গোলাম মুর্শেদ
গোলাম মুর্শেদ

করোনাভাইরাস দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা নজিরবিহীন সংকট নিয়ে এসেছে। ওয়ালটনের ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?

গোলাম মুর্শেদ: শুরুর দিকে, অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাসে আমরা ধাক্কা খেয়েছিলাম। তবে পবিত্র ঈদুল আজহা চলে আসায় ব্যবসা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরা মহামারিকে মাথায় রেখে পণ্য বিক্রির যে লক্ষ্য ঠিক রেখেছিলাম, সেটা পূরণ হয়েছে। গত বছর ঈদুল আজহাকেন্দ্রিক বাজারে আমরা ১০ লাখ রেফ্রিজারেটর বিক্রি করেছিলাম। এ বছর ৬ লাখ হয়েছে। আপনি বলতে পারেন, আমরা খাদ থেকে উঠে এসেছি।

যদি ধরি আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনার প্রাদুর্ভাব থাকবে, এ সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আপনার পূর্বাভাস কী হবে?

গোলাম মুর্শেদ: করোনার সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়েই দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে হবে। মানুষকেও তাঁর জীবিকা ঠিক রাখতে হবে। আমার পূর্বাভাস হলো ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যবসা ভালোই যাবে, আমাদের আর এপ্রিল-মে মাসের পরিস্থিতিতে আর ফিরতে হবে না। বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।

করোনাকালে ব্যবসার ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই বলছেন, অনলাইনে পণ্য বিক্রি বেড়েছে। ওয়ালটনের কী পরিস্থিতি?

গোলাম মুর্শেদ: অনলাইনে আমাদের বিক্রির প্রবৃদ্ধি ৪০০ শতাংশ। এটাকে বিপ্লব বলতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

চাহিদা বাড়লে উৎপাদন বাড়াতে হবে। আপনাদের কারখানার উৎপাদন পরিস্থিতি কী?

গোলাম মুর্শেদ: আমরা সব সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উৎপাদন চালাচ্ছি। চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।

আপনারা বলছেন, রেফ্রিজারেটরে আপনাদের বাজার হিস্যা ৭৪ শতাংশ। এই বাজারে আর কত দিন উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে। আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

গোলাম মুর্শেদ: ইলেকট্রনিকস পণ্য এখন দৈনন্দিন প্রয়োজন, বিলাসিতা নয়। তাই আমার মনে হয়, এ বাজার আরও বড় হবে। একটা নতুন পরিবার তৈরি হলেই রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), মাইক্রোওয়েভ ওভেনসহ আরও ছোট ছোট গৃহস্থালি সরঞ্জাম লাগবে। শুধু এ দিকটা বিবেচনায় নিলেই দেখবেন, পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

ওয়ালটনের বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখন দুই দরজার রেফ্রিজারেটর দেখছি, যা সাধারণত বেশি আয়ের মানুষ কেনেন। আপনারা কি উচ্চমধ্যবিত্তের বাজার ধরতে পণ্য আনছেন?

গোলাম মুর্শেদ: আমাদের নতুন একটি রেফ্রিজারেটর আসছে, যেটিতে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) প্রযুক্তি থাকবে। মানে হলো রেফ্রিজারেটরই জানাবে আপনার বাসায় খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে কি না। দুই দরজার (সাইড বাই সাইড) চারটি নতুন মডেল আসছে। এখন বাজারে দুই দরজার যে মডেলটি আছে, তা আমরা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছি। গত সপ্তাহে মডেলটির উৎপাদনক্ষমতা চার গুণ বাড়াতে হয়েছে। সামনে আসবে, এমন মডেলের ফরমাশ এখনই দিচ্ছেন ক্রেতারা। আমরা উচ্চমধ্যবিত্তের বাজার ধরার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। মনে রাখবেন, আমরা কিন্তু ভালো মানের পণ্য প্রায় অর্ধেক দামে দেব।

বিজ্ঞাপন

রেফ্রিজারেটরের বাইরে টেলিভিশন, এসি, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদির বাজারে আপনাদের ব্যবসার অবস্থা কী?

গোলাম মুর্শেদ: আমাদের লক্ষ্য হলো শুধু রেফ্রিজারেটর নয়, ওয়ালটন ব্র্যান্ডের পণ্যের বাজার হিস্যা ৭০ শতাংশে নেওয়া। সেটা আগামী বছরের মধ্যে। টেলিভিশনে আমাদের বিক্রির প্রবৃদ্ধি ২৫ শতাংশের বেশি। এ ক্ষেত্রে বাজার হিস্যা ৫০ শতাংশের মতো। এসিতে ৩৫ শতাংশের মতো। ওয়াশিং মেশিন ও অন্যান্য ছোটখাটো ইলেকট্রনিকস পণ্যেও আমরা বড় অংশের বাজার ধরব।

প্তানি বাজারে পরিস্থিতি কী?

গোলাম মুর্শেদ: দু-তিন মাস ব্যবসা মোটামুটি বন্ধ থাকার পর পণ্যের চাহিদা সব দেশেই তৈরি হয়েছে। আমরা খুব ভালো সম্ভাবনা দেখছি। ক্রয়াদেশ পাওয়া যাচ্ছে, রপ্তানি হচ্ছে। মোট ৪০টি দেশে আমরা পণ্য পাঠাচ্ছি। জুলাইয়ে আমরা তুরস্কে কমপ্রেসর পাঠানো শুরু করলাম। আমাদের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাঁচটি ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্র্যান্ডের একটি হওয়া। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য হবে আমাদের মূল বাজার।

ইউরোপ কেন আমাদের পণ্য কিনবে?

গোলাম মুর্শেদ: ওদের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। আমরা কম দামে দিতে পারব। মান নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তারা যেসব সংস্থার মান–সনদ চায়, সেটা আমরা অর্জন করতে পারছি। ভারত, নেপাল, মিয়ানমারেও ওয়ালটনের বাজার তৈরি হচ্ছে।

ইলেকট্রনিকস পণ্যে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোই সাধারণত বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে থাকে। সেখানে বাংলাদেশে একটি দেশীয় ব্র্যান্ড রেফ্রিজারেটরের বাজারে ৭০ শতাংশের বেশি বাজার হিস্যা ধরে রেখেছে। কী কী কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়।

গোলাম মুর্শেদ: আপনি যদি ওয়ালটনের শক্তির দিক সম্পর্কে জানতে চান, আমি তিনটি বিষয় বলব। মানসম্পন্ন পণ্য, গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যাপক জোর দেওয়া এবং প্রযুক্তি। একটা সময় পর্যন্ত বহুজাতিক ব্র্যান্ড ইলেকট্রনিকসের বাজারে বেশি হিস্যাধারী ছিল। কিন্তু ওয়ালটন মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করে দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করেছে।

আপনি বলছিলেন, গবেষণা ও উন্নয়নে ওয়ালটন বিশেষ জোর দেয়।

গোলাম মুর্শেদ: একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। বিপণন ও বিক্রয় এবং গবেষণা ও উন্নয়ন। আপনি যদি দেশের মানুষের চাহিদা ও আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পণ্য উৎপাদন করেন, তাহলে বাজারে ভালো করা সম্ভব। ওয়ালটনে এখন গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগে ৪৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী রয়েছে। ওয়ালটন হাইটেকে আমরা প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) হিসেবে নিয়ে এসেছি স্যামসাংয়ের সাবেক একজন সিটিওকে, যিনি ৩৪ বছর স্যামসাংয়ে কাজ করেছেন। রেফ্রিজারেটরের মূল অংশ ‘কুলিং সেকশন’–এর দায়িত্বে রয়েছেন প্যানাসনিক থেকে আসা একজন কর্মকর্তা। এই দল ওয়ালটনের সম্পদ। আমরা মানুষের চাহিদা ও দেশের আবহাওয়া উপযোগী পণ্য তৈরি করি।

আপনার পেশাজীবন শুরু ওয়ালটনে। এটাই কি একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে আপনি কাজ করেছেন?

গোলাম মুর্শেদ: হ্যাঁ, আমি শুরু থেকে ওয়ালটনেই আছি। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ওয়ালটনের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) শাখার শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বিভাগে কাজ শুরু করি। কিছুদিন পরে আমি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে উৎপাদন বিভাগে যাই। সেখানে বছরখানেক কাজ করে রেফ্রিজারেটর উৎপাদন বিভাগে যাই। এরপর ২০১৪ সালে কর্তৃপক্ষ আমাকে ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসে। কাজ ছিল বোর্ড সচিবের। ২০১৭ সালে আমাকে রেফ্রিজারেটর উৎপাদন বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়, পদ ছিল প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। গত জুলাইয়ে কর্তৃপক্ষ আমাকে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়। এটাই ওয়ালটনে আমার ৯ বছর ৭ মাসের যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

শেষ প্রশ্ন করব কর্মীদের নিয়ে। আপনাদের প্রায় ২৫ হাজার কর্মী রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানেই শুনেছি কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। ওয়ালটনে পরিস্থিতি কী?

গোলাম মুর্শেদ: আমাদের কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল, কোনো কর্মী ছাঁটাই না করে ব্যবসার পরিকল্পনা করতে হবে। আমরা ছাঁটাই করিনি। বেতন-ভাতাও যথাসময়ে দেওয়া হচ্ছে।

মন্তব্য পড়ুন 0