জন্মদিনে সেই বাউলের পাশে বগুড়ার এসপি

বিজ্ঞাপন
default-image

আজ তাঁর জন্মদিন ছিল। করোনার এই দুঃসহ সময়ে কোনো আয়োজনই ছিল না। আয়োজন থাকবে কোত্থেকে? আজ কয়েক দিন হয় দিন চলছে তাঁর খেয়ে না-খেয়ে। কিন্তু দিনটি বর্ণিল হয়ে উঠল মানুষের ভালোবাসার স্পর্শে। বগুড়ার বাউলশিল্পী সুকুমার মহন্তের বাসায় আজ ছুটে গেছেন বগুড়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলী আশরাফ ভূঁইয়াসহ পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা। সারা দেশ থেকে অনেকেই তাঁর খোজ নিয়েছেন।
‘আর কুলায়া উঠতে পারছি না দাদু’—এই শিরোনামে আজ শনিবার প্রথম আলো অনলাইনে একটি খবর প্রকাশিত হয়। সেই খবরে সোনাতলার বাউলশিল্পী সুকুমার মহন্তের করোনাকালীন কষ্টকর জীবনের চিত্র ফুটে ওঠে। খবরটি প্রকাশের পরপরই বাউলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বগুড়ার পুলিশ সুপার। এ ছাড়া দেশের নানা প্রান্ত থেকে তার খোঁজখবর নিয়ে বিকাশে টাকাসহ পরিবারের খাবার, চাল, ডাল, আলু, মাছ, মুরগি কিনে দিচ্ছেন।
‘বলব না গো আর কোনো দিন, ভালোবাসো তুমি মোরে’ গানটি অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার পর রাতারাতি জনপ্রিয়তা পান শিল্পী সুকুমার বাউল। গতকাল শুক্রবার তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি প্রথম আলোকে জানান করোনার এই সময়ে তাঁর দুর্দশার কথা। সে সময় তিনি মুঠোফোনে জানিয়েছিলেন, এই দুর্যোগে কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে তিনি ভালো নেই। সাত দিন হলো খেয়ে না–খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরে অল্প কিছু চাল, ডাল আছে, এখন তরিতরকারি, নুন, তেল, মাছ কেনার সামর্থ্য নেই। সেটা কাউকে বলতেও পারছিলেন না এই বাউল। আজ রাতে মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘জেলা থেকে অনেকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। এসপি স্যার এসেছিলেন, সহকারী পুলিশ সুপার, থানার ওসি এসেছিলেন। তাঁরা চাল, ডাল, আলু, মুরগি, মাছ কিনে দিয়েছেন। সেগুলো দিয়ে এক মাসের বেশি চলে যাবে। এসপি স্যার আমার গান শুনেছেন। তাঁর সঙ্গে অনেক সময় কথা হয়েছে। যাবার সময় তিনি বলে গিয়েছেন কোনো সহযোগিতা লাগলে যোগাযোগ করতে।’
আজ এই বাউলের জন্মদিন। দিনটি তিনি সারা জীবন স্মরণীয় করতে রাখতে চান। এই গায়ক বলেন, ‘এসপি স্যার আমার জন্য শহর থেকে কেক নিয়ে এসেছেন। জীবনে এই প্রথমবার কেক কেটে জন্মদিন পালন করলাম। এটা ভুলবার নয় দাদু। আমার খুব ভালো লাগছে।’
বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলী আশরাফ ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রথম আলোর নিউজটা অনলাইনে প্রকাশ পাওয়ার ঠিক দেড় ঘণ্টার মধ্যে আমরা সুকুমার বাউলের বাসার উদ্দেশে বের হয়েছি। তাঁর বাসা শহর থেকে দূরে। তারপরও আমরা দ্রুত তার খোঁজখবর নিতে ছুটে যাই। তাঁর সঙ্গে অনেক সময় কথা হলো। তিনি আমাদের গান শোনালেন। তাঁর পরিবার নিয়ে যেন এক মাস চলতে পারে, সেভাবে সব বাজার সদাই এবং নগদ ১০ হাজার টাকা দিয়েছি।’
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে সোনাতলা উপজেলা। সেখান থেকেও প্রত্যন্ত গ্রামে এই বাউলের বাড়ি। প্রতিবেদকের সঙ্গে পুলিশ সুপারের কথা হয় রাত আটটার সময়। তখন তিনি সুকুমার বাউলের বাসা থেকে ফিরছিলেন। এই সময় তিনি প্রথম আলোকে এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এসপি বলেন, ‘প্রথম আলোতে নিউজ না হলে হয়তো আমরা এমন একজন গানের সাধককে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারতাম না। আমাদের জানাই হতো না এমন একজন মানুষ কষ্টে আছেন।’

default-image

সুকুমার বাউল আরও বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে ইউএনও সাহেব আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, বাসায় আসবেন, তাঁর জন্য চেয়ার নিয়ে বসে আছি।’
এ ছাড়া সুকুমার বাউলের নিজ জেলা বগুড়া এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে ফোন দিয়ে ভক্তদের অনেকেই সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছেন। কথা বলার সময় এই বাউল বারবার প্রথম আলোর কাছে তাঁর খোঁজখবর নিয়ে নিউজ করার জন্য ধন্যবাদ জানান।
বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার বিশ্বনাথপুর গ্রামে পরিবার নিয়ে থাকেন বাউল সুকুমার বৈরাগী। তাঁর জন্ম ১৯৫৬ সালে বৈরাগী বৈষ্ণব পরিবারে। বাল্যকালে পরিবার থেকে গানের চর্চার শুরু। তাঁর দাদা প্রভু বৈরাগীর সঙ্গে গ্রামে গ্রামে গান করতেন। দাদার সঙ্গেই গ্রামে বিভিন্ন জায়গায় গান শুনতে যেতেন। এভাবে গানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা জন্ম নেয়। তিনি গান গেয়ে যা পান, তা–ই দিয়ে চলে সংসার।
গত বছরের ৩১ মে ইউটিউব চ্যানেল ঈগল মিউজিক থেকে মুক্তি পায় তাঁর গাওয়া গান, ‘বলব না গো আর কোনো দিন ভালোবাসো তুমি মোরে’। এই গান দিয়েই তিনি সংগীতাঙ্গনে বেশ পরিচিতি পাওয়া শুরু করেন। গানটি তাঁকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন