default-image

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল দুই নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। একাত্তর তাঁর কাছে হিরন্ময় হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স মাত্র সাড়ে ১৪ বছর। গানের জগতে আকণ্ঠ ডুবে থাকা এই লোকটিকে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই স্মৃতি খুঁড়ে তিনি বের করে আনলেন একাত্তরকে। তাঁর ভাষায়, “আগরতলায় আমরা প্রশিক্ষণ নিই। মনে পড়ে, মানিক, মাহবুব, খোকা আর আমি—এই চারজন এক সঙ্গে রেকি করতাম। কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত সড়কে পাক হানাদারেরা কতগুলো দুর্গ করেছে, সেগুলো দেখে আসতাম। একদিন ‘তন্তর’ নামক এক জায়গায় রাত যাপন করি। পরদিন ভোরে যখন ক্যাম্পে ফিরে যাব, তখন সিএনএসডি রাস্তা পার হওয়ার সময় আমরা পাকিস্তান হানাদারদের হাতে ধরা পড়ি। ওরা আমাদের চারজনকে একটা স্কুল মাঠে নিয়ে যায়। চারজনকেই মেরে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। 

‘‘যেহেতু মেরে ফেলা হবে, তাই শরিয়ত মোতাবেক আমাদের কাপড় খুলে নিয়ে গোসল করানো হয়, তিন কলেমা পড়ানো হয়, চোখে বেঁধে দেওয়া হয় কালো কাপড়। সেই দৃশ্য হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ করছিল আর কাঁদছিল। এরপর আমাদের দিকে মেশিনগান তাক করানো হলো। চোখ বাঁধা। হঠাৎ শুনতে পেলাম একজন সুবেদার ওয়্যারলেসে কথা বলছেন, ‘ও চার লোগ মুক্তি হ্যায়।’ কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কী যেন নির্দেশ পেয়ে ওরা আমাদের আর মারল না। হাত-পা বেঁধে একটা পাবলিক বাসে করে নিয়ে গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর্মি হেড কোয়ার্টারে। ”

এরপর জিজ্ঞাসাবাদ। বুলবুল বললেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তোমরা আমাদের অসংখ্য নিরীহ মানুষ হত্যা করেছ।’ পাক সেনাদের ক্যাপ্টেন ইফতেখার বললেন, ‘তুমি যে কথা বলছ, তাতে তোমার মৃত্যু হতে পারে।’ কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড় থাকি। বয়সে আমি অনেক ছোট বলে তিনি আমাকে সাহাঘ্য করতে চাইলেন। বললেন, ‘তোমাকে প্রশ্ন করলে বলবে আমি ভারত থেকে পালিয়ে এসেছি।’

এরপর তাঁদের চারজনকেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলে। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন নজরুল, বাতেন আর কামালকে; যাঁদের পরে মেরে ফেলা হয়েছিল।

‘‘যেহেতু আমি ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্র, ভালো ইংরেজি বলতে পারি, তাই ক্যাপ্টেন ইফতেখার এসে আমাকে প্রস্তাব দিলেন তাঁদের হয়ে কাজ করার জন্য। কিন্তু আমি প্রস্তাব প্রথমে প্রত্যাখ্যান করি। জেলে বসে শহীদ নজরুলকে বললাম, ‘জেলের দেয়াল ছোট। চলেন পালিয়ে যাই।’ তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘পালানোর জন্য যুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করিনি।’

“একদিনের কথা। সেদিন ছিল ২৭ রমজান। বন্দীরা এক সঙ্গে ইফতার করার জন্য বসেছে। হঠাৎ ফটক খুলে গেল। পাকসেনারা এল। তাঁরা বন্দীদের সারিবদ্ধভাবে বসাল। আমাদের চারজনকে রেখে ৩৯ জন ছেলেকে আলাদা করে নিয়ে গেল। আমি সাহস করে সেখানে অবস্থানরত ব্রিগেডিয়ার সাদউল্লার কাছে জানতে চাইলাম—‘ওদের কোথায় নিয়ে যাও?’ সে বলল, ‘আজ একটি পবিত্র দিন। এই দিনে কেউ মারা গেলে সে বেহেস্তবাসী হয়। এ জন্য আজ তাঁদের হত্যা করব।’ শুনে অজানা আশঙ্কায় আমার বুকটা কেঁপে উঠল।

৩৯ জন ছেলেই জানতে পারলেন এই খবর। তাঁরা ছুটে এলেন আমার কাছে। তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসগুলো আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, তাঁদের আত্মীয়স্বজনের কাছে পৌঁছে দিতে। এর মধ্যে একটি চাদর ছিল, যেটা দিয়ে আমি সেই ৩৯ জনের চোখের পানি মুছে নিয়ে এসেছিলাম। তাঁরা সবাই শহীদ হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের চোখের পানির দাগ লেগে থাকা সেই চাদরটি এখনো আমার কাছে আছে। ”—বললেন বুলবুল।

“১৯৭১ সালে রমজানের ঈদের কথা মনে আছে। সেই ঈদে পাক সেনারা একটা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বেশ কজনকে মুক্তি দেয়। বয়সে কনিষ্ঠ বলে আমি মুক্তি পাই। বাবা আমাকে আনতে গিয়েছিলেন। ঢাকায় আজিমপুরে যে বাড়িতে আমরা থাকতাম, বাবার সঙ্গে সেখানে পৌঁছার পর মাকে দেখে আমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলি। কারণ কোনো দিন আমি চিন্তা করিনি আমি আবার আমার মাকে দেখতে পাব। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘মা, আমাকে অনেক খাওয়া দাও। অনেকদিন ভালো কিছু খাইনি।’

‘মা খাবার ব্যবস্থা করলেন। যখনই খেতে বসেছি, ঠিক তখনই পাকবাহিনী বাড়িতে হানা দিল। তারা এসে আমার চুলের মুঠি ধরে নিয়ে গেল এমপি হোস্টেলের নির্যাতন কক্ষে। সেখানে আমার ওপর চলল অমানুষিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি আমি। আড়াই দিন আমার জ্ঞান ছিল না।’

‘কয়েকদিন পর ওখান থেকে আমাকে বদলি করা হলো রমনা থানায়। সেখানে দুটো কক্ষে ৮৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। দেখতাম, প্রতিদিন সাতজন করে ধরে নিয়ে মেরে ফেলছে হানাদারেরা। ১৬ ডিসেম্বর যেদিন দেশ স্বাধীন হলো, সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা রমনা থানা থেকে মাত্র ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। আমি এমনই আহত ছিলাম যে, হাঁটতে পারছিলাম না। একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। সাতদিন চিকিৎসার পর আমি আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে শুরু করি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বীরত্বের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এক হাজার টাকার একটি চেক দেওয়া হয়েছিল আমাকে। সেটি আমি গ্রহণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হাত থেকে। ”—বলতে বলতে বিষণ্ন হয়ে যান বুলবুল।

তারপর বললেন, ‘সেই চোখের জলের স্মৃতিভরা চাদরটি এখনো আমি রেখে দিয়েছি যত্ন করে। সে চাদর দেখলে আমি এখনো একাত্তরে ফিরে যাই।’

(লেখাটি ২০০৭ সালের ৩১ মার্চ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছিল)

আরও পড়ুন
পালিয়ে বেড়ানোর বর্ণনা দিলেন ইমতিয়াজ বুলবুল
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের চিকিৎসা কেন দেশে হলো?
বাবাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে চান ছেলে
লাশ উদ্ধারের ৫৭ ঘণ্টা পর মামলা করলেন বুলবুল
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই
‘আমার জীবনটা জেলখানার মতো’
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে শেষ শ্রদ্ধা কাল
বুলবুলের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী

বিজ্ঞাপন
গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন