বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমার এক খালা বলতেন, বাবা যে অ্যাডভার্টাইজিং করতেন, লাক্স যদি তাঁর ক্লায়েন্ট হয়, তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, লাক্সের চেয়ে ভালো সাবান বাংলাদেশে নেই। এই কনভিকশন নিয়ে তিনি কাজটা করতেন। ওভারঅল শিক্ষা লাভের জায়গা এটাই। আমিও পরে দেখলাম, বিশ্বাস নিয়ে বাবা কাজ করেন। এটার সঙ্গে পাশাপাশি বলতে হয়, তিনি কখনো নীতির সঙ্গে আপস করতেন না। আপস করলে বিশ্বাস রাখা যায় না। আর বিশ্বাস না রাখতে পারলে জীবনে শান্তি আসবে না। ওভারঅল এটিই তাঁর কাছ থেকে আমার শিক্ষা পাওয়া।

default-image

তিনি যখন মঞ্চনাটকের নির্দেশনা দিতেন, যদিও আমি কোনো দিন তাঁর পরিচালনায় কাজ করিনি, তবে সহশিল্পীদের কাছ থেকে শুনেছি, ছটলু (আলী যাকেরের ডাকনাম) ভাই, কখনো এই ডায়ালগ এভাবে দাও বলতেন না। বাবা শুধুই ছোটখাটো জিনিস ধরিয়ে দিতেন। হয়তো বলতেন, এটা বোধ হয় এ রকম, দ্যাটস ইট। তিনি কোনো দিন, আমার কাজের ক্ষেত্রেও এমনটা করতেন না। কখনো স্পেসিফিক করে বলতেন না, ইরেশ, তোমার এই সময়ে অফিসে আসা উচিত, এটা করা উচিত, ওইটা করা উচিত। নিজের কাজের মাধ্যমে বাবা সব বুঝিয়ে দিতেন।

তাঁর কোনো কাজে আমি খামখেয়ালি করছি দেখলেও তিনি কখনো বলতেন না, তুমি আরেকটু মনোযোগী হও। তিনি শুধু বলতেন, আই থিংক ইউ আর নট বিলিভ হোয়াটস ইউ আর ডুয়িং। তুমি তোমার যেটা কাজ, সেটা এনজয় করছ না। ট্রাই টু ফিগার আউট দ্য ওয়ে, কীভাবে কাজটা তুমি এনজয় করবে। মানুষকে ইন্সপায়ার্ড করে কাজ করাতেন, কোনো দিন মানুষকে ক্রিটিসাইজড করে কিছু করতেন না। সব সময় এম্পাওয়ার্ড করে ভালো করার চেষ্টা ছিল। তিনি বোঝাতে চেষ্টা করতেন, কাজটা আরও ভালো করলে আমি নিজে কীভাবে আরও ভালো অনুভব করব, সেই জায়গা থেকে মানুষকে ফিডব্যাক দেওয়ার চেষ্টা করতেন।

default-image

ছবি তোলার ব্যাপারটি ছিল বাবার শিশুসুলভ একটি ব্যাপার। বাবা আর্লি লাইফে তাঁর বাবা-মা, বড় বোনসহ সবাইকে হারিয়েছেন। তাঁর ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, তিনি ছবির মাধ্যমে ওই সময়টাকে ক্যাপচার করার চেষ্টা করতেন। ফটোগ্রাফির টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে তিনি খুব বেশি মাথা ঘামাতেন না। আমরা তো এখন ফটোগ্রাফি করতে গিয়ে কত আঁতলামি করি। এই টিচারের কাছে শিখি, অনলাইনে ক্লাস করাসহ আরও কত কী যে করি। বাবার ক্ষেত্রে, ইট ওয়াজ জাস্ট ক্যাপচারিং হোয়াট হিজ হার্ট ফেল্ট অ্যাট দ্যাট টাইম।

আমার জীবনের একজন বন্ধু বাবা। এরপর ফিলোসফার ও শিক্ষক। অনেকের আক্ষেপ থাকে, বাবাকে কোনো দিন ‘আই লাভ ইউ’ বললাম না। আমি বাবাকে আমার জীবনে প্রায় সব দিনই আই লাভ ইউ বলেছি। এই জায়গাটা তিনি তৈরি করে গেছেন। তাই এ নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বাবাকে ওপরে বা নিচে কিংবা কোনো পজিশনালি দেখতে পারব না। বাবা সারাক্ষণই আমার সঙ্গে আছেন মনে করছি।

default-image

বাবার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, আমাদের বন্ধুত্ব অনেক নিগূঢ়। আমাদের মধ্যে সব বিষয়ে কথাবার্তা হতো। খেলা দেখা থেকে শুরু করে ঝগড়াঝাটি সবই হতো। আমি আবার অপছন্দের মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারি না। সব সময় যাঁদের ভালোবাসি বা পছন্দ করি, তাঁদের সঙ্গে ঝগড়া হতো।

বাবার সঙ্গে একদিন খেলা নিয়ে খুব ঝগড়া হয়েছিল। খুবই হাস্যকর সেই ব্যাপার। একবার মেহরাব হোসেন খেলা শুরু করেছেন। বাবা তখন বলছিলেন, দেখো, ছেলেটা কী ইয়াং, ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলে, কী সুন্দর খেলে। আমি বললাম, ও ছোট কেমনে? আমরা একসঙ্গে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেট খেলছি, আমার ২-৩ বছরের সিনিয়র। বাবা বললেন, না না, তা হতেই পারে না। ওকে দেখো, কী তরুণ। এই নিয়ে দুজনের ফাটাফাটি ঝগড়া। অনেক ঝগড়া আবার সেখানেই সমাধান। ক্রিকেট, রাজনীতি, সমাজ—সব নিয়ে। শেষের দিকে বাবা খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। একসঙ্গে অনেক মৌন সময় কাটিয়েছি। এ সময়টায়ও বাবা খেলার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী ছিলেন। হাসপাতালের দিনগুলোতেও ক্রিকেট খেলাটাই দেখতেন বেশি।

default-image

আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা বন্ধু বাবা-মা-বোন। আমার ওয়াইফ মাঝেমধ্যে বলেন, তুমি কি কোনোদিন তোমার বাবা-মা ও বোনকে ছাড়া পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসতে পারবে না। আমার মা–ও তো বলেন, তুমি কি শ্রিয়া, ছটলু ও আমাকে ছাড়া কাউকে এতটা ভালোবাসতে পারো না? আমার সেই বন্ধুকে ছাড়া প্রথম জন্মদিন। একই দিনে আমার ও বাবার জন্মদিন। বাবাকে ছাড়া প্রথম জন্মদিন খুবই বাজে, খুব খারাপ।

টেলিভিশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন