‘বিধি ডাগর আঁখি’ গানটি নাকি সুবর্ণা মুস্তাফার জন্যই লেখা। আবদুল্লাহ আল-মামুনের সেই কথা অষ্টম শ্রেণির সুবর্ণা বিশ্বাস করতে চাননি। ছোট হলেও অতটা বোকা তিনি ছিলেন না। কিন্তু অভিনয়ের স্বার্থে শিক্ষকের কথা তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এখনো কোথাও গানটি বাজতে শুনলে থমকে যান অভিনেত্রী ও সাংসদ সুবর্ণা মুস্তাফা

default-image

এ রকম অনেক মানুষেরই অভিনয়ের শিক্ষক আবদুল্লাহ আল-মামুন। ন্যূনতম প্রতিভার আভা কারও ভেতরে দেখলেই হতো। কী এক জাদুতে তিনি সেই প্রতিভা প্রকাশের কৌশল শিখিয়ে দিতেন! মামুনকে তাই শিল্পী তৈরির কারিগর বললে ভুল হবে না। এখনকার অভিনয় অঙ্গনকে তাই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেন মামুনের শিক্ষার্থীরা—এক ভাগে পড়বেন যাঁরা মামুনের সঙ্গে কাজ করেছেন, অন্যভাগে যাঁরা করেননি।

শনিবার বিকেলে অভিনয় শিল্পী সংঘের কার্যালয়ে ছিল নাট্যজন আবদুল্লাহ আল-মামুনকে স্মরণের আয়োজন। ২১ আগস্ট ছিল তাঁর প্রয়াণের দিন। সংঘের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিমের সঞ্চালনায় সেই আয়োজনে স্মৃতিচারণা করেন মামুনের হাতে তৈরি শিল্পী ও উত্তর প্রজন্ম। তাঁদের অভিনয়জীবন, বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটক, রেডিও, চলচ্চিত্র ও মঞ্চে মামুনের অশেষ অবদানের কথা স্মরণ করেন তাঁরা।

default-image

টেলিভিশনের চিত্রনাট্য কেমন হবে—মঞ্চ, নাকি রেডিওর মতো? ১৯৬৫-৬৬ সালের দিকে এ নিয়ে তৈরি হয়েছিল ভ্রান্তি। জটিল সেই অঙ্ক নিজ হাতে সমাধান করেছিলেন মামুন। নাটক লিখতে পারতেন চোখের পলকে। মতিঝিল পর্যন্ত বন্যার পানি পৌঁছে গেছে শোনার পরদিন তিনি লিখে ফেললেন ‘এখন দুঃসময়’। তাঁর বন্ধু রামেন্দু মজুমদার বললেন, ‘নাটক ছিল তাঁর রক্তে। যে দুজন মানুষের জন্য বাংলাদেশে মঞ্চনাটক জনপ্রিয় হয়েছে, তাঁদের একজন মামুনুর রশীদ, অন্যজন আবদুল্লাহ আল-মামুন। টেলিভিশন ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভালোবাসা।’
‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন মঞ্চে। লিখেছেন অসাধারণ সব নাটক। সব কটি মাধ্যমে নেশাগ্রস্তের মতো কাজ করে গেছেন তিনি’, বললেন মামুনের আরেক সহযাত্রী মামুনুর রশীদ।

default-image

মামুনের অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কারের নাম অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। তিনি বলেন, ‘আমার নাট্যজীবনের জন্ম তাঁর হাতে। ছোট্ট শিশুকে যেভাবে মুখে তুলে খাইয়ে দেওয়া হয়, তিনি সেভাবে আমাকে শেখাতেন। আমার জন্য নাটক লিখতেন, চরিত্র সৃষ্টি করতেন। আমি পারব, সেই বিশ্বাসটুকু তিনিই তৈরি করেছিলেন।’
‘কোকিলারা’ নাটকের প্রশংসায় যখন পঞ্চমুখ ঢাকার দর্শক, তখন ফেরদৌসীর সমালোচনা করেছিলেন মামুন। বলেছিলেন, ‘নাটক লিখলাম আমি, নির্দেশনা দিলাম আমি আর সব প্রশংসা এখন কুড়োচ্ছ তুমি! তবে শোনো, তুমি আলো নিচ্ছিলে না। নাটক একটা সামগ্রিক ব্যাপার। অভিনয় করা, সংলাপ বলার পাশাপাশি আলোটাও নিতে হবে।’ ফেরদৌসী বলেন, ‘আজ বুড়ো বয়সে মঞ্চে উঠলেও তাঁর সেই কথাগুলো কানে ভাসে।’

default-image

বক্তব্য দেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, মনোজ সেনগুপ্ত, নরেশ ভূইঞা, আবদুল কাদের, ত্রপা মজুমদার প্রমুখ। অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দিলারা জামান, জাহিদ হাসান, তৌকীর আহমেদ, তানিয়া আহমেদ, তারিন, সুইটিসহ শিল্পী সংঘের প্রায় সব সদস্য।
অভিমান করে অনেক দিন ‘গুরুর’ থেকে দূরে ছিলেন খায়রুল আলম সবুজ। কাল সে কথা স্মরণ করে বললেন, ‘সবকিছু ছেড়েছুড়ে আমরা নাটক করেছি, কারণ, আমাদের গুরু ছিলেন আবদুল্লাহ আল-মামুন। জীবনে ছোট ছোট ভুল হবেই। সেটা শুধরে নিতে হবে। ছেড়ে চলে গেলে চলবে না।’ এনামুল হক বলেছেন, যদি লিখতে হয়, নতুন প্রজন্মকে মামুন সম্পর্কে জানতে হবে।

বিজ্ঞাপন
টেলিভিশন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন