ভারতের সংগীত জগৎকে বদলে দিয়েছিলেন গুলশান কুমার। ১৯৮৩ সালে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ছোট্ট করে। বাবা ফলের রস বিক্রি করতেন। দিল্লির দরিয়াগঞ্জে একসময় একটা জুসের দোকান ছিল তাঁদের। পাশাপাশি ছিল ক্যাসেটের দোকান। পরে বাবার ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে সেটাকে বিশাল এক ক্যাসেট ব্যবসার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন তিনি। টি-সিরিজ হয়ে ওঠে বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। জুস বিক্রেতা থেকে ক্যাসেট সম্রাট এ সংগীত প্রযোজকের জীবন সিনেমার চেয়েও সিনেমাটিক। পুরোনো সব গান নকল করে বাজারে ছাড়তেন তাঁরা। যে গান জনপ্রিয়তা পেত, সেটাকেই নতুন করে রেকর্ড করে বিক্রি করতেন। এক দিন সেই টি-সিরিজ গেল বদলে। ১৯৮০ সালের দিকে গুলশান কুমার ভক্তিমূলক গানের কদর বুঝতে পেরেছিলেন। তখনকার দিনে এ ধরনের গানে বাজার ছিল সয়লাব। কপিরাইট আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে পাইরেটেড ক্যাসেট বিক্রি করত টি-সিরিজ। রীতিমতো ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। একপর্যায়ে ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’-এর অডিও ক্যাসেট বিক্রি করে ১৯৮৮ সালে পেয়ে যায় অস্বাভাবিক ব্যবসায়িক সাফল্য।

default-image

১৯৮০ সালে টি-সিরিজ কিছু টেলিছবি প্রযোজনা করে। মূলত গুলশানের ভাই কৃষাণ কুমার নিয়েছিলেন এ উদ্যোগ। ১৯৯০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ‘আশিকি’ বানিয়ে পেয়ে যান সাফল্য। গীতিকার সমীর এক সাক্ষাৎকারে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছিলেন, শুরুতে তাঁরা ‘আশিকি’কে একটা অডিও অ্যালবাম হিসেবেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মহেশ ভাট যখন সিনেমা বানালেন, তখন তাঁদের টনক নড়ে। তিনি বলেন, ‘গুলশান আমাকে এক দিন ডেকে পাঠালেন। বললেন, মানুষ গানগুলো পছন্দ করেছে। এটাকে সিনেমা নয়, অডিও গান হিসেবেই ভালো লেগেছে সবার।’ পরে ওই ‘আশিকি’ই টি-সিরিজকে বিশাল ব্যবসার পথ দেখিয়ে দেয়। পরে মহেশ ভাট পরিচালিত ‘দিল হ্যায় কে মান্থা নাহি’ ছবিটিও তাঁদের জন্য নিয়ে আসে উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক সাফল্য।

default-image

১৯৯৭ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় তখন টি-সিরিজের বার্ষিক আয় আড়াই শ কোটি রুপি। ভারতের অডিও বাজারের ৬৫ শতাংশ আয় একাই করতেন গুলশান কুমারের। অনেকের বিশ্বাস, সেটা সম্ভব হয়েছে পাইরেটেড ক্যাসেট কেনাবেচার মাধ্যমে। মাত্র ১৬ রুপিতে অডিও ক্যাসেট বিক্রি করত প্রতিষ্ঠানটি। একই ঘটনা ঘটে ভিডিও ক্যাসেটের ক্ষেত্রেও। ৯০-এর দশকে সাবান, ডিটারজেন্ট, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ নানা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন গুলশান কুমার। ধার্মিক ও দানশীল মানুষ হিসেবে পরিচিতি ছিল গুলশানের। বিষ্ণু মন্দিরে তিনি এক লঙ্গরখানা চালু করেছিলেন। পুণ্যার্থীদের এখানে বিনা মূল্যে খাবার দেওয়া হতো। গুলশানের মৃত্যুর পর আজও সেটা চালু রেখেছেন তাঁর ছেলে ভূষণ কুমার।

default-image

বেশি দামে ক্যাসেট বিক্রি করে এ রকম প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য এক দশকের মধ্যে কমিয়ে দিয়েছিল টি-সিরিজ। সাধারণ মানুষের জন্য ক্যাসেটকে তারা সাশ্রয়ী করেছিল। যেখানে হাতে গোনা কজন গায়ক ও সংগীত পরিচালক কাজ করতেন, সেই ইন্ডাস্ট্রিতে টি-সিরিজ বহু শিল্পীকে কাজের সুযোগ করে দেয়। ১৯৯৭ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে আততায়ীর ১৬টি গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন টি-সিরিজের কর্ণধার গুলশান কুমার।

গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন