default-image

বিটিভির কাল থেকে আসাদুজ্জামান নূরকে সবাই ‘বাকের ভাই’ বলে ডাকেন। যে বাকের ভাইকে ফাঁসি না দেওয়ার দাবিতে বাংলাদেশের অনেক শহরে নাকি মিছিল বেরিয়েছিল। অনেকের শৈশব-কৈশোরের প্রিয় চরিত্র ‘বাকের ভাই’। ‘জনপ্রিয়’ শব্দটিতে তাঁকে মানায় না। তিনি আসলে জনপ্রিয় নন, তিনি কেবলই প্রিয়, সব মানুষের কাছে।

অভিনেতা হিসেবে তাঁকে আমরা দেখেছিলাম টেলিভিশনের ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকগুলোতে, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘চন্দ্রকথা’ সিনেমাগুলোয় আর মঞ্চে ‘গ্যালিলিও’, ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’-এর মতো নাটকে। সেসবের মুগ্ধতা অন্য রকম। মঞ্চে তাঁকে অবশ্য আরেকটি চরিত্রে পাওয়া যায়, সেটা হচ্ছে—প্রধান অতিথি। সংস্কৃতিমন্ত্রী হওয়ার পর দেখা গেল, তিনি সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবেও জনপ্রিয়। সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকতেন। তাঁর বক্তব্য শোনা সেই অনুষ্ঠান উপভোগের চেয়েও উপভোগ্য। বক্তব্য দিতে উঠে তিনি কখনো দুই লাইন আবৃত্তি করে শোনাতেন, কখনো গল্প, কখনো কৌতুক। মনে হতো না তিনি একজন মন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন
default-image

আসাদুজ্জামান নূরের সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌতুকটি ছিল নিজেকে নিয়ে। তাঁর বাবার একটি চিঠির কথা মনে করে তিনি বহু মঞ্চে কৌতুকটি শুনিয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গোসলখানায় গান গাইছিলেন তিনি। ক্যাম্পাসের এক বড় ভাই তা শুনে তাঁকে গান গাইতে নিয়ে যান একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানের ছবি ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকায় ছাপাও হয়। আসাদুজ্জামান নূরের বাবা ছবিতে ছেলেকে দেখে চিঠিতে তাঁকে লেখেন, ‘সংগীতাঙ্গনের বেহাল দশার কথা অনেক কাল ধরিয়া শুনিয়া আসিতেছি। আজ পত্রিকায় তোমার ছবি দেখিয়া সে বিষয়ে নিশ্চিত হইতে পারিলাম...।’

আসাদুজ্জামান নূরের নানা বর্ণ উন্মোচিত হতে থাকে একের পর এক। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, নীলফামারী থেকে একজন মানুষ কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছেন সমগ্র বাংলায়, পৃথিবীতে। যেখানে বাংলা ভাষার মানুষ থাকেন, তাঁরা আসাদুজ্জামান নূরকে চেনেন, ভালোবাসেন। তাঁর অভিনয় গুণে, তাঁর বাচনে, তাঁর আদর্শে। সংস্কৃতিসেবী ও নেতা দুই অঙ্গনের মানুষ হিসেবে তাঁর সার্থকতার শেষ নেই। একজন মানুষের জন্ম এমন অবিশ্বাস্য সার্থক কী করে হয়, ভাবলে অবাক হতে হয়।

default-image

সংস্কৃতিমন্ত্রী থাকাকালীন সংস্কৃতিকর্মীদের সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। সংস্কৃতির বাজেট বাড়ানো নিয়ে কত আলোচনা, কত দাবি করেই যাচ্ছিলেন সবাই। আসাদুজ্জামান নূর কেবলই অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, দেশের অগুনতি সংস্কৃতিকর্মীর পকেটের টাকা ও স্বেচ্ছাশ্রমে যে অঙ্গন এগিয়ে যাচ্ছে, সেটিই সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী বাজেট। তাঁর এই সান্ত্বনাসুধা বেশ কার্যকর হয়েছিল। তৃণমূল সংস্কৃতিকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন। সংস্কৃতির বাজেট তেমন বাড়েনি। তাঁদের অনুপ্রাণিত করে প্রায়ই বলতেন নিজেদের সময়ের কথা। কত সংগ্রাম করে ঢাকার নাট্যাঙ্গনকে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন। কত না খেয়ে থাকা দিনরাত, কত শ্রম আর কসরত করে নাটককে তাঁরা শক্তিশালী মঞ্চ দিয়েছেন। তাঁর মুখ থেকে সেসব সংগ্রামের গল্প শোনার অভিজ্ঞতা সবার হয় না। যাঁদের হয়, নূরের ছটায় তাঁরা কিছুটা আলোকপ্রাপ্ত হন। আসাদুজ্জামান নূর তাঁর আলোয় আমাদের আলোকিত করে যাচ্ছেন, যাবেন আরও অনেক দিন, সেই প্রত্যাশা করি।

বিজ্ঞাপন
default-image

ঘরের বাইরে এত যজ্ঞ করে বেড়িয়েছেন যিনি, তাঁর বাড়ির খবর কী? এ প্রশ্ন যেকোনো ভক্তের মনে আসতেই পারে। এ রকম প্রশ্নের জবাব হতে পারে আসাদুজ্জামান নূরকে নিয়ে তাঁর স্ত্রীর একটি মূল্যায়ন। তাঁর চিকিৎসক স্ত্রী শাহীন আক্তার এক সাক্ষাৎকারে আসাদুজ্জামান নূরকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘বাইরের লোকজন যখন তাকে নিয়ে ভালো কথা বলে, তখন ভালোই লাগে। সে আসলে খুব ভালো। তাকে নিয়ে আমি গর্বিত। ছেলেমেয়েদের জন্য সে অনেক কিছু করে। সে ছেলেমেয়ের জন্য যা করে, তা আমি কোনো বাবাকে করতে দেখিনি। যে বাবা ছেলেমেয়ের জন্য অনেক কিছু করে, সেই বাবা কখনোই খারাপ হতে পারে না। নীলফামারীর মানুষের প্রতিও তার অন্য রকম ভালোবাসা আছে। এত মানুষের জন্য কাজ করে একটা মানুষ, তার তো ঘরে সময় দেওয়াটা একটু কমই হবে। এটার জন্য আমার খারাপ লাগে না। তবে বিয়ের প্রথম দিকে একটু একটু খারাপ লাগত।’

default-image

সময় দেওয়ার সেই আক্ষেপ এখন আর নেই দুজনের। কারণ, দুজনই দায়িত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত। দুজনই মানুষের জন্য কাজ করছেন। আরও অনেক দিন কাজ করে যেতে চান আসাদুজ্জামান নূর। জন্মদিনে তিনি জানালেন সামনের দিনগুলোতে কাজের আকাঙ্ক্ষার কথা। মঞ্চে আরও কিছুদিন কাজ করার ইচ্ছা তাঁর। আরও কয়েকটি ভালো চরিত্রে কাজ করতে চান সিনেমাতেও। প্রত্যাশা করি, তাঁর এসব আকাঙ্ক্ষা পূরণ হোক।

মন্তব্য পড়ুন 0