default-image

পর্দায় নানা চরিত্রেই নিজেকে রূপ দিতে হয় একজন অভিনেতাকে। আর একই ধরনের চরিত্রে এক কিংবা দুবার নয়, ৭৫ বার অভিনয় করেছেন অভিনয়শিল্পী কচি খন্দকার। চরিত্রটিও খুবই বিব্রতকর। নাটকে তাঁর চরিত্রটি থাকে বেশি বয়সের। যাঁর কারণে তাঁকে ডাকা হয় ‘চাচা’ বলে, আর তাঁর স্ত্রী হিসেবে নেওয়া হয় কম বয়সী কোনো অভিনেত্রীকে। যাঁকে ডাকা হয় ‘ভাবি’। দিনের পর দিন এই কমেডি চরিত্র করতে করতে ক্লান্ত, বিরক্ত কচি খন্দকার। তৈরি হয়েছে পরিচালকদের প্রতি ক্ষোভ ও অভিমানও।

প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমার প্রচুর অভিমান আর ক্ষোভ আছে বিষয়টি নিয়ে। নাটকে আমাকে ডাকা হয় “চাচা”, আর আমার বউকে ডাকা হয় “ভাবি”। এই কমেডি এখনো করানো হচ্ছে আমাকে দিয়ে।’

বিজ্ঞাপন

অথচ বেশ কিছু নাটকে ব্যতিক্রম সব চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন এই অভিনেতা। ২০০১ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালনায় একটি নাটকে প্রথম অভিনয় করেন কচি খন্দকার।

default-image

বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে নাটকটি লিখেছিলেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। সেবারই প্রথম টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তখন কচি খন্দকার লেখালেখি করতেন। পাশাপাশি চলত অভিনয়। ‘ক্যারাম’, ‘কবি’, ‘বাইসাইকেল’সহ জনপ্রিয় অনেক নাটক তাঁর লেখা ও অভিনীত। একসময় তাঁর লেখা বেশির ভাগ নাটক নির্মাণ করেছেন ফারুকী। তাঁদের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভালো ছিল। আজিজ সুপার মার্কেটে তাঁরা নাটকের গল্প নিয়ে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। এমন সৃজনশীল সব কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কচি খন্দকার। কিন্তু অভিনয়ের ক্ষেত্রে দুই দশকের ক্যারিয়ারে একই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডাক পেয়েছেন তিনি। এ কারণে তাঁর মনে জমাট বেঁধেছে ক্ষোভ।

তিনি জানান, তাঁকে সব সময় যে ধরনের চরিত্রের জন্য ডাকা হয়, সে ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সন্তুষ্ট নন। নির্মাতারা তাঁকে নিয়ে ভাবেন না। বেশির ভাগ নির্মাতা তাঁকে একটি ‘স্টেরিওটাইপ’ চরিত্রে দেখতে চান।

default-image

যদিও অনেক নির্মাতার কথা রাখতে গিয়ে তিনি একই চরিত্রে বারবার বিরক্ত নিয়ে অভিনয় করে গেছেন। তিনি বলেন, ‘নাটকে আমাকে দেখলে মনে হবে, আমি “চাচা” এবং আমার সঙ্গে তরুণী একজন অভিনেত্রীকে দেওয়া হয় আমার স্ত্রী হিসেবে। যেন নাটকের অন্য চরিত্ররা আমাকে চাচা, আর তাঁকে ভাবি ডাকতে পারে। এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি ৭৫টি নাটকে, ৭৫ বার। একটা বিজ্ঞাপনেও আমি এই একই চরিত্রে অভিনয় করেছি। এই একই চরিত্রে বারবার অভিনয় করা একজন অভিনেতার জন্য কষ্টকর। বিভিন্ন সময় নাটকের গল্পে এই ধরনের রসায়ন থাকলে লেখকেরাও বলে দেন কচি ভাইকে নিতে হবে। ৭৫টি নাটকে একই সংলাপ আমার জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত একটি দুঃখ।’ ‘মুড়ির টিন’ নাটক থেকে কচি খন্দকারের এই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের শুরু। এরপর থেকে এখনো একই চরিত্রে জন্যই নির্মাতারা তাঁকে নিতে চান।

বিজ্ঞাপন
default-image

এই অভিনেতা অনেক দুঃখ নিয়ে জানান, তাঁর অভিনয়ের শুরুটা ছিল অন্য রকম। তখন গল্পপ্রধান নাটকে নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অভিনেতা হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার বদলে দেয় তাঁরই লেখা ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালনায় ‘ক্যারাম’ নাটক। সেই নাটকে তাঁর চরিত্রটি ছিল সন্তু মামার। নাটক প্রচারের পরে বাইরে বের হলেই তিনি সন্তু মামা ডাক শুনতেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনো আছে। রাস্তাঘাটে বের হলে ভক্তরা তাঁকে সন্তু মামা ডেকে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার বায়না ধরেন। পরে ‘ফোর টোয়েন্টি’ নাটক দিয়ে প্রচুর অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন। সেই নাটকগুলো বেশির ভাগই ছিল গল্পপ্রধান। সেই গল্পপ্রধান নাটক এখন আর নেই বলে মনে করেন তিনি। ‘ভিউ’সর্বস্ব এখন নাটকের ইন্ডাস্ট্রি। গল্পকে অনেকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এটা তাঁকে কষ্ট দেয়। তিনি জানান, সবচেয়ে বেশি যে নাটকগুলো ইউটিউবে দেখা হচ্ছে সেগুলোর বেশির ভাগই তিনি দেখেছেন। এগুলোকে তাঁর কাছে একবার দেখার যোগ্য মনে হয়েছে। যেসব নাটক একবার দেখলেই আগ্রহ শেষ হয়ে যায়, এগুলো তেমন নাটক। এই নাটকগুলো দর্শক মনে কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারে না। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি “ভিউ” পাওয়া নাটকগুলো দেখে আমি হতাশ। এগুলো সস্তা সেন্টিমেন্ট তৈরি করেছে। কিছু প্রযোজক এই সেন্টিমেন্টকে উসকে দিয়ে দর্শক চাহিদা তৈরি করতে চাচ্ছেন। দিন শেষে কাজগুলো নাটকের মান নষ্ট করছে। এই “ওয়ান টাইম” কাজগুলো ভালো গল্পের নাটক থেকে দর্শকদের দিন দিন বিচ্ছিন্ন করেছে।’

default-image

নাটক রচনা, অভিনেতা ও পরিচালক সব জায়গাতেই তাঁর সফলতার ছাপ আছে। তবে নিজেকে নির্মাতা হিসেবেই তিনি পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। ৫ বছর ধরে তাঁকে অভিনয়ে কম দেখা গেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, চরিত্রের বৈচিত্র্য না থাকার কারণে তিনি অভিনয় কমিয়ে দিয়েছেন। চলচ্চিত্রে অভিনয় নিয়েও তাঁর অভিমান আছে। এখানেও তিনি মনের মতো চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডাক পাননি। এটাও অভিনয় কমিয়ে দেওয়ার আরেকটি কারণ। ২০ বছরের ক্যারিয়ারে নিজেকে এখনো তরুণ মনে করেন কচি খন্দকার। মঞ্চেও আছে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা। ১৯৭৯ সালে তিনি মঞ্চনাটক লেখা ও নির্দেশনা দেওয়া শুরু করেন। তাঁর থিয়েটারের নাম ছিল অনন্যা নাট্যদল। তিনি জানান, নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল চলচ্চিত্র বানানোর। এখন সেদিকেই তিনি হাঁটছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছবি বানানো। একটি হলেও ছবি বানিয়ে মরতে চাই। “খসরু মাইনাস ময়না” ও “মাই ডিয়ার ফুটবল” নামে দুটি সিনেমার গল্প নিয়ে এগোচ্ছি।’

সম্প্রতি তাঁর লেখা ‘মেলব্যারাক কল্যাণ সমিতি’ নামে একটি ধারাবাহিক বানিয়েছেন সাগর জাহান। নাটকটিতে অভিনয়ও করছেন কচি খন্দকার। এটি ঈদুল ফিতরে প্রচারিত হবে। তাঁর হাতে আছে ‘দুধভাত’ ও ‘তুই’ নামে দুটি নাটকের পাণ্ডুলিপি। নাটক দুটি তিনিই নির্মাণ করবেন।

default-image
টেলিভিশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন