ডিজিটাল লেনদেন

ক্রিকেটের মহাযজ্ঞে বিশ্বস্ত সঙ্গী ক্রেডিট কার্ড

বিজ্ঞাপন

কারওয়ান বাজারে দেখা বন্ধু সুমন রহমানের সঙ্গে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট দেখতে যাচ্ছে ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে দেখা করতে এসেছে। কারওয়ান বাজার থেকেই রওনা দেবে বিমানবন্দরের উদ্দেশে। ইংল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেওয়া বন্ধুকে দেখে অবাক। তার হাতে বড় কোনো ব্যাগ নেই। সঙ্গে রয়েছে শুধু পাসপোর্ট রাখার ছোট্ট একটা ব্যাগ। আমার জানতে চাওয়ার দৃষ্টি দেখে সুমন আমাকে জানায়, এক ক্রেডিট কার্ড থাকলে দেশ থেকে ব্যাগ ভরে পোশাক আর টাকা নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্রেডিট কার্ডই সব প্রয়োজনের সঙ্গী।

কেন ক্রেডিট কার্ড
ক্রেডিট কার্ড দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত অর্থ ব্যবহার বা খরচ করতে পারবেন বা তুলতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময় পর টাকা পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রায় সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাকু​র্লার অনুযায়ী, গ্রাহকের বিদেশি মুদ্রা আমানত অ্যাকাউন্ট, বিদেশি মুদ্রা অ্যাকাউন্ট বা এক্সপোর্টার রিটেনশন কোটা অ্যাকাউন্টের মতো গ্রাহককে বৈদেশিক মুদ্রা অ্যাকাউন্টের বিপরীতে একটি আন্তর্জাতিক কার্ড ইস্যু করা যেতে পারে।

কারা পাবেন
ক্রেডিট কার্ড হচ্ছে এমন একটি বিষয়, যার সাহায্যে আপনি একটি ব্যাংক থেকে টাকা ধার করেন খরচ করার জন্য। এই ধার করা টাকার পরিমাণটিকেই মূলত ক্রেডিট কার্ডের ‘ক্রেডিট লিমিট’ বলা হয়ে থাকে। আপনার মাসিক আয়ের ওপর ভিত্তি করে আপনাকে ব্যাংক এই লিমিট দিয়ে থাকে। যেমন আপনার মাসিক আয় যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, তাহলে আপনি সাধারণত ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লিমিটের একটি ক্রেডিট কার্ড পেতে পারেন। তবে ক্রেডিট সীমা কম-বেশি হতে পারে আপনি যে ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড নিচ্ছেন, সেই ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী। তবে আপনাকে ক্রেডিট কার্ডের জন্য সবার আগে বিবেচিত হতে হবে।

বিদেশেও ক্রেডিট কার্ড
বিশ্বকাপ ক্রিকেট দেখতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে যা খরচ করবেন, মাস শেষে আপনার সেই পরিমাণ টাকা ব্যাংক থেকে একটি বিল হিসেবে ইস্যু করা হবে। তারপরে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপনাকে সেই বিল ব্যাংকে পরিশোধ করতে হবে। এই সময়সীমা (টাইম লিমিট) বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন রকম হতে পারে, তবে সাধারণত ১০-১৫ দিন হয়ে থাকে। ক্রেডিট কার্ড সাধারণত অনলাইন এবং অফলাইন দুভাবেই কাজ করে। তবে আপনি যদি আপনার ক্রেডিট লিমিটটি বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে ব্যবহার করতে চান, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে চান, তখন আপনার অবশ্যই একটি আন্তর্জাতিক পাসপোর্টের দরকার হবে। পাসপোর্ট না থাকলে বাংলাদেশের বাইরে কোনো রকম লেনদেন করতে পারবেন না ক্রেডিট কার্ডের সাহায্যে। কিছু নিয়ম মেনে আপনার ক্রেডিট কার্ডটি আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। আপনার ক্রেডিট লিমিটের নির্দিষ্ট একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় কনভার্ট করে নিতে পারবেন, যাতে আপনি বাংলাদেশের বাইরে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতে পারেন। তা ছাড়া অনলাইনেও বিদেশ থেকে পণ্য কিনতে পারবেন।

প্রয়োজনীয় কাগজ
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন ফরম পূরণ করে যেকোনো ব্যাংক শাখাতে জমা দিতে হবে। সঙ্গে নিম্নোক্ত কাগজাদি লাগবে—
ক. ছবি এক কপি, খ. টিআইএন সার্টিফিকেটের ফটোকপি, গ. পাসপোর্টের ফটোকপি, ঘ. জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ঙ. আপনার বেতনের প্রমাণপত্র। এ ছাড়া ব্যাংক আলাদাভাবে যে কাগজপত্র চায়।

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুবিধা
বিদেশে আর্থিক লেনদেনে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনে বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে।
● দ্রুত লেনদেন—বিদেশে বসে কোনো একটা জিনিস পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আপনার কাছে নগদ টাকা নেই। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাজে দেয় ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার। এর মাধ্যমে পণ্যটি চট করে কিনে নিতে পারেন। পরে আপনার সুবিধামতো মূল্য পরিশোধ করে দিতে পারেন। সময়মতো বিল পরিশোধ করতে পারলে জরিমানাও গুনতে হবে না আপনাকে।
● অফার—বিক্রি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটার ওপর বিভিন্ন অফার ঘোষণা করে। যেমন ক্যাশ ব্যাক অফার, স্পেশাল ডিসকাউন্ট। দেশের বাইরে বেড়াতে গেলে হোটেলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারে অনেক সময়ই মূল্যছাড় দেওয়া হয়। প্লেনের টিকিট কাটতেও অনেক সময় পাওয়া যায় বিশেষ মূল্যছাড়। এ ছাড়া বিদেশে বসে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে এই অফার গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে।
● ক্রেডিট স্কোর বাড়ানো—যদি আপনার লেনদেনের ইতিহাস খুব একটা সুখকর না হয়, তবে ক্রেডিট স্কোর বাড়ানোর অন্যতম কৌশলী উপায় হচ্ছে নিয়মিত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা। নিয়মিত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সময়মতো বিল পরিশোধ করলে আপনার ক্রেডিট স্কোর দ্রুত বাড়তে থাকবে।
● সুরক্ষা—বলা হয় নগদ, ডেবিট কার্ড ও চেক ব্যবহারের চেয়ে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি নিরাপদ। আপনার কার্ডটির ভুলক্রটি বা জালিয়াতি হলে কিংবা চুরি হলে আপনি আপনার অর্থ ফেরত পাবেন।
● ঋণের সুবিধা—কিছু ক্রেডিট কার্ড, বিশেষ করে বিদেশে শূন্য শতাংশ সুদে ঋণ দেয়। এসব ক্ষেত্রে মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করতে হয়, যা বেশ সুবিধাজনক। আবার কোনো কোনো কার্ডে ঋণে সুদের হার অনেক থাকে। এ ক্ষেত্রেও একটা সুবিধা আছে। বোঝা এড়াতে দ্রুত ঋণ পরিশোধ করা হয়। নিজস্ব ঋণ থাকে না।

আছে অনেক সুবিধা
দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের হেড অব কার্ড মাসুদুল হক ভূইয়া জানান, সিটি ব্যাংকের প্রায় সব ক্রেডিট কার্ডে ডুয়েল কারেন্সি (দ্বৈত মুদ্রা) ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড সমর্থন করে বিশ্বের যেকোনো স্থানে ব্যবহার করতে পারবে। তিনি বলেন, যখন কেউ দেশের বাইরে কার্ড ব্যবহার করে খরচ করতে চাইবে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্টে ডলার এন্ডোর্সমেন্ট করে নিতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের যেকোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডধারীদের জন্য সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার খরচ করার অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ডলার সার্কভুক্ত দেশে এবং সাত হাজার ডলার অন্যান্য দেশে ব্যবহার করতে পারবে।
আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) ক্রেডিট কার্ডে সব সময় কিছু না কিছু অফার থাকেই। বিশ্বকাপের সময়ও সেই অফার উপভোগ করতে পারবেন সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা বলে জানান মাসুদুল হক ভূইয়া।

বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড
বাংলাদেশে ভিসা, মাস্টার কার্ড, অ্যামেক্স ইত্যাদি ক্রেডিট কার্ড প্রচলিত আছে। প্রতি মাসে আপনার আয় ৩০ হাজার টাকা হলেই আপনি বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড পেতে পারেন। বাংলাদেশে ১৯৯৬ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক প্রথম ক্রেডিট কার্ড চালু করে। ওই সময়ে তৎকালীন বণিক বাংলাদেশ (বর্তমানে লংকাবাংলা) ও ন্যাশনাল ব্যাংকও ক্রেডিট কার্ড চালু করে।
দেশে ক্রেডিট কার্ড বেশি জনপ্রিয়তা পায় দি সিটি ব্যাংকের হাত ধরে। ব্যাংকটি ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স) কার্ড দিচ্ছে। ভিসা কার্ডও দেয় তারা। বর্তমানে দেশে দি সিটি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল), মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), ডাচ–বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ব্যাংক এশিয়া, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংকসহ ৪০টির মতো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে। দেশে ভিসা ও মাস্টারকার্ড ব্র্যান্ডের কার্ডের ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন