default-image

এক.

কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাই। ক্যাম্পাসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই মনে নতুন অনুভূতির সঞ্চার হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, নতুন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ পেলাম, যেন স্বাধীনতার স্বর্গে প্রবেশ। আমার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম থাকবে না, বকাবকির কেউ থাকবে না, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলবে না, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেব। স্বাধীনতার সৌন্দর্য আর মর্ম তখন উপলব্ধি করেছিলাম।

কত আশা নিয়ে ক্যাম্পাসজীবন শুরু করেছিলাম! কিন্তু তা আজ শেষের দিকে, ভাবতেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। এখনো ক্যাম্পাসজীবনে অনেক কিছু করা বাকি, অনেক কিছু দেওয়া বাকি, অনেক কিছু নেওয়া বাকি। মাঝখানে এসে ক্যাম্পাসজীবন প্রলম্বিত করল করোনাভাইরাস।

সব সময়ই চাইতাম ক্যাম্পাসজীবনটা প্রচুর উপভোগ করব। যেন পরবর্তী সময়ে আফসোস না থাকে। তাই তো অনেক না-পাওয়ার মধ্যেও ক্যাম্পাসজীবনটাকে উপভোগ করছি। এভাবেই উপভোগ করে যেতে চাই, যত দিন ক্যাম্পাসে আছি।

বিজ্ঞাপন

দুই.

প্রাইমারির পর থেকেই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়—সব সময়ই বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে। সেই সময় বিভিন্ন উৎসবের ছুটিতেও বাড়িতে কমই থাকা হতো। এক মাসের ছুটি পেলে হয়তো বাড়িতে থাকতাম পাঁচ থেকে সাত দিন, নয়তো তিন দিন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, সবকিছু অনলাইনে হচ্ছে, সেহেতু এখন বাড়িতে বসেই কাজগুলো করতে হচ্ছে। করোনার কারণে দীর্ঘকাল পর লম্বা সময় ধরে বাড়িতে আছি। এত দিন বাড়িতে থাকার সুযোগ পাওয়াটা সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার! কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ির সবার সান্নিধ্য পাওয়া সৌভাগ্যের।

বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি দেওয়ার পরপরই বাড়ি এসেছিলাম। গ্রামে আছি বলে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এখনো এতটা টের পাইনি। শুরুর কয়েক মাস একটু ভয়ে ছিলাম। সেই সময় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দিন দিন তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে। আশপাশের গ্রামের কজনের করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়া খবর শুনেছি। তবে যারা শহরে থাকে, তাদের হয়েছে। গ্রামে করোনাভাইরাসের প্রভাব বেশি পড়েছে অর্থনৈতিকভাবে। অনেকেই কর্মহীন হয়ে গেছে। অনেকে চাকরি চলে গেছে, অনেকেই দিনমজুর দিচ্ছে, মজুরির বৈষম্য হয়েছে। তবে অনেকে আবার বিভিন্ন জায়গা থেকে সাহায্যও পেয়েছে। বর্তমানে সবকিছু মিলিয়ে গ্রামে মানুষ এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করতে চেষ্টা করছে।

তিন.

দীর্ঘদিন বাড়িতে থাকার ফলে সারাক্ষণ মন ছটফট করছে। কোথাও আড্ডা কিংবা ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করছে। সবচেয়ে বড় কথা, ক্যাম্পাসের যাওয়ার অপেক্ষায় আছি। যদিও অন্যান্য ক্যাম্পাসের মতো আমাদের ক্যাম্পাস অতটা বড় নয়, তবু অনেক সুন্দর। ক্যাম্পাসের বন্ধুদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত থাকলেও সামনাসামনি বসে আড্ডা দেওয়ার মতো হয় না। ক্যাম্পাসে থাকার সময় অনেকের কাছে অনেক কিছুর আবদার করা, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক–বিতর্ক করা আর নতুন নতুন আইডিয়া শেয়ার করা—সত্যই মিস করি। অনেক দিন হলো মনখুলে হাসতে পারি না, কথা বলতে পারি না। সব বন্ধু মিলে কোথাও যাওয়া হয় না। ক্যাম্পাসের সবকিছু মিস করছি। কবে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমবে, কবেইবা ক্যাম্পাসে যেতে পারব!

মাঝেমধ্যে খুব ভয় হয়। করোনা না থাকলে কিছুদিন বাদেই হয়তো স্নাতক শেষ হয়ে যেত। মনে প্রশ্ন জাগে, তখনো আমি কি ক্যাম্পাসের সবকিছু প্রচণ্ড মিস করব? নাকি কাজের চাপে সব ভুলে যাব? অবশ্য ছুটিতে থাকার ফলে মনে হয়, সত্যি সত্যিই ক্যাম্পাস ছেড়ে দিয়েছি। ক্যাম্পাস নিয়ে অনুভূতির জায়গাগুলোয় নানা স্বপ্ন, নানা কল্পনা খেলা করে। তবে যা হোক, ভাইরাসের কারণে আগেভাগেই ক্যাম্পাস ছাড়ার অনুভূতিটা পেলাম। যদিও ক্যাম্পাসের সঙ্গে ইতি টানা হয়নি। ক্যাম্পাসজীবন উপভোগের জন্য হাতে এখনো প্রচুর সময় আছে। তা আমি আরও বেশি করে সদ্ব্যবহার করতে চাই।

চার.

মাঝেমধ্যে চিন্তা হয়, ভাইরাসের ভয় কাটিয়ে আবার যখন ক্যাম্পাসজীবন শুরু করব, তখন কি আমরা সবাই পুরোনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব? আমাদের মধ্যে স্বাভাবিক আচরণ ফিরে আসবে কি? আমার বন্ধুরা কেমন আচরণ করব কিংবা আগের স্বাভাবিক মধুর সম্পর্ক হবে কি? সবকিছুই যেন গুলিয়ে ফেলছি। কিংবা আমি নিজেও স্বাভাবিক আছি কি না, নিজের মধ্যেও সংশয় হয়। যত সংশয়–ভয় থাকুক, তবু নতুন করে আবার ক্যাম্পাসজীবন ও বন্ধুদের সান্নিধ্য পাওয়া প্রয়োজন। ক্যাম্পাসজীবনের সুখ বারবার হাতছানি দিচ্ছে।

পাঁচ.

করোনাভাইরাসে জন্য বাড়িতেই থাকছি। ফলে হাতে প্রচুর সময়। তাই জীবনে যে কাজগুলো করা হয়নি, তা করার চেষ্টা করছি। যতটুকু পারা যায় সংসারের যাবতীয় কাজ শেখার চেষ্টা করছি। যেমন নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তেমনি নতুন নতুন মাইলফলকের ছুঁতে পারছি। এর মধ্যে উপলব্ধি করেছি, বেঁচে থাকার জন্য বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। ফরমালিনমুক্ত শাকসবজি কিংবা মাছ–মাংস খেতে হবে। সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। নিজেকে ভালোমতো বুঝতে হবে। সবাই একে অপরের পরিপূরক। টাকাই সবকিছু নয়। সুস্বাস্থ্যই সুখ ও শক্তি এবং সবাই সবার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত আর সম্মান দেওয়া উচিত, সেটা মানুষ হোক আর প্রকৃতি। সুতরাং বলতেই পারি, করোনাভাইরাস মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

সবকিছু মিলিয়ে বাড়িতে সুখেই আছি, ভালোই আছি, তবু বাড়িতে মন বসছে না; মন পড়ে থাকে ক্যাম্পাসে।

জাডিল মৃ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

বিজ্ঞাপন
ফিচার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন