default-image


পণ্ডিত রবিশঙ্করের ছিল নানামুখী জীবনতৃষ্ণা। দাদা উদয়শংকর নাচের দলের সঙ্গে ইউরোপে ঘুরতে ঘুরতে ভ্রমণের নেশা পেয়ে বসেছিল তাঁকে। রাতের প্যারিসকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন বাংলার কিংবদন্তিতুল্য সেতারসাধক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষ। ভীষণ বর্ণাঢ্য আর বাঁকবহুল ছিল এই শিল্পীর জীবন। প্রকৃত অর্থে সংগীত তারকা বলতে যা বোঝায়, রবি ছিলেন ঠিক তা-ই।

রবিশঙ্করের পূর্বপুরুষদের আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের নড়াইলের কালিয়ায়। ১৯২০ সালের ৭ এপ্রিল তিনি জন্ম নেন ভারতের বেনারসে। বাবা পণ্ডিত শ্যামশঙ্কর চৌধুরী খ্যাত ছিলেন তাঁর পাণ্ডিত্য, আভিজাত্য ও শৌখিনতার জন্য। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই পণ্ডিত। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অধিকার ছিল অসাধারণ মানের। অবশ্য রবিশঙ্করকে বেশ আকর্ষণ করতেন তাঁর দাদা উদয়শংকর। তাঁর কাছ থেকেই রবিশঙ্কর পেয়েছেন ভারতীয় সংস্কৃতি, শিল্প ও ঐতিহ্যের প্রথম পাঠ। ১২ বছর বয়স থেকেই উদয়শঙ্করের দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সংগীতে সহযোগিতা করতে থাকেন কিশোর রবি, তাঁকে নৃত্যও করতে হতো নিয়মিত। দলের সঙ্গে তিনি সেই বয়সেই ঘুরে বেড়িয়েছেন বলতে গেলে প্রায় সমগ্র ইউরোপ।

২০ বছর বয়সে রবীন্দ্রশঙ্কর চৌধুরী নামটিকে কেটে ছোট করে তিনি করেন রবিশঙ্কর। বিশ্বব্যাপী পণ্ডিত রবিশঙ্কর ভারতীয় বাঙালি সংগীতজ্ঞ হিসেবে শ্রেষ্ঠতম একজন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মাইহার ঘরানার স্রষ্টা আচার্য আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্য ছিলেন তিনি। ইউরোপ থেকে মাইহারে ফেরার আগে আলাউদ্দিন খাঁ বলেছিলেন, ‘সব ছেড়ে যদি আসতে পারো, তবেই তোমাকে শেখাব।’ সবকিছু ছেড়েছুড়ে রবিশঙ্কর ফিরেছিলেন গুরুর কাছে।

default-image

রবিশঙ্কর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য ও এ সংগীতকে ১৯৬০-এর দশকে পাশ্চাত্যের কাছে তুলে ধরেন। ১৯৩৯ সালে ভারতের আহমেদাবাদ শহরে রবিশঙ্করের প্রথম সাধারণের জন্য উন্মুক্ত একক সেতার পরিবেশন অনুষ্ঠান হয়। সেই শুরু থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পণ্ডিত রবিশঙ্কর নিজেকে তুলে ধরেছেন একজন বৈশ্বিক সংগীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা, পারফরমার এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন মেধাবী দূত হিসেবে। পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে ভারতীয় সংগীতকে সমন্বিত করার কাজ রবিশঙ্কর অনেক করেছেন।

১৯৪৫ সালের মধ্যে রবিশঙ্কর সেতারবাদক হিসেবে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যান। ৬০ বছর ধরে সংগীতসাধনা করে গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছেন তিনি। তাঁর বাবা পণ্ডিত শ্যামশঙ্কর চৌধুরী পাণ্ডিত্য, আভিজাত্যবান এক শৌখিন মানুষ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁকে সমীহ করতেন। ১৯৩৩ সালে রবিশঙ্কর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ রবিশঙ্করকে বলেছিলেন, ‘বাবার মতো হও, দাদার মতো হও।’

default-image

২১ বছর বয়সে রবিশঙ্কর বিয়ে করেছিলেন গুরু আলাউদ্দিন খাঁর মেয়ে অন্নপূর্ণা দেবীকে। তাঁদের ছেলের নাম শুভেন্দ্রশঙ্কর। একসময় তাঁদের বিচ্ছেদ হয়েছিল। পরে মার্কিন কনসার্টের উদ্যোক্তা স্যু জোন্সের সঙ্গে সম্পর্ক হয় তাঁর। তাঁদের সন্তান নোরা জোন্স সুনাম কুড়িয়েছেন জ্যাজ, পপ, আধ্যাত্মিক ও পাশ্চাত্য লোকসংগীতের শিল্পী ও সুরকার হিসেবে। নোরা ২০০৩ ও ২০০৫ সালে ১০টি শাখায় গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জিতেছিলেন। রবিশঙ্কর পরে ভক্ত সুকন্যা কৈতানকে বিয়ে করেন। তাঁদের মেয়ে আনুশকাশঙ্কর সেতারশিল্পী হিসেবে বিখ্যাত।
রবিশঙ্করের সৃষ্টি যেমন বিপুল, তাঁর অর্জনও তেমনি অপরিমেয়। পাশ্চাত্যে ভারতীয় সংগীতের প্রধান পুরুষ বলা চলে তাঁকে। সংগীতের জন্য গ্র্যামি, ভারতরত্ন—সবই পেয়েছেন।

default-image

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রবিশঙ্করের ভূমিকা আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার কথা জেনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। এই সময় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলায় দুটি গান লিখে রেকর্ড করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের জন্য একটি কনসার্ট করার কথাও তাঁর মনে হয়। এ ব্যাপারে তিনি জর্জ হ্যারিসনের সাহায্য চাইলেন। ১৯৭১-এর ১ আগস্ট মেডিসন স্কয়ারে অনুষ্ঠিত এই কনসার্ট শুরু হয়েছিল আলী আকবর ও রবিশঙ্করের সরোদ ও সেতারবাদন দিয়ে।

সেতারবাদনে পণ্ডিত রবিশঙ্করের পারদর্শিতা প্রশ্নাতীত। আলাউদ্দিন খাঁর কঠোর তালিমের পাশাপাশি নিজের নিষ্ঠা তাঁকে পারদর্শী করে তুলেছিল। সংগীতে তাঁর সৃজনশীলতার প্রমাণ আছে নানা ক্ষেত্রে। সেতারেরও কিছুটা সংস্কার করেছেন তিনি। তার ও সুর বাঁধায় বেশ পরিবর্তন এনেছেন তিনি। এর ফলে সেতারের ধ্বনি অনেক সুরেলা হয়েছে। বাদনশৈলীতেও তাঁর উদ্ভাবনী শনাক্ত করা যায়। সুরবাহারের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য তিনি প্রয়োগ করেন আলাপ ও জোড়ে। অতিবিলম্বিত থেকে দ্রুত বাদনে তালের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে সেতারের উপভোগ্যতাকে অনেক সম্ভাবনাময় করে তুলেছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0