঞাপন করতেন আর কথা বলতেন একেবারে প্রচলিত ভাষায়। তিনি আর দশটা মানুষের মতো হয়েও সবার চেয়ে আলাদা, অসাধারণ।

আজ মুকুটহীন এই পপসম্রাটের ৭১তম জন্মদিন। ক্যানসার জীবনসীমানার ওপারে নিয়ে না গেলে আজ হয়তো তাঁকে কেক কাটতে হতো। হয়তো তাঁকে ঘিরে থাকতেন বন্ধু ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদরা। তাঁদের ঘিরে থাকত নানা প্রজন্মের মানুষ। বাংলা পপসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট হাজির হতেন খুব সাধারণ পোশাকে। সেটা লুঙ্গি আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। এক দশক হলো নেই সাধারণ মানুষের মতো দেখতে এই সম্রাট। জন্মদিনে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ঐতিহাসিক অনন্য সাধারণ এই ব্যক্তিত্বের জীবনখাতার কয়েকটি পাতায়।

বিজ্ঞাপন

সারা গায়ে কেরোসিন ঢেলে মা আটকে রাখলেন বাথরুমে

আজম খানের বয়স তখন চার কি পাঁচ। চার নাকি পাঁচ তা তিনি নিজেও ঠাওর করে বলতে পারলেন না। ‘ঢাকার পোলা’ আজম খানরা তখন থাকতেন আজিমপুরের ১০ নম্বর কোয়ার্টারে। এলাকার আরেক বন্ধুকে নিয়ে পিছু নিলেন রাস্তা ঠিক করা এক আলকাতরার গাড়ির।

default-image

খানিকটা ঝোলেন, খানিকটা দৌড়ে যান, বাকিটা হাঁটেন সেই গাড়ির পেছন পেছন। ধানমন্ডিতে তখনো কোনো বাড়িঘর হয়নি। কেবল রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। আজিমপুর থেকে সেই দুই বালক ওই গাড়ির পিছু পিছু উত্তেজনায় ধানমন্ডি পর্যন্ত তো চলে এলেন। এত দূর আসার পর তাঁদের মনে হলো, তাঁরা হারিয়ে গেছেন। বাড়ি ফিরতে হবে কোন দিক দিয়ে তা তাঁরা জানেন না।

default-image

দুজনেরই গায়ে আলকাতরা, কালি–ধুলা। রাস্তার পাশে বসে তাঁরা সুর করে কাঁদছিলেন। ভাগ্য ভালো ছিল। সেই দৃশ্য দেখলেন আজিমপুর এলাকার একজন। তিনি লালমাটিয়ায় বাড়ি করছিলেন। কাজ শেষে সাইকেলে চেপে ফিরছিলেন। আজম খানদের রাস্তার পাশে ওভাবে দেখে দুজনকে তুললেন সাইকেলের সামনে আর পেছনে। ছেলেকে ওই অবস্থায় ফিরতে দেখে মা জোবেদা খাতুন ছেলের সারা গায়ে ঢাললেন কেরোসিন। তারপর তিন ঘণ্টা আটকে রাখলেন বাথরুমে। এর কিছুদিন পরই আজম খানরা আজিমপুর থেকে কমলাপুরে নিজেদের বাড়িতে ওঠেন।

গ্যারেজের চালে চলত সংগীতসাধনা

আজম খান তখন হাইস্কুলে পড়েন। বন্ধুরা সবাই গান শুনতে ভালোবাসেন। স্কুল পালানোর স্বভাব তখনো যায়নি। টিফিনের পর দে ছুট। ক্লাস পালিয়ে তিনি রমনা পার্ক, সিদ্ধেশ্বরী, শান্তিনগর এলাকায় আম, পেয়ারা চুরি করে বেড়ান। সেগুলো নিয়ে ওঠেন গ্যারেজের চালে।

default-image

সেখানে চুরি করা আম–পেয়ারা খান আর গান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মোহাম্মদ রফি, শ্যামল মিত্র, মুকেশ, কিশোর কুমার, দেশি গান, বিটলস, শ্যাডোজ ও রোলিং স্টোনের গান। সেই গান শুনে তো গ্যারেজের দারোয়ান, ড্রাইভাররা খুব মজা পেতেন। কেবল মালিক এলে একটা দেখানো ধমক দিতেন। পালায়ে যাওয়ার সুযোগ দিতেন। সেই মানুষেরাই আজম খানকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো খুব ভালো গাও। যার গান, তার চেয়েও ভালো গাও।’ এ কথা শুনে আজম খান ভাবতেন, ‘পাম দেচ্ছে’। সেই থেকে একজন সাধারণ মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খানের অসাধারণ ‘আজম খান’ হওয়ার যাত্রা শুরু হলো।

default-image

কবি জসীমউদ্‌দীনের কাছে ধরা খেলেন হাতেনাতে

কমলাপুর তখন পাড়া গাঁ। ইলেকট্রিসিটি নেই। রাত জেগে থাকে হারিকেনের আলোয়। তাতে কাটে না ভূতের ভয়। সেখানে প্রায় সাড়ে চার বিঘা জায়গাজুড়ে পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীনের বিশাল ফলের বাগান। সেখানে আঙুর আর আপেল বাদে হেন ফল নেই, যা এখানে পাওয়া যায় না। আজম খান আর জসীমউদ্‌দীনরা তখন প্রতিবেশী।

বিজ্ঞাপন

আজম খান তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়েন। কিন্তু স্কুলে মন নেই। তারই ধারাবাহিকতায় জসীমউদ্‌দীনের বাগানের কাঁঠাল চুরি করলেন। তারপর তা ‘জাগ দিয়ে রাখলেন’ সেখানেই। কাঁঠাল পেকেছে। তিনি আর তাঁর ‘পার্টনার ইন ক্রাইম’ বন্ধু ফুয়াদ পাকা কাঁঠাল খাচ্ছেন। হঠাৎ খেয়াল হলো কবি পেছনে দাঁড়িয়ে, কোমরে হাত দিয়ে চুপ করে তাঁদের দেখছেন। আজম খানের ভাষয়, ‘আমরা হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে তাঁকে দেখি ভূতের মতো! আধখাওয়া পাকা কাঁঠাল ফেলে ভোঁ–দৌড়! পেছন থেকে কবি কয়, “এই এই, শোন শোন”। কে শোনে কার কথা। আমরা পরে বুঝলাম, উনি মজা করে দৃশ্যটা দেখছিলেন। কবি মানুষ তো.... বকা দেবেন, ধরবেন, মারবেন, এ রকম নয়।’

default-image

‘যুদ্ধে যাবি ভালো কথা, দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না’

‘শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। আমি আরও তিনজন মিলে পালিয়ে গেলাম গ্রামের দিকে। সেখানে নৌকায় করে রাতের অন্ধকারে গেলাম ফুয়াদের নানিবাড়ি। সেই রাতে মেঘনা নদীতে সে কি ঝড়! নৌকা এই হেলেদুলে ডোবে তো এই ভেসে ওঠে। ঝড় থামল। এবার নৌকার মাঝি একটা খালের ভেতর নৌকা ঢুকিয়ে বলেন, “ভাই, আপনারা একটু সাবধানে থাইকেন। এই এলাকায় ডাকাত পড়ে”।’ একসময় মনে হলো এভাবে পালিয়ে বেড়িয়ে বাঁচার চেয়ে বরং যুদ্ধ করবেন তিনি। মরলে একবারে যুদ্ধ করেই মরবেন। কিন্তু এভাবে পালিয়ে ভয়ে ভয়ে বাঁচার ভেতর তিনি নেই।

গ্রাম থেকে ফিরলেন ঢাকা। মাকে বললেন, ‘আম্মা, আমি এইভাবে থাকতে পারছি না। আমি যুদ্ধে যাব।’ মা বললেন, ‘যুদ্ধে যাবি, ভালো কথা, আব্বারে বলে যা।’ পরের গল্পটুকু শোনা যাক আজম খানের মুখে, ‘আমার ফাদার ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল্ড মেডেলিস্ট। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার ছিলেন। বেশি কথা বলতেন না। যেটুকু বলতেই হয়, সেটুকু কথা বলতেন। আমি একটু কাচুমাচু হয়ে আব্বাকে গিয়ে ভয়ে ভয়ে বললাম, “আব্বা, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি।” এই বুঝি একটা চড়, লাথি দিল। কিন্তু আব্বা একটা কথা বলল, “যুদ্ধে যাবি ভালো কথা, দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না।” আমি সালাম করে চলে আসলাম।’

default-image


মনে হতো জানটা আমাদের তালুতে

আগরতালা গেলেন আজম। ক্যাম্পে গেলেন। ট্রেনিং নিলেন। শাফী ইমাম রুমীর কাছেও চলেছে আজম খানের প্রশিক্ষণ। ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করলেন। বেতন পেলেন ৭৫ টাকা। শেভ করলেন। ‘মাঞ্জা দিলেন’। আগরতালা ফিরলেন। বিরিয়ানি খেলেন। সিনেমা দেখলেন। আবার এলেন ঢাকায়। ঢাকার ডেমরা, বালু নদ, লক্ষ্যা নদী, যাত্রাবাড়ী, ক্যান্টনমেন্ট, ইছাপুর পর্যন্ত যুদ্ধ করলেন। এক রাতে তাঁদের ফ্রন্টফায়ারে পাকিস্তানি আর্মিদের ১৩টা নৌকা ছিন্ন–বিছিন্ন হয়ে গেল। মারা গেল ৮১ পাকিস্তানি সৈনিক। পরদিন ভোর থেকে শুরু হলো ওদের পাল্টা আক্রমণ।

আজম খানের ভাষায়, ‘বৃষ্টির চেয়ে বেশি গুলি আসতেছে। আরিইই আল্লাহ! মানে, তখন তো আমাদের ভাগ্য ভালো অর্ডার দেওয়া ছিল। আমরা যাতে কোনো কাউন্টারে না যাই। আমরা যে যার মতো কোনোরকমে বাঁচলাম। রাতে ডিউটি দেওয়ার সময় মনে হতো, জানটা আমাদের তালুতে।’ সব দেখে–শুনে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ তাঁর বুদ্ধি আর দুঃসাহসিকতায় ভরসা করেন। মাত্র ২১ বছরের তরুণ আজম খানকে ঢাকায় গেরিলা অপারেশন পরিচালনার জন্য সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে গুলশান ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় বেশ কয়েকটি সফল অপারেশন চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘুম হারাম করে দেয় মুক্তিবাহিনী। এরই একটা ‘অপারেশন তিতাস’। এর মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা শহরের গ্যাসের পাইপলাইন ধ্বংস করে দেওয়া।

যুদ্ধ আর গান, মিলেমিশে একাকার

ক্যাম্পে থাকাকালীন আজম খান বাটি, চামচ, হাতের কাছে যা পেতেন, বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে গান করতেন। এভাবে চাঙা রাখতেন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল। সে কথা উল্লেখিত হয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’তেও। সেখানে একটি পাতায় লেখা, ‘২০ আগস্ট ১৯৭১। একটি তাঁবুতে আলো জ্বলছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর—“হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ।” বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।’

default-image

তিনি বাংলার বব ডিলান

ষাটের দশকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বব ডিলানের গান সাহস জুগিয়েছে মুক্তিকামী মানুষকে। তেমনি যুদ্ধ চলাকালীন আজম খানের গানও অনুপ্রাণিত করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের। মৃত্যু আর ধ্বংসের ভেতর দিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠল একটা ছোট্ট স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ। দেশ তো স্বাধীন হলো, কিন্তু স্বাধীন দেশের যুবসমাজ বিভ্রান্ত, কেউ কেউ বিপথগামী। অস্ত্র জমা দিয়ে আজম খান সংগীতকে বেছে নেন অস্ত্র হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

সেসব গান অনুপ্রাণিত করেছে এ দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে। ‘আলাল ও দুলাল’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘অনামিকা’, ‘আসি আসি’, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘ব্যস্ত ভবঘুরে’, ‘বাংলাদেশ’, ‘থাকবে না যেদিন’। এই গানগুলো যেন কেবল গান নয়। এগুলো এ দেশের সাধারণ মানুষের মনের কথা। তাঁরা যা বুক পেতে অনুভব করেছেন, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারেননি, আজম খান তা–ই দিয়ে গান বেঁধেছেন, গেয়েছেন আর জয় করেছেন।

default-image

আজম খান ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা। লিকলিকে গড়ন, গড়পড়তা বাঙালি তরুণদের চেয়ে লম্বা। যে পোশাকই পরেন, মনে হয়, অন্য কারও জামা পরে চলে এসেছেন। কিন্তু তারপরও মানিয়ে যেত বেশ। মনে হতো, আজম খান বলে কথা, তিনি কি আর অন্য কেউ! তিনি চলনে–বলনে, ব্যক্তিত্বে তো এমনই হবেন! অফুরন্ত প্রাণশক্তি, বন্ধু-অন্তঃপ্রাণ, আড্ডার মধ্যমণি। একাত্তরে তাঁর বুকে দাউ দাউ করে জেগে উঠেছিল যুদ্ধের আগুন। সেই আগুন গানের বৃষ্টি হয়ে হৃদয় তোলপাড় করে দিল লাখো হৃদয়। গানের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। পারতেন না কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে। তবু সেই মানুষটার গানই মাতালো দশকের পর দশক। আজ জন্মদিনে তিন শব্দে কেবল একটি কথাই বলার আছে, ‘গুরু তোমায় সালাম’।

গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন